
মানিক পশারীর মৃত্যু, দাফন এবং তার মুক্তিযোদ্ধা সনদের সত্যতা যাচাইয়ে উচ্চপর্যায়ের এক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। প্রকাশিত সংবাদে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ ও প্রশ্নের প্রকৃত তথ্য উদঘাটনে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে মানিক পশারীর মৃত্যু, দাফন, তার মুক্তিযোদ্ধা সনদের সত্যতা ও এ-সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।
বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের নির্দেশনায় ইতোমধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এবং মানিক পশারীর মৃত্যু ও তার মুক্তিযোদ্ধা সনদের বিষয়ে তদন্ত শেষ করে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও সুপারিশ পর্যালোচনা করে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
মন্ত্রণালয় জানায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা থেকে অমুক্তিযোদ্ধাদের নাম বাতিলের জন্য কাজ চলছে। একই সঙ্গে কোনো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সম্মান ও মর্যাদা যাতে ক্ষুণ্ন না হয়, সে বিষয়েও মন্ত্রণালয়ের অবস্থান স্পষ্ট।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, কোনো মুক্তিযোদ্ধা অনৈতিক কাজে সম্পৃক্ত হলে কিংবা কোনো সংগঠন বা গোষ্ঠীর হয়ে ব্যবহৃত হলে তার দায় তাকেই নিতে হবে।
মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে মন্ত্রণালয় কাজ করছে উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান রক্ষায় মন্ত্রণালয় সচেষ্ট রয়েছে। একইসঙ্গে কোনো জালিয়াত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যাতে মুক্তিযুদ্ধের স্রষ্টাদের নাম ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে সংকটে ফেলতে না পারে, সে বিষয়েও মন্ত্রণালয় সজাগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২৪ অক্টোবর পিরোজপুরে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা করা ‘মুক্তিযোদ্ধা’ মানিক পশারীর মরদেহ দাফন করতে গিয়ে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের তীব্র বাঁধার মুখে পড়েছিল তার পরিবার। পরে পুলিশের কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে গভীর রাতে দাফন করা হয় তার মরদেহ। কিন্তু, তার দাফনকার্যে হাত দিতে এগিয়ে যাননি এলাকার কোনও পুরুষ; কবর খুঁড়েছেন তার স্ত্রী, মেয়ে ও বোন।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) দিবাগত রাত ২টার দিকে সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে এভাবেই নিজ বাড়িতে দাফন করা হয় মানিক পশারী।
জানা গেছে, শনিবার দুপুর ১২টায় উপজেলা পরিষদ চত্বরে মুক্তিযোদ্ধা মানিকের মরদেহ নিয়ে গেলে জেলা জামায়াতের নেতাকর্মী ও স্থানীয়দের তোপের মুখে পড়ে তার স্বজনেরা। এ অবস্থায় পুলিশের সহায়তায় মরদেহ সরিয়ে নেওয়া হয় পুলিশ লাইনসে। সেখানে বিকেল ৫টার দিকে গার্ড অব অনার শেষে নিরাপত্তা দিয়ে মরদেহটি ঘিরে রাখে সদর থানা পুলিশ।
পরে রাত ১টার দিকে সদর থানা পুলিশ নিরাপত্তা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার মরদেহটি নিয়ে তার বাড়িতে পৌঁছে। রাত ২টার দিকে দাফন কাজ শেষ। মানিক পশারীর স্ত্রী, মেয়ে ও বোনসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা মিলে কবর খুঁড়ে রাত ২টার দিকে তাকে দাফন করেন।
মানিক পশারী পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের ৭ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তিনি জামায়াত নেতা আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলার বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম প্রধান সাক্ষী ছিলেন। ২০২৪ সালে আগস্টে ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের পরে তিনি যশোরে ও গোপালগঞ্জে টুঙ্গিপাড়ায় তার মেয়ের জামাইয়ের কাছে আশ্রয় নেন। গত ২ মাস ধরে অসুস্থ থাকার পর শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিক মেয়ের জামাইয়ের বাড়িতেই মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
এদিকে, মানিক পশারীর দাফনকার্যে কোনো বাধা প্রদান করা হয়নি বলে দাবি করে পিরোজপুর জেলা জামায়াত। একইসঙ্গে মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় ও তার সনদ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয় দলটির নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে।
আরটিভি/এসএইচএম




