
করোনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না-উঠতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, স্যাংশনের কারণে ২০২২ সালের শুরুতেই সারা বিশ্ব নানামুখী সংকটের মাঝে পড়েছে। বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে ধস নামে। এর সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, জ্বালানি তেল এবং গ্যাস সংকটের কথা। শুধু এই দুটি জিনিসকে কেন্দ্র করে খাদ্য, বাসস্থান, পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম এত পরিমাণ বেড়েছে, যা গত কয়েক দশকেও বিশ্ববাসী দেখেনি। শ্রীলঙ্কা, হাইতি, সুদান, লেবাননসহ বেশকিছু দেশ রীতিমতো দেউলিয়া হয়ে গেছে। নজিরবিহীন ডলার ও রিজার্ভ সংকট, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, প্রবাসী আয় ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়াসহ নানান কারণে এই বছরটি বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে পার করতে হয়েছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি
রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত শুরুর পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, খাদ্য সংকট এবং ভয়াবহ মূল্যস্ফীতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী। প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। চলতি বছরের ৫ আগস্ট রাত ১২টার পর থেকে লিটার প্রতি ডিজেলের দাম ৮০ টাকা থেকে ১১৪ টাকা করা হয়। প্রতি লিটার কেরোসিনের দাম ৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয় ১১৪ টাকা। প্রতি লিটার অকটেনের দাম ৮৯ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে নির্ধারণ করা হয় ১৩৫ টাকা। প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ৮৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয় । গড়ে ৪৭ শতাংশেরও বেশি দাম বাড়ানো হয়।
জ্বালানি তেল এমন একটি পণ্য যার ব্যবহার কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, পরিবহন, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ সবক্ষেত্রে। বলা হচ্ছে ভর্তুকি কমাতে এবং পেট্রোবাংলার লোকসান কমাতে এই পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন আইএমএফের ঋণের শর্ত পূরণের জন্য এই ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। কিন্তু সংবাদপত্রগুলো বলছে আইএমএফ এমন কোনো শর্ত দেয়নি। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাসভাড়া ২৭ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, রপ্তানি আদেশে বাধা এবং জাহাজের ভাড়া বৃদ্ধির অজুহাতে আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। পাল্লা দিয়ে বাড়ে দেশে উৎপাদিত পণ্যের দামও। হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে জীবনযাত্রার সর্বক্ষেত্রে নতুন চাপ সৃষ্টি হয়। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা চালসহ নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির করে তোলে। তেলের দাম বৃদ্ধির পরদিন থেকেই সব ধরনের পণ্যের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। এতে দম বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি হয় ভোক্তাদের। সয়াবিন তেল ও চিনির দাম ইচ্ছেমতো বাড়ানোর জন্য ভোক্তাদের এক প্রকার জিম্মি করে ব্যবসায়ীরা। সরকার দাম বাড়ানোর ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখে পণ্যের সরবরাহ। অতি মুনাফার লোভে অবৈধভাবে সয়াবিন তেল মজুদ করেন অনেক ব্যবসায়ী। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে বেরিয়ে আসে কারসাজি। গত মার্চ মাসে স্থানীয় বাজারে ভোজ্য তেলের দাম বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে প্রতি লিটার ভোজ্য তেলের দাম ২০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। সয়াবিন তেল নিয়ে দেশের বাজারে এক অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়।
ডলার ও রিজার্ভ সংকট
বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে আমদানি ব্যয়। ভয়াবহ চাপ পড়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। অন্যদিকে বছরের মাঝমাঝি হু হু করে কমতে থাকে রেমিট্যান্স। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ৪৬ বিলিয়ন থেকে নেমে বছর শেষে হয়েছে ৩৩ বিলিয়ন ডলার। আর রিজার্ভে টান পড়ায় সৃষ্টি হয় চরম ডলার সংকট। ৮৫ টাকার ডলার ওঠে ১২০ টাকায়। আমদানির ওপর কড়াকড়ি আরোপে বাধ্য হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পণ্য আমদানির জন্য এলসি খুলতে না পারার প্রভাব পড়ে নিত্যপণ্যের বাজারে। প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়ে লাগামহীনভাবে। ৬ শতাংশ থেকে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ শতাংশে। দেশের খোলাবাজারে মার্কিন ডলার নিয়ে কারসাজি করায় পাঁচটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া ৪২টি মানি এক্সচেঞ্জকে শোকজ এবং ৯টি প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়। এ ছাড়া মার্কিন ডলারের সংকটকে পুঁজি করে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ায় ৬টি ব্যাংকের এমডিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যাংক খাতে অস্থিরতা
২০২২ সালের শেষের দিকে ব্যাংক খাতের একের পর এক কেলেঙ্কারির ঘটনা ফাঁস হয়। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড থেকে ১১টি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে চারটি প্রতিষ্ঠান নিয়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে তিনটি প্রতিষ্ঠান নিয়েছে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা। অন্তত ৩০ হাজার কোটি টাকা কৌশলে হাতিয়ে নেওয়া হয়। এতে ব্যাংকের ওপর গ্রাহকদের আস্থা কমতে থাকে। এ ছাড়া ব্যাংকে টাকা নেই, এমন গুজবও ছড়ানো হয়। গুজবে কান দিয়ে অনেকেই ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেন; যা নতুন সংকটের জন্ম দেয়। তবে বছর শেষে এই প্রবণতা কমে এসেছে।
অন্যদিকে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ে খেলাপি ঋণ। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৩৩ হাজার কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকায়। সেপ্টেম্বর মাস শেষে ব্যাংক খাতের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। খেলাপিতে পরিণত হয়েছে মোট ঋণের ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
বিলাসীপণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি
আমদানি ব্যয়ের চাপ কমাতে বিলাসীপণ্য আমদানির লাগাম টেনে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক। মোটরকার, হোম অ্যাপ্লায়েন্স হিসেবে ব্যবহৃত ইলেকট্রিক্যাল এবং ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৭৫ শতাংশ নগদ মার্জিন সংরক্ষণ করার কথা বলা হয়। একইসঙ্গে অতি জরুরি পণ্য ছাড়া অন্য সব পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নগদ মার্জিন সংরক্ষণ করতে বলা হয়।
বাণিজ্য ঘাটতি
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এক হাজার ৯৩৫ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়। বিপরীতে রপ্তানি হয়েছে এক হাজার ১৮০ কোটি ডলারের পণ্য। এতে ৭৫৫ কোটি (৭ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন) ডলারের বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়েছে দেশ। বর্তমান বিনিময় হার হিসাবে দেশীয় মুদ্রায় (প্রতি এক ডলার ১০৩ টাকা ৮৫ পয়সা ধরে) এর পরিমাণ ৭৮ হাজার ৩১০ কোটি টাকা।
প্রবাসী আয়ে ধস
চলতি (২০২২-২০২৩) অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই ও আগস্ট) টানা দুই বিলিয়ন ডলার করে রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে। এর পরের মাস সেপ্টেম্বর থেকে টানা তিনমাস দেড় বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে আসে রেমিট্যান্স। সর্বশেষ নভেম্বর মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ১৫৯ কোটি ৪৭ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় (প্রতি ডলার ১০৭ টাকা হিসাবে) এ অর্থ ১৭ হাজর ৬৩ কোটি টাকার বেশি।
আইএমএফের ঋণ
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বেশ কয়েকটি দেশের অর্থনীতিতে মন্দা ও অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। ফলে অনেক দেশই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে সহায়তা প্যাকেজ নিচ্ছে। ডলার সংকটে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কমেছে। ডলারের সরবরাহ বাড়াতে সরকার আইএমএফের কাছে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ চেয়েছে। আগামী জানুয়ারি কিংবা ফেব্রুয়ারি মাসে ঋণ অনুমোদন হতে পারে। তখন প্রথম কিস্তিতে ৪৫ কোটি ডলার পাবে বাংলাদেশ। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক ও এডিবি’র কাছ থেকে চলতি অর্থবছরেই বাজেট সহায়তার কিস্তি মিলতে পারে। ইতোমধ্যে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের বাজেট সহায়তার অর্থ পাওয়া গেছে।
সরকারের ব্যায় সংকোচন নীতি
অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় চলতি বছরে ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করে সরকার। সরকারি সব দপ্তরে বিদ্যুতের ব্যবহার ২৫ শতাংশ কমানো, দেশজুড়ে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং, অধিকাংশ সভা অনলাইনে আয়োজন করা, অত্যাবশ্যক না হলে বিদেশ ভ্রমণ যথাসম্ভব পরিহার করাসহ বেশকিছু পদক্ষেপ নেয় সরকার। এ ছাড়া ছোটো-বড়সহ বেশকিছু প্রকল্পের কাজ স্থগিত করা হয়। ব্যয় সংকোচনের জন্য আপাতত ‘পদ্মা’ ও ‘মেঘনা’ নামে নতুন দুটি প্রশাসনিক বিভাগ করার সিদ্ধান্ত থেকেও সরে আসে সরকার। এমনকি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সম্মেলনেও এবার ৩০ লাখ টাকা ব্যয় কমানো হয়েছে।




