
জাতীয় পার্টির ফাস্ট লেডি ও বিরোধী দলীয় নেত্রী রওশন এরশাদের আলোচিত সুন্দর মহলটিতে নেতাকর্মীদের উৎসবমুখর পরিবেশ নেই। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সুন্দর মহল দলীয় নেতাকর্মীদের পদাচারণায় মুখরিত থাকলেও চলমান দ্বাদশ জাতীয় সংসদের ভোট দুয়ারে কড়া নাড়লেও নেতাকর্মী শূন্য মহলটি এখন সুনশান নীরবতায় অতীতের সব জৌলুস হারিয়েছে। এনিয়েও কৌতূহলের ঘাটতি নেই স্থানীয় বাসিন্দাসহ ভোটারদের মাঝে।
মঙ্গলবার (২৬ ডিসেম্বর) দুপুর দেড়টার দিকে সুন্দর মহলের সামনে গিয়ে দেখা দেখা যায় আনুমানিক ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী দুই শিশুকে নিয়ে খেলা করছে তানজিম মিল্কী নামের পঞ্চম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থী। সে জানায়- রওশন এরশাদের মালিকানাধীন সুন্দর মহল-সংলগ্ন একটি একতলা বাড়ির ভাটাড়ে তারা।
এ সময় সুন্দর মহলে কে আছে? জানতে চাইলে চঞ্চল চপলা টাইপের মিল্কী জানায়, অনেক দিন ধরে সুন্দর মহলে কেউ থাকে না, নেই কেয়ারটেকারও। তবে প্রতিদিন বিকাল হলে কিছু নেতাকর্মী মহল ঘেঁষা জেলা জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে এসে বসলেও সন্ধ্যা নামতেই তারা অফিস তালাবদ্ধ করে বেরিয়ে যায়। এর বাইরে আর কেউ এখন সুন্দর মহলে আসনে না।
কিছুক্ষণ পরেই সুন্দর মহলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা স্থানীয় দোকানি ও বাসিন্দা কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। তারা জানায়, প্রতিবার নির্বাচন আসলে এই বাড়িটি জাঁকজমকপূর্ণ থাকত। রাতদিন ভিড় লেগেই থাকত দলীয় নেতাকর্মীদের। থাকত পুলিশ পাহাড়াও। তবে সাম্প্রতিক দেবর-ভাবির দ্বন্ধে এবারের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেগম রওশন এরশাদ অংশ না নেওয়ায় সুন্দর মহলে আগের সেই জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশ বা নেতাকর্মীদের ভিড় নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদ এমপির পৈত্রিক ভিটা ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী সুতিয়াখালি গ্রামে হলেও ময়মনসিংহ আসলে তিনি বসবাস করেন নগরের ফায়ার সার্ভিস রোডস্থ ‘সুন্দর মহল’ নামক বাসায়। দ্বিতল বিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন এই ভবনটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অন্যতম স্বাক্ষী। ১৯৯৮ সালে রওশন এরশাদের ঢাকার বাসার বাবুর্চি মাদারীপুরের বাসিন্দা আব্দুল হালিমকে স্বপরিবারে ময়মনসিংহ নিয়ে এসে সুন্দর মহল দেখবাল ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই থেকে এই মহলটি আব্দুল হালিমের তত্ত্বাবধানে থাকলেও ২০১৭ সালে মারা যান তিনি। এরপর থেকেই এই মহলটি তালাবদ্ধ। তবে এই সময়ে দুই একবার নেত্রী ময়মনসিংহ আসলে খোলা হয় এই মহলের দরজা।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়েও দলীয় কর্মকাণ্ডেও দেখা দিয়েছে বিভক্তি। এর মধ্যে জাতীয় পার্টির একটি পক্ষ কাদেরপন্থী হয়ে গেলেও অপর অংশটি রয়ে গেছে রওশনের পরীক্ষিত অনুসারি হয়ে। মূলত এই অংশটিই বর্তমানে সুন্দর মহলের আঙ্গিনায় গড়ে তোলা দলীয় কার্যালয়ে এসে মাঝে মাঝে খোশগল্পে সময় কাটান ক্ষণিকের তরে।
জাতীয় পার্টির সদস্য সচিব মোশাররফ হোসেন জানান, মূলত পারিবারিক কলহের কারণেই এবারের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বেগম রওশন এরশাদ। এতে নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা হতাশার সৃষ্টি হওয়ায় অনেকেই স্বতস্ত্রসহ জাতীয় পার্টির প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিলেও কেউ কেই আছে নীরব হয়ে। তবে তার অনুসারীরা সবাই মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে। নির্বাচনের পর নেত্রী নেতাকর্মীদের নিয়ে মতবিনিময় করে পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহন করবেন। বর্তমানেও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নেত্রীর সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে বলে দাবি করেন এই রাজনীতিক।
এনিয়ে কথা হলে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের অনুসারি ও ময়মনসিংহ জেলা জাতীয় পার্টির যুগ্ম আহবায়ক ওয়াহিদুজ্জামান আরজু বলেন, সুন্দর মহল এই নগরের রাজনীতি ও ঐতিহ্যের স্বাক্ষী হলেও এখন আর আগের জৌলস নেই। এর মূল কারণ হলো নেত্রী নির্বাচনে অংশ না নেওয়া। তবে নেত্রী অনেক ভালো মানুষ কিন্তু কিছু সুবিধাবাদি মানুষ তাকে কান কথা শুনিয়ে ভিন্নভাবে প্রভাবিত করে স্বার্থ হাসিল করছে।
সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী হয়ে রওশন এরশাদ ময়মনসিংহ আসলে জীর্ণদশা থেকে চুনকামে নতুন রূপ পায় সুন্দর মহল। এরপর নেতাকর্মীদের ভিড়ে মহলটি সরগরম হয়ে উঠলে বর্তমানে মহলটি আবারও ফিরে গেছে পুরোনো সেই চেহারায়।
তবে বিগত বছরও সুন্দর মহলে চুনকাম করা হয়েছে জানিয়ে দলীয় নেতাকর্মীরা বলেন, বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে বেশি সময় দেওয়ার কারণে রওশন এরশাদ নিজেও খুব একটা আসেন না এ বাড়িতে। ফলে র্দীঘ সময় ধরে তালাবদ্ধ থাকায় একেবারেই নিরব হয়ে পড়েছে সুন্দর মহল।
প্রসঙ্গত, জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ ১৯৫৬ সালে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সাবেক সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদে সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপর স্বামীর রাজনৈতিক সহচর্যে এসে ৫ বার সংসদ সদস্য পদে নির্বচিত হন। এর মধ্যে ১৯৯৬, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসন থেকে এবং ২০০১ সালে গাইবাদ্ধা ও ২০০৮ সালে শশুর এলাকা রংপুর থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন দেশের এই ফাস্ট লেডি।




