
বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান, অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও সাবেক মন্ত্রী সাদেক হোসেন খোকার সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৬৭ বছর বয়সে তিনি মারা যান।
সাদেক হোসেন খোকা মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতি, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং রাজধানী ঢাকার নগর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী ছিলেন।
তার মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। মৃত্যুর সাত বছর পরও মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিক ও অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র হিসেবে তার কর্মজীবন ও রাজনৈতিক ভূমিকা আলোচিত হচ্ছে।
সাদেক হোসেন খোকা ১৯৫২ সালের ১২ মে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্র জীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন তিনি। ষাটের দশকে ছাত্র আন্দোলন ও স্বৈরাচারবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন তিনি।
সাদেক হোসেন খোকা ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতাপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত হন।
স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকা খোকা প্রথমে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে দলটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন। তিনি বিএনপির ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেও দায়িত্ব পালন করেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন।
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সূত্রাপুর-কোতোয়ালি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাদেক হোসেন খোকা। পরে তিনি তৎকালীন বিএনপি সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে পুনরায় নির্বাচিত হয়ে মৎস্য ও পশুসম্পদমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি তিনি ঢাকার নগর প্রশাসনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২০০২ সালের ২৫ এপ্রিল অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন সাদেক হোসেন খোকা। প্রায় নয় বছর তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।
তার মেয়াদকালে রাজধানীর বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা, অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং নগরসেবার নানা বিষয় নিয়ে কাজ করার সুযোগ পান তিনি।
২০১১ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তর ও দক্ষিণ দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে তার দায়িত্বের অবসান ঘটে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নেও তার সম্পৃক্ততা ছিল। তিনি মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ও ফরাশগঞ্জ ক্লাবের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
সাদেক হোসেন খোকা ঢাকা মহানগর ফুটবল সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেন। ক্রীড়াক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তিনি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার লাভ করেন।
২০১৪ সালের ১৪ মে চিকিৎসার জন্য স্ত্রীসহ যুক্তরাষ্ট্রে যান সাদেক হোসেন খোকা। সেখানে তার ক্যানসার শনাক্ত হয় এবং দীর্ঘদিন চিকিৎসা চলতে থাকে।
নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল স্লোন কেটারিং ক্যানসার সেন্টারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
মৃত্যুর পর তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর ঢাকায় কয়েক দফা জানাজা শেষে রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
নিজের জন্মভূমিতে শেষনিদ্রায় শায়িত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ও কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে।
সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তার পরিবার, রাজনৈতিক সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও অনুসারীরা তাকে স্মরণ করছেন। তার রুহের মাগফিরাত কামনায় বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে দিনটি পালিত হচ্ছে।
আরটিভি/আইএম



