ঢাকা শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

দুইদিন ভুমধ্যসাগরে ভেসে মিশরের জেলখানায় ৫৫ বাংলাদেশি

মিশর প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৪ পিএম

ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্নে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলেন ৫৫ বাংলাদেশি। মাত্র ৪০ জনের ধারণক্ষমতার একটি রাবারের নৌযানে ৬৩ জনের সঙ্গে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করা এসব অভিবাসনপ্রত্যাশী সমুদ্রে ভয়াবহ বিপদের মধ্যে পড়েন। শেষ পর্যন্ত একটি ফিলিপাইনের বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের উদ্ধার করে মিশরের পোর্ট সাঈদ বন্দরে নিয়ে আসে।

বর্তমানে ৫৫ বাংলাদেশি পোর্ট সাঈদ সিকিউরিটি সেন্টারের হেফাজতে রয়েছেন। গ্রিসে পৌঁছানোর স্বপ্ন পূরণ না হলেও প্রাণে বেঁচে ফেরাকে তারা বড় স্বস্তি হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে দ্রুত নিরাপদে দেশে ফিরতে চান তারা। উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ আগস্ট ৫৫ বাংলাদেশি ও আট সুদানি নাগরিকসহ মোট ৬৩ জন লিবিয়ার তবরুক এলাকা থেকে গ্রিসের উদ্দেশে একটি রাবারের নৌযানে যাত্রা করেন।

নৌযানটির ধারণক্ষমতা ছিল প্রায় ৪০ জন। একটি স্পিডবোট ইঞ্জিনের সাহায্যে সেটি চলছিল। তবে সমুদ্রযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকর নেভিগেশন ব্যবস্থা নৌযানটিতে ছিল না। যাত্রার আগে মানব পাচারকারীরা তাদের জানিয়েছিল, লিবিয়া থেকে গ্রিসে পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র ২৪ থেকে ২৫ ঘণ্টা। সেই আশ্বাসেই বিপজ্জনক নৌযানে উঠেছিলেন তারা।

কিন্তু যাত্রা শুরুর প্রায় চার ঘণ্টা পরই ঘটে বিপত্তি। নৌযানটি কোনো কিছুর সঙ্গে সংঘর্ষে পড়লে বিকট শব্দ হয়। এরপর যাত্রীরা দেখতে পান, নৌযানের বাইরের বাতাসভরা রাবারের ‘এয়ার চেম্বার’ থেকে দ্রুত বাতাস বের হয়ে যাচ্ছে।

নৌযানটি আরও প্রায় ১২ ঘণ্টা চলার পর এয়ার চেম্বারগুলোর বাতাস উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এতে নৌযানটির ভাসমান সক্ষমতা কমতে থাকে এবং এর একটি অংশ পানির খুব কাছাকাছি নেমে আসে।

এর মধ্যে নেভিগেশন ব্যবস্থা না থাকায় নৌযানটি নির্ধারিত গন্তব্যের দিক থেকেও বিচ্যুত হয়ে পড়ে। সমুদ্রের ঢেউয়ের পানি নৌকার ভেতরে ঢুকতে শুরু করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

দালালদের ফোন করেও মেলেনি সাহায্য-
নৌযানটি আর নিরাপদে পরিচালনা করা সম্ভব না হওয়ায় যাত্রীরা লিবিয়ায় থাকা মানবপাচারকারীদের দেওয়া বিভিন্ন মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করেন। তারা উদ্ধারের জন্য সাহায্য চান। একই সঙ্গে নৌযান থেকে বিভিন্ন সংকেত দিয়ে কাছাকাছি চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। এভাবে আরও প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা তাঁরা মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রে অপেক্ষা করেন। একপর্যায়ে একটি ফিলিপাইনের বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের অবস্থান শনাক্ত করে। পরে জাহাজটি কাছে গিয়ে ৫৫ বাংলাদেশি ও আট সুদানি নাগরিককে উদ্ধার করে।

দুই দিন এক রাত সমুদ্রে-
উদ্ধারের পর বাংলাদেশি ও সুদানি নাগরিকদের নিরাপদে বাণিজ্যিক জাহাজটিতে তুলে নেওয়া হয়। এরপর উদ্ধারস্থল থেকে প্রায় দুই দিন এক রাত সমুদ্রপথে যাত্রা করে জাহাজটি তাঁদের মিশরের পোর্ট সাঈদ বন্দরে নিয়ে আসে এবং ২৭ আগস্ট তাদের সংশ্লিষ্ট মিশরীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

উদ্ধার হওয়া কয়েকজন বাংলাদেশি দূতাবাস কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, সময়মতো বাণিজ্যিক জাহাজটি তাদের উদ্ধার না করলে নৌযানের অবশিষ্ট বাতাসও বের হয়ে যেতে পারত। সে ক্ষেত্রে নৌযানটির ভাসমান সক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল। জীবন রক্ষা পাওয়ায় অনেকেই সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। দূতাবাস কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় কয়েকজন আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। গ্রিসে পৌঁছানোর চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করলেও তাঁদের প্রত্যেকের প্রত্যাশা—দ্রুত ও নিরাপদে দেশে ফেরা।

পরিচয় যাচাইয়ে দূতাবাসের তৎপরতা
ঘটনার পর থেকেই বাংলাদেশ দূতাবাস মিশরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। গত ৪ সেপ্টেম্বর দূতাবাসের কর্মকর্তারা পোর্ট সাঈদে গিয়ে সুয়েজ ক্যানাল কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং আটক ৫৫ বাংলাদেশির পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নেন। পরে তাঁরা আটক বাংলাদেশিদের প্রত্যেকের সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলেন এবং তাঁদের পরিচয়, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্যসহ প্রয়োজনীয় কনস্যুলার তথ্য সংগ্রহ করেন। দূতাবাসের পক্ষ থেকে তাঁদের শারীরিক অবস্থা ও সার্বিক পরিস্থিতিরও খোঁজ নেওয়া হয়।

দালালদের দিয়েছেন ১০ থেকে ২৩ লাখ টাকা
দূতাবাসের এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের অনেকেই ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের বিভিন্ন সময়ে পৃথকভাবে লিবিয়ায় যান। সেখানে ইউরোপে অনিয়মিতভাবে যাওয়ার ব্যবস্থা করে এমন মানবপাচারকারী বা দালালচক্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়। দালালদের সঙ্গে তাদের কোনো লিখিত চুক্তি ছিল না। মৌখিক সমঝোতার ভিত্তিতেই ইউরোপে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিরা এই কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন, ইউরোপে যাওয়ার আশায় তাঁদের অনেকে জমি-জমা ও অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করেছেন। কেউ নিয়েছেন ঋণ, আবার কেউ পরিবারের সঞ্চিত অর্থ ব্যবহার করে দালালদের তাঁরা ১০ লাখ থেকে ২৩ লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন।

দেশে ফেরানোর উদ্যোগ দূতাবাসের
ঘটনার পর থেকেই বাংলাদেশ দূতাবাস পোর্ট সাঈদের স্থানীয় পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের প্রয়োজনীয় কনস্যুলার ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন। মিশরের প্রচলিত আইন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ৫৫ বাংলাদেশিকে দ্রুততম সময়ে নিরাপদে দেশে ফেরানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান দূতাবাস কর্মকর্তা।

মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা জরুরি
সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়া থেকে রাবারের নৌযানে করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে অনিয়মিতভাবে প্রবেশের প্রবণতা বেড়েছে। এসব নৌযানে প্রায়ই ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে নৌযানগুলো সমুদ্রযাত্রার উপযোগী নয়; থাকে না পর্যাপ্ত নেভিগেশন ব্যবস্থাও।

ফলে নৌযান বিকল হয়ে যাওয়া, দিকভ্রষ্ট হওয়া, সমুদ্রে আটকা পড়া, ডুবে যাওয়া এবং প্রাণহানির ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। তারপরও মানবপাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে বিপুল অর্থ ব্যয় করে অনেক বাংলাদেশি এই ভয়ংকর পথে পা বাড়াচ্ছেন।

দূতাবাসের পক্ষ থেকেও মানবপাচারের ঝুঁকি এবং ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অনিয়মিত অভিবাসনের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে লিবিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় রুটে সক্রিয় মানবপাচারকারী চক্র এবং তাদের সহযোগীদের শনাক্ত করে কার্যকর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পোর্ট সাঈদে উদ্ধার হওয়া ৫৫ বাংলাদেশির ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল—ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্নে দালালদের হাতে বিপুল অর্থ তুলে দিয়ে অনিরাপদ নৌযানে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করা এই ৫৫ বাংলাদেশি শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি। তবে সবচেয়ে বড় কথা, তারা অন্তত প্রাণ নিয়ে ফিরেছেন। তাদের এই অভিজ্ঞতা ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নে একই পথে পা বাড়াতে চাওয়া আরও অসংখ্য অভিবাসনপ্রত্যাশীর জন্য হতে পারে এক কঠিন সতর্কবার্তা।

আরটিভি/এমএ

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
পর্তুগালের রাষ্ট্রপতির কাছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র পেশ
পর্তুগালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ড. এস এম কামরুল হাসান পর্তুগিজ প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতির কাছে তার পরিচয়পত্র পেশ করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পর্তুগালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। সোমবার (১৯ অক্টোবর) লিসবনের বেলেম প্রাসাদে তিনি তার পরিচয়পত্র পেশ করেন। পর্তুগালের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রদূত ড. এস এম কামরুল হাসান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও সরকারপ্রধানের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও আন্তরিক অভিবাদন জানান। তিনি ঢাকায় পর্তুগালের একটি আবাসিক কূটনৈতিক মিশন স্থাপনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, এই পদক্ষেপ ঘনিষ্ঠতর কূটনৈতিক যোগাযোগ সহজ করবে, প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করবে এবং দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে সহায়ক হবে। তিনি একটি দ্বিপাক্ষিক শ্রমগতিশীলতা কাঠামোর আওতায় সহযোগিতা কার্যকর ও এগিয়ে নেওয়া, নিয়মিত ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনকে উৎসাহিত করা এবং বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন। জনগণের মধ্যে সংযোগের গুরুত্ব তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আকাশপথে যোগাযোগ স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেন। পর্তুগালের রাষ্ট্রপতি দেশটিতে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির অবদানের স্বীকৃতি দেন ও তাদের প্রশংসা করেন এবং পর্তুগিজ সমাজে তাদের একীভূত হওয়ার গুরুত্বের বিষয়টি উল্লেখ করেন। আলোচনায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, সামুদ্রিক বিষয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) এবং জনগণের মধ্যে আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও গভীর করার সম্ভাবনার বিষয়টিও উঠে আসে। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থ এগিয়ে নিতে, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক জোরদার করতে এবং দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে উভয় দেশের জনগণের পারস্পরিক কল্যাণে বাস্তব ফলাফলে রূপান্তরিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আরটিভি/টিআর
পর্তুগালের রাষ্ট্রপতির কাছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র পেশ
মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসে লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস পালন
প্রাচীন সভ্যতার দেশ মিশরের রাজধানী কায়রোয় বাংলাদেশ দূতাবাসে বাংলার মরমি সাধক, মানবতাবাদী দার্শনিক ও কালজয়ী বাউল সংগীতসাধক ফকির লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস পালন করা হয়েছে। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে লালনের জীবন, দর্শন ও সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে মানবতা, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও সম্প্রীতির চিরন্তন বার্তা তুলে ধরা হয়। সোমবার (১৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় দূতাবাসের হলরুমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মিশরে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত গৌতম কুমার দে। জি এম মেহেদী হাসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন রেজাউল করিম, মাসুদ করিম চৌধুরী, নোমান করিম আজহারী ও দূতাবাসের শ্রম সচিব মো. জাকির হোসেন। বক্তারা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে লালন সাঁইয়ের অবিস্মরণীয় অবদান তুলে ধরেন। তারা বলেন, লালনের গান ও দর্শন জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও সামাজিক পরিচয়ের বিভেদ অতিক্রম করে মানবতা, সাম্য, ভালোবাসা ও সামাজিক সম্প্রীতির শিক্ষা দেয়। তার কালজয়ী সৃষ্টি আজও মানুষকে উদারতা, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করে। সভাপতির বক্তব্যে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত গৌতম কুমার দে উপস্থিত অতিথিদের স্বাগত জানান এবং বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক ও মানবতাবাদী চিন্তাবিদ লালন সাঁইয়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি বলেন, ফকির লালন সাঁইয়ের গান ও দর্শন জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও সামাজিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সাম্য, মৈত্রী, প্রেম, সহনশীলতা ও সম্প্রীতির চিরন্তন বাণী বহন করে। ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও সামাজিক বৈষম্যের বিপরীতে মানবতার জয়গান গাওয়া তাঁর দর্শন আজও বিশ্বজুড়ে শান্তিকামী মানুষ, মানবতাবাদী চিন্তাবিদ ও মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাসীদের অনুপ্রাণিত করে। লালন সাঁইয়ের কালজয়ী দর্শনের তাৎপর্য তুলে ধরে গৌতম কুমার দে বলেন, তার সৃষ্টি বাঙালির সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ভৌগোলিক ও ধর্মীয় সীমানা অতিক্রম করে লালনের গান প্রচলিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গোঁড়ামিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে এবং মানবধর্মের চেতনাকে সমুন্নত করেছে। ধর্ম, বর্ণ ও সামাজিক পরিচয়ের বিভেদ পেরিয়ে অভিন্ন মানবসত্তাকে উপলব্ধি করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, সহিষ্ণু, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে লালনের শিক্ষা আজও গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা জোগায়। বাউল সম্প্রদায়ের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক সাধনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত বলেন, বাউল সংস্কৃতি বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার মতে, সহনশীলতা, মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ক্ষেত্রে লালন সাঁইয়ের দর্শন বর্তমানের অনিশ্চিত ও জটিল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। লালনের সৃষ্টি বাংলাদেশের সমৃদ্ধ লোকজ ঐতিহ্য এবং অসাম্প্রদায়িক, উদার ও মানবতাবাদী পরিচয়ের উজ্জ্বল প্রতিফলন। নতুন প্রজন্মের মধ্যে লালন সাঁইয়ের মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক দর্শন ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণ ও চর্চার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে লালনের জীবনদর্শন পৌঁছে দিতে হবে। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশি শিল্পীরা লালনগীতি ও দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন। শিশুদের মনোমুগ্ধকর নৃত্য পরিবেশনাও উপস্থিত অতিথিদের মুগ্ধ করে। এসব সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে অতিথিরা বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক স্বতন্ত্র ধারার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে লালন সাঁইয়ের জীবন, দর্শন এবং বাঙালি সমাজ, সংস্কৃতি ও সাহিত্যে তার অবদান নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানে মিশরে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্য, দেশটির বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, পেশাজীবী এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে অতিথিদের বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। আরটিভি/টিআর
মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসে লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস পালন
সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, নজরুলের পুরোনো ফেসবুক পোস্ট ঘিরে শোক
ঋণ করে সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নজরুল ইসলাম মাহিন। কিন্তু পরিবারের স্বপ্ন পূরণের আগেই শেষ হলো তার জীবন। মক্কায় তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে গ্রেপ্তারের আগে লেখা তার ফেসবুক পোস্টগুলো। ‘চিন্তা কমাতেও চিন্তা করতে হয় মধ্যবিত্ত সন্তানদের’২০২৩ সালের ৩ মে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এমন আক্ষেপের কথা লিখেছিলেন নজরুল ইসলাম মাহিন। পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় সাত লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তিনি। তবে প্রবাসে গিয়ে আর পরিবারের দুশ্চিন্তা দূর করা হয়নি তার। পরিবারের সদস্যদের দাবি, তিন বছর তিন মাস কারাগারে থাকার পর বুধবার (১৪ অক্টোবর) সৌদি আরবের মক্কায় নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এ খবর জানাজানি হওয়ার পর তার পুরোনো ফেসবুক পোস্টগুলো ঘিরে শোক প্রকাশ করছেন অনেকে। নজরুলের ফেসবুক প্রোফাইল ঘুরে দেখা যায়, প্রবাসজীবনের শুরু থেকেই মধ্যবিত্ত পরিবারের নানা সংকট, স্বপ্ন ও বাস্তবতা নিয়ে লিখতেন তিনি। ২০২২ সালের ১৩ নভেম্বর দেশ ছাড়ার সময় বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে তোলা একটি ছবি পোস্ট করে নজরুল লিখেছিলেন, ‘গুড বাই বাংলাদেশ। সবাই অনেক মনে পড়ছে, সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।’ সৌদি আরবে যাওয়ার পর একই বছরের ২৯ নভেম্বর আরেকটি পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ভাব নেয়াটা আমাকে মানায় নাহ, কারণ আমি মধ্যবিত্ত।’ এরপর ২০২৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঘাসের ওপর শুয়ে থাকা একটি ছবি প্রকাশ করে তিনি লেখেন, ‘পকেটে টাকা থাকলে তোমরা দুনিয়া কিনতে পারবে।’ একই বছরের ৩ মে মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের দুশ্চিন্তা নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন নজরুল। তার সেই লেখাটি এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পরবর্তী সময়ে মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ পান নজরুল। ২০২৩ সালের ৮ মার্চ কাবা শরিফের সামনে নীল রঙের ইউনিফর্ম পরা নিজের একটি ছবি পোস্ট করে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। ছবিটির ক্যাপশনে লিখেছিলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ ক্লিনার মক্কা হেরাম শরিফ।’ নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশের পর তার ওই পোস্টেও শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছেন অনেকে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের নভেম্বরে সৌদি আরবে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর মক্কার একটি মসজিদে এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে নজরুলসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে দেশটির পুলিশ। এরপর থেকে কারাগারেই ছিলেন তিনি। পরিবারের দাবি, কারাগারে থাকা অবস্থায় প্রতি রোববার স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতেন নজরুল। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারকে কিছু জানানো হয়নি। গণমাধ্যম ও ফেসবুকে প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ছেলের মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারেন তারা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা নজরুল চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর শুনে ওই দিন রাতেই হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার ফুফু আবেদা বেগম। নজরুলের মা রহিমা বেগম বলেন, কারাগারে থাকার সময় ছেলে নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। কিন্তু হঠাৎ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পেয়ে তারা ভেঙে পড়েছেন। নজরুলের বাবা আব্দুল বাছিরের আক্ষেপ, সাত লাখ টাকা ঋণ করে সংসারের হাল ধরতে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় কারাগারে চলে যেতে হয় নজরুলকে। এর মধ্যে পরিবারকে মাত্র দেড় লাখ টাকা পাঠাতে পেরেছিলেন তিনি। ছেলের মৃত্যুর পর একদিকে ঋণদাতাদের চাপ, অন্যদিকে সন্তান হারানোর শোক—দুই সংকটে পড়েছেন পরিবারটি। নজরুল কী কারণে কারাগারে ছিলেন, সে বিষয়েও বিস্তারিত জানতেন না বলে দাবি করেছেন তার বাবা। এখন অন্তত ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা চান তিনি। নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় তিন বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সামাজিক সংগঠকেরা। তাদের দাবি, দ্রুত সরকারি উদ্যোগে নজরুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স সোসাইটির (এইচআরডিএস) ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. সুজন সরকার বলেন, প্রবাসে কাজ করতে গিয়ে কোনো রেমিট্যান্সযোদ্ধার এমন পরিণতি অত্যন্ত দুঃখজনক। বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হলে হয়তো এমন পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো বলে মন্তব্য করেন তিনি। সামাজিক সংগঠক শামীম আহমেদ বলেন, তিন বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের দুজন নাগরিক সৌদি আরবে কারাগারে ছিলেন। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। শামীম আহমেদ আরও বলেন, সৌদি আরবে নারী কর্মীদের যৌন হয়রানি ও অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে এসেছে। এসব ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকেও কোনো আবেদন করা হয়নি। মরদেহ দেশে এলে নিয়ম অনুযায়ী সহায়তা করা হবে। নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরের পর তার পরিবারের সদস্যরা এখন ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষায় রয়েছেন। ঋণের বোঝা ও স্বজন হারানোর শোকের মধ্যে তাদের দাবি, দ্রুত সরকারি উদ্যোগে মরদেহ ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক। আরটিভি/এসকে
সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, নজরুলের পুরোনো ফেসবুক পোস্ট ঘিরে শোক
বাংলাদেশিদের বড় সুখবর দিলো জাপান
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য জাপানে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে কর্মসংস্থানসংক্রান্ত নতুন চুক্তি ইএসডিপি-এমওসি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া শুরু করবে জাপান।
বাংলাদেশিদের বড় সুখবর দিলো জাপান
সৌদিতে আগুনে পুড়ে বাংলাদেশির মৃত্যু
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে কাভার্ড ভ্যানে আগুনে পুড়ে মো. শামীম রেজা নামে এক বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যু হয়েছে। দীর্ঘ প্রবাসজীবনের ইতি টেনে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি।
সৌদিতে আগুনে পুড়ে বাংলাদেশির মৃত্যু