
মসজিদে নামাজ আদায়ের সময় কখনো কখনো নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। সামনে সুতরা থাকলে তার বাইরে দিয়ে যাতায়াত করা যায়। কিন্তু সুতরা না থাকলে কোথা দিয়ে যাওয়া যাবে, আর নামাজির সামনে দিয়ে গেলে কী শাস্তি—এ নিয়ে অনেকের মধ্যে নানা ধারণা রয়েছে।
বিশেষ করে প্রচলিত একটি কথা হলো, নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে যাতায়াত করলে নাকি ৪০ দিনের ইবাদত নষ্ট হয়ে যায়। বিভিন্ন মসজিদের দেয়ালেও কখনো এমন কথা লেখা দেখা যায়। তবে কোরআন-হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, বিষয়টি আসলে এমন নয়।
নামাজির সামনে দিয়ে যাওয়ার বিষয়ে কঠোর সতর্কতা
নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে অতিক্রম করা থেকে বিরত থাকতে হাদিসে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।
আবু নাজর (রহ.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَوْ يَعْلَمُ الْمَارُّ بَيْنَ يَدَيِ الْمُصَلِّي مَاذَا عَلَيْهِ لَكَانَ أَنْ يَقِفَ أَرْبَعِينَ خَيْرًا لَهُ مِنْ أَنْ يَمُرَّ بَيْنَ يَدَيْهِ
অর্থ: ‘নামাজির সামনে দিয়ে অতিক্রমকারী যদি জানত, এতে তার কী পরিণতি রয়েছে, তাহলে তার সামনে দিয়ে অতিক্রম করার চেয়ে ৪০ সময় দাঁড়িয়ে থাকাকেই সে উত্তম মনে করত।’
বর্ণনাকারী আবুন নাজর (রহ.) বলেন, ‘আমি জানি না, তিনি ৪০ দিন, ৪০ মাস নাকি ৪০ বছর বলেছেন।’
—সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৭০১
অর্থাৎ, হাদিসে ৪০-এর কথা বলা হলেও এটি ৪০ দিন, ৪০ মাস বা ৪০ বছর—কোনটি বোঝানো হয়েছে, তা নির্দিষ্ট নয়।
তাহলে কি ৪০ দিনের ইবাদত নষ্ট হয়?
নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে অতিক্রম করা অবশ্যই গুরুতর নিষেধের বিষয়। তবে এ কারণে ৪০ দিনের ইবাদত নষ্ট হয়ে যায়—এমন কোনো বক্তব্য কোরআন বা নির্ভরযোগ্য হাদিসে নেই।
হাদিসে ৪০-এর কথা এসেছে অতিক্রমের ভয়াবহতা বোঝাতে; এটিকে ৪০ দিনের ইবাদত নষ্ট হওয়ার অর্থে নেওয়া ঠিক নয়।
নামাজের সামনে সুতরা রাখার নিয়ম
নামাজ আদায়কারীর জন্য সামনে সুতরা রাখা উত্তম। সুতরা হলো এমন কোনো বস্তু, যা নামাজির সামনে সীমারেখা হিসেবে থাকে। বল্লম, লাঠি, চেয়ার, টুল বা এ ধরনের কোনো বস্তু সুতরা হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
আওন ইবনে আবু জুহাইফা (রহ.) তাঁর বাবার সূত্রে বর্ণনা করেন—
‘একবার দুপুরে আমাদের সামনে আল্লাহর রাসুল (সা.) এলেন। তাঁকে অজুর পানি দেওয়া হলো। তিনি অজু করে আমাদের নিয়ে জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করলেন। তাঁর সামনে একটি বল্লম ছিল। এর বাইরে দিয়ে নারী ও গাধা চলাচল করছিল।’
—সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৬৯
এ হাদিস থেকে নামাজের সময় সামনে সুতরা রাখার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
সুতরা না থাকলে কী করবেন?
নামাজির সামনে সুতরা না থাকলে তার একেবারে সামনে দিয়ে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। তবে মসজিদ অনেক বড় ও প্রশস্ত হলে এবং প্রয়োজন দেখা দিলে নামাজির সামনে থেকে দূরে, কয়েক কাতার সামনে দিয়ে যাতায়াতের সুযোগ রয়েছে—ফিকহের কিছু গ্রন্থে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا وَضَعَ أَحَدُكُمْ بَيْنَ يَدَيْهِ مِثْلَ مُؤَخِّرَةِ الرَّحْلِ فَلْيُصَلِّ، وَلَا يُبَالِي مَنْ مَرَّ وَرَاءَ ذَلِكَ
অর্থ: ‘তোমাদের কেউ যখন নিজের সামনে উটের পিঠের কাষ্ঠাসনের পেছনের অংশের মতো কিছু রাখে, তখন সে নামাজ আদায় করবে এবং এর বাইরে দিয়ে কেউ অতিক্রম করলে তাতে কোনো অসুবিধা নেই।’
—সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৯৪০
সামনে থাকলে কীভাবে সরে যাবেন?
নামাজির একেবারে সামনে অবস্থান করার প্রয়োজন হলে সরাসরি সামনে দিয়ে না গিয়ে ডানে বা বামে সরে যাওয়া যায়। কারণ, সামনে থেকে সরে যাওয়া অতিক্রম করার মতো নয়।
আয়েশা (রা.) বলেন—
‘আমি নবী (সা.)-কে নামাজ পড়তে দেখেছি। আমি তাঁর ও কিবলার মাঝখানে খাটে শুয়ে থাকতাম। কোনো কোনো সময় আমার বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হতো। কিন্তু তাঁর সামনে দিয়ে যেতে আমি অপছন্দ করতাম। তাই আমি চুপিসারে সরে যেতাম।’
—সহিহ বুখারি, হাদিস ৫১১
তাই মসজিদে নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে অযথা যাতায়াত না করাই উচিত। একই সঙ্গে নামাজ আদায়কারীরও সম্ভব হলে সামনে সুতরা রাখা উচিত।
সবশেষে মনে রাখা দরকার, নামাজির সামনে দিয়ে যাওয়া গুরুতরভাবে নিষেধ করা হলেও এতে ৪০ দিনের ইবাদত নষ্ট হয়ে যায়—এমন কথা কোরআন-হাদিসে নেই। হাদিসে ‘৪০’ সংখ্যাটি এসেছে এ কাজের ভয়াবহতা বোঝাতে; ৪০ দিনের ইবাদত নষ্ট হওয়ার নির্দিষ্ট বিধান হিসেবে নয়।
আরটিভি/জেএমএ

