
মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক কোরআন তিলাওয়াত ও হিফজ প্রতিযোগিতায় পুরুষদের হিফজ বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন বাংলাদেশের এহতিশামুল হক হিরা। ঢাকার মারকাযু ফয়জিল কোরআন আল ইসলামীর এ প্রতিযোগী ৯৭ নম্বর পেয়ে যৌথভাবে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। তার এ সাফল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন মালয়েশিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশিরা।
পাঁচ দিনব্যাপী ৬৬তম আন্তর্জাতিক কোরআন তিলাওয়াত ও হিফজ প্রতিযোগিতা গত ৬ অক্টোবর শুরু হয়ে শুক্রবার শেষ হয়। কুয়ালালামপুরের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে (ডব্লিউটিসি) আয়োজিত প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। শনিবার (১০ অক্টোবর) বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
পুরুষদের হিফজ বিভাগে বাংলাদেশের এহতিশামুল হক হিরার সঙ্গে ৯৭ নম্বর পেয়ে যৌথভাবে প্রথম হয়েছেন সিরিয়ার আবদুল রহমান জামাল ইব্রাহিম। এ বিভাগে ৯৬ দশমিক ৩৩ নম্বর পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন স্বাগতিক মালয়েশিয়ার মুহাম্মদ ইজ্জুল আফনান সাজালি।
প্রতিযোগিতার নারীদের তিলাওয়াত বিভাগে ৯১ দশমিক ৮৩ নম্বর পেয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন মালয়েশিয়ার নুর শাকুরা মোহাম্মদ মুসা। ৯১ নম্বর পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন সিঙ্গাপুরের আতিকাহ বিনতে সুহাইমি। আর ৯০ দশমিক ৮৩ নম্বর নিয়ে তৃতীয় হয়েছেন ব্রুনেইয়ের দায়াংকু সিতি উম্মি শায়জানা বিনতে পেঙ্গিরান হাজি মারজুকি।
পুরুষদের তিলাওয়াত বিভাগে ৯৪ দশমিক ৬৭ নম্বর পেয়ে প্রথম হয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার মুহাম্মদ ফাউজি রিদওয়ান। ৯২ দশমিক ৯৯ নম্বর নিয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন মালয়েশিয়ার সিক হাসনুল তাকিয়ুদ্দিন সিক সাজালি। এ বিভাগে ৯২ দশমিক ১৭ নম্বর পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন বেলজিয়ামের ব্রাহিম বুগালাব।
নারীদের হিফজ বিভাগে ৯৬ দশমিক ১৭ নম্বর পেয়ে প্রথম হয়েছেন নাইজারের চাফাতু ইসুফু। ৯৫ দশমিক ৫০ নম্বর নিয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন লিবিয়ার মিন্নাহ আলী আলসুদানি আগনাইয়াহ। আর ৯৫ নম্বর পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন মিয়ানমারের থেইন গি মোন।
আন্তর্জাতিক কোরআন হিফজ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সাফল্যের ইতিহাস কয়েক দশকের। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংরক্ষিত তথ্য সমন্বয় করে দেখা গেছে, ১৯৮২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি হাফেজরা মোট ৪৩টি প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। এ সময়ে ৩৫ জন বাংলাদেশি হাফেজ এ সাফল্য পেয়েছেন। একই প্রতিযোগী একাধিকবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় বিজয়ীর সংখ্যা ও প্রথম স্থান অর্জনের সংখ্যা আলাদা।
হুফ্ফাজুল কোরআন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮২ সালে লিবিয়ায় কারি আবদুল হকের প্রথম স্থান অর্জনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের এ সাফল্যের ধারার সূচনা হয়। এরপর ১৯৯৪ সালে ইরানে সাখাওয়াত হোসাইন এবং ১৯৯৬ সালে একই দেশে মাহমুদুল হাসান চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৯৯ সালে মিশরে ইমদাদুল্লাহ এবং ইরানে ফরিদ আহমদ প্রথম স্থান অর্জন করেন।
পরবর্তী বছরগুলোতেও বাংলাদেশের হাফেজদের সাফল্য অব্যাহত থাকে। ২০০০ সালে মিশরে নাবিল ওয়ালিদ, ২০০১ সালে ইব্রাহিম বিন হেলাল, ২০০২ সালে জর্ডানে হোসাইন আহমাদ এবং ২০০৩ সালে মিশরে আবদুল কাদির প্রথম স্থান অর্জন করেন। ২০০৭ সালে দুবাইয়ে এবং ২০০৯ সালে মিশরে চ্যাম্পিয়ন হন ফজলে রাব্বি আদেল। ২০১০ সালে জর্ডানে মো. সাইফুল ইসলাম এবং ২০১১ সালে ইরানে হাফেজ সালাহউদ্দিন শীর্ষস্থান অর্জন করেন।
২০১২ সালে সৌদি আরবে পৃথক বিভাগে প্রথম হন মো. তানভীর হোসাইন, এহসান উদ্দিন নোমান ও মুহাম্মদ সাদ সুরাইল। ২০১৩ সালে সৌদি আরবে মো. ইমাদুল্লাহ, জর্ডানে ফারিয়া তাসলিম এবং দুবাইয়ে হাফেজ নাজমুস সাকিব চ্যাম্পিয়ন হন। ২০১৪ সালে সৌদি আরবে নাজমুস সাকিব এবং মিশরে অনুষ্ঠিত ২১তম আন্তর্জাতিক হিফজ প্রতিযোগিতায় হাফেজ মোহাম্মদ জাকারিয়া প্রথম স্থান অর্জন করেন।
২০১৫ সালে সুদানে চ্যাম্পিয়ন হন নাজমুস সাকিব। একই বছর মিশরে পৃথক বিভাগে নাহিয়ান কায়সার ও মুহিব্বুল্লাহ এবং জর্ডানে সাঈদ হাসান প্রথম হন। ২০১৬ সালে তুরস্কে আবদুল আখের এবং বাহরাইনে হাফেজ মোহাম্মদ জাকারিয়া চ্যাম্পিয়ন হন।
২০১৭ সালে সৌদি আরব ও মিশরে আবদুল্লাহ আল মামুন এবং দুবাইয়ে তারিকুল ইসলাম প্রথম স্থান অর্জন করেন। ২০১৮ সালে মিশরে মুজাহিদুল ইসলাম এবং ২০১৯ সালে জর্ডানে মো. সাইফুর রহমান ত্বাকী চ্যাম্পিয়ন হন। ২০২১ সালে ইরান এবং ২০২৩ সালে দুবাইয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন হাফেজ সালেহ আহমদ তাকরিম।
২০২৪ সালেও একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হাফেজরা সাফল্য পান। ওই বছর ইরানে বশির আহমদ, সৌদি আরবে আনাস বিন আতিক, তুরস্কে মুআজ মাহমুদ, কুয়েতে আনাস মাহফুজ এবং সেনেগালে অনুষ্ঠিত ১১তম আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় হাফেজ আবু রাইহান প্রথম হন। একই বছর সৌদি আরবে ১৫ পারা হিফজ বিভাগেও চ্যাম্পিয়ন হন মুআজ মাহমুদ।
২০২৫ সালে মিশরে প্রথম স্থান অর্জন করেন আনাস বিন আতিক। ২০২৬ সালে মালয়েশিয়ায় হাফেজ ইব্রাহিম শেখ এবং সৌদি আরবে ১৫ পারা হিফজ বিভাগে হাফেজ মোহাম্মদ নুরুদ্দিন জাকারিয়া চ্যাম্পিয়ন হন।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দ্বীনি দাওয়াত ও সংস্কৃতি বিভাগের সংরক্ষিত তথ্যে ১৯৯৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের হাফেজদের ৩৭টি প্রথম স্থান অর্জনের তথ্য রয়েছে। এর বাইরে ১৯৮২ সালে কারি আবদুল হকের সাফল্যসহ বিভিন্ন বছরের আরও কয়েকটি বিজয়ের তথ্য পাওয়া গেছে হুফ্ফাজুল কোরআন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক কিরাত সংস্থা বাংলাদেশের কাছ থেকে।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য সমন্বয় করে পাওয়া এ হিসাব বাংলাদেশের হিফজ শিক্ষার ধারাবাহিক অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ সাফল্য ধরে রাখতে তাজবিদ, ওয়াকফ-ইবতিদা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
আরটিভি/এসকে


