ঢাকা বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩

সিঁদুর খেলায় দুর্গার বিদায়, ‘আসছে বছর আবার হবে’

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৫ পিএম
বিজয়া দশমীতে রাজধানীর পূজামণ্ডপে একে ওপরকে সিঁদুর পরিয়ে বিদায় জানানোর আয়োজনে মেতেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বী নারীরা।  ছবি: সংগৃহীত

ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে মুখর রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ। দেবীর চরণে সিঁদুর নিবেদন, শেষ পুষ্পাঞ্জলি ও সিঁদুর খেলায় মেতে উঠেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। আনন্দের সঙ্গে মিশেছে বিদায়ের বিষাদ। ভক্তদের কণ্ঠে কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে, ‘আসছে বছর আবার হবে’।

বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপে পূজা, দেবীবরণ ও সিঁদুর খেলার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর আয়োজন চলছে। পাঁচ দিনের শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিনে সকাল থেকেই মণ্ডপগুলোতে ভক্তদের ভিড় দেখা যায়।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পুত্র-কন্যাদের নিয়ে কৈলাসে স্বামীর ঘরে ফিরে যাবেন দেবী দুর্গা। এক বছর পর নতুন শরতে আবারও ধরায় আসবেন তিনি।

বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্কের গুলশান-বনানী পূজামণ্ডপে সকাল থেকেই দেবীকে বরণ করতে জড়ো হন শত শত নারী। বরণের থালায় ছিল সিঁদুর, পান, ফুল ও মিষ্টি। কারও হাতে ছিল শঙ্খ, প্রদীপ ও কলস।

একে একে নারীরা দেবীর মুখে মিষ্টি ছোঁয়ান এবং চরণে সিঁদুর নিবেদন করেন। এরপর শুরু হয় সিঁদুর খেলা। প্রথমে দেবীকে সিঁদুর পরিয়ে পরে একে অপরের কপাল ও গালে সিঁদুর মাখিয়ে আনন্দে মেতে ওঠেন তারা। ঢাকের বাদ্য ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মণ্ডপ।

গুলশান-বনানী পূজামণ্ডপের প্রধান পুরোহিত সুনীল চক্রবর্তী বলেন, সকাল ৮টা ৫ মিনিটে দশমীর পূজা শুরু হয়। এ সময় শ্যামা পূজা, অপরাজিতা পূজা ও দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন দেবদেবীর আরাধনা করা হয়। ধর্মীয় আচার শেষে দর্পণ বিসর্জন দেওয়া হয়। পরে ভক্তরা দেবীর চরণে শেষ পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করেন।

সিঁদুর খেলার তাৎপর্য তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, স্বামীর দীর্ঘায়ু ও কল্যাণ কামনায় বিবাহিত নারীরা এই আয়োজনে অংশ নেন। সকাল ১০টার পর থেকে সিঁদুর খেলা শুরু হয়।

রাজধানীর রমনা কালী মন্দিরেও সকাল থেকেই ভক্তদের ভিড় দেখা যায়। বেলা ১১টার দিকে মন্দির প্রাঙ্গণে ছিল হাজারো মানুষের পদচারণা। একদিকে চলছিল বিদায়ী আরতি ও দেবীর চরণে শেষ অঞ্জলি, অন্যদিকে নাচে-গানে মেতে ওঠেন দর্শনার্থীরা।

ঢাকের তাল, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির এলাকা। নারী-পুরুষের পাশাপাশি তরুণ ও শিশুরাও উৎসবে অংশ নেয়। অনেক স্বামীকে তাঁদের স্ত্রীর কপালে সিঁদুর পরিয়ে পরিবারের মঙ্গল কামনা করতেও দেখা যায়।

স্বামীর সঙ্গে মন্দিরে আসা ভক্ত অনিন্দিতা দেবনাথ বলেন, মায়ের কাছে সবার সুস্থতা ও ভালো থাকার প্রার্থনা করেছেন তিনি। সবাই মিলে সিঁদুর খেলার আনন্দ উপভোগ করতেই প্রতি বছর মন্দিরে ছুটে আসেন।

বিদায়ের বিষাদ ভুলে বন্ধুদের সঙ্গে নাচে-গানে মেতে ওঠেন তরুণ অর্ঘ্য রায়। তিনি বলেন, মা আবার ফিরে আসবেন—এই বিশ্বাস থেকেই তারা বিদায়ের দিনটিকে আনন্দময় করে রাখার চেষ্টা করেন। তাদের প্রত্যাশা, ‘আসছে বছর আবার হবে’।

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরেও সকাল থেকে ছিল ভক্তি ও বিষাদের মিশ্র আবহ। সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটে দশমীর পূজা ও দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবীর পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। এরপর বেলা ১১টা থেকে শুরু হয় দেবীবরণ। দুপুর ১২টায় শুরু হয় সিঁদুর খেলা।

লাল-সাদা শাড়িতে সজ্জিত নারীরা ঢাকের তালে সিঁদুর খেলায় অংশ নেন। একে অপরের কপাল ও গালে সিঁদুর মাখিয়ে তারা স্বামীর দীর্ঘায়ু এবং পরিবারের কল্যাণ কামনা করেন।

বনানী পূজামণ্ডপে আসা ভক্ত রিম্পা সেন বলেন, সারা বছর এই কয়েক দিনের জন্য অপেক্ষা করেন তারা। দেখতে দেখতে উৎসবের দিনগুলো শেষ হয়ে যাওয়ায় মন খারাপ হচ্ছে। তবে তার বিশ্বাস, মা দুর্গা সবাইকে বিপদ থেকে রক্ষা করবেন এবং আগামী বছর আবার ফিরে আসবেন।

আরেক ভক্ত সুচরিতা চৌধুরী বলেন, দেবীর চরণে সিঁদুর নিবেদন করে পরিবারের সবার মঙ্গল ও স্বামীর দীর্ঘায়ু কামনা করেছেন তিনি। তার মতে, বিজয়ার সিঁদুর খেলা শুধু একটি প্রথা নয়, এটি পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও দৃঢ় করার উপলক্ষ।

রমনা কালী মন্দিরে আসা দেবব্রত চক্রবর্তী বলেন, বিসর্জনের ঢাকের শব্দ শুনলে মন ভারী হয়ে আসে। বিজয়ার দিনে তার প্রার্থনা, দেবী যেন পৃথিবীর সব অশান্তি ও অশুভ শক্তি দূর করে সবাইকে শান্তিতে রাখেন।

এদিন বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি ছোটরা বড়দের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে আশীর্বাদ নেয়। সমবয়সীরা কোলাকুলি করে এবং মিষ্টিমুখের মাধ্যমে একে অপরকে শুভেচ্ছা জানায়।

ঢাকা মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সহসভাপতি তাপস কুমার পাল জানান, নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সন্ধ্যার আগেই প্রতিমা বিসর্জনের নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ।

তিনি জানান, বিকেল ৪টার দিকে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রা শুরু হওয়ার কথা। শোভাযাত্রাটি পলাশী, জগন্নাথ হল, দোয়েল চত্বর, গুলিস্তান মোড়, নবাবপুর সড়ক ও রায়সাহেব বাজার হয়ে ওয়াইজঘাটে যাওয়ার কথা রয়েছে।

সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আগমনের সূচনা হয়। এরপর আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত চলে দুর্গোৎসবের আয়োজন।

বিজয়া দশমীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে এক বছরের জন্য বিদায় জানান ভক্তরা। তাই আনন্দ, প্রার্থনা ও সিঁদুর খেলার পাশাপাশি মণ্ডপে মণ্ডপে ছড়িয়ে পড়ে বিদায়ের আবেগ।

দেবী ফিরে যাবেন কৈলাসে, আবার এক বছর পর নতুন শরতে আসবেন ধরায়—এই বিশ্বাস নিয়েই ভক্তদের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে, ‘আসছে বছর আবার হবে’।


আরটিভি/জেএমএ

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সাংবাদিকদের পেটানো নিয়ে উল্টো সুর এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীর
সাংবাদিকদের ‘কুত্তার মতো পেটানো দরকার’ বলে মন্তব্যের পর এবার নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাহরিকে খতমে নুবুওয়্যাত বাংলাদেশের আমির ইসলামী বক্তা ড. এনায়েতুল্লাহ আব্বাসি। তিনি দাবি করেছেন, সব সাংবাদিককে গালিগালাজ করেননি; বরং যারা হলুদ সাংবাদিকতা করেন এবং টাকার বিনিময়ে সংবাদ পরিবর্তন করেন, তাদের সমালোচনা করেছেন।  ইশরাক হোসেনের মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো সাংবাদিকদেরও এ সমালোচনার আওতায় রেখেছেন বলে জানান তিনি। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাতে ঢাকা উত্তরখান থানার চাঁনপাড়া বাজারের মরহুম ইসলাম উদ্দিন খান সুপার মার্কেটে আল মাদরাসা রাহিমিয়া তালিমুল কুরআনের মাহফিলে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন আব্বাসি। তিনি বলেন, ‘আমি সব সাংবাদিককে গালিগালাজ করিনি। সাংবাদিকদের মধ্যে যারা হলুদ সাংবাদিকতা করেন, আমি তাদের গালি দিয়েছি। যারা টাকার বিনিময়ে হিরোকে জিরো বানান, আবার জিরোকে হিরো বানান, আমি তাদের বিরোধিতা করেছি।’ সাংবাদিকতাকে উত্তম পেশা উল্লেখ করে আব্বাসি বলেন, একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে ভালো সাংবাদিকতার প্রয়োজন রয়েছে। দেশে অধিকাংশ সাংবাদিক টাকা পেলে সংবাদ পরিবর্তন করে ফেলেন। তারা ভালো মানুষের চরিত্র হনন করেন। আবার টাকার বিনিময়ে চরিত্রহীন মানুষের পক্ষে সংবাদ প্রকাশ করেন। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এ ধরনের সাংবাদিকদের আমি যদি গালি দিয়ে থাকি, তাহলে কি ভুল করেছি?’ এর আগে সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাতে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর হাফিজিয়া মাদ্রাসার বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন আব্বাসি। সেখানে ইশরাক হোসেনের মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি সাংবাদিকদের সমালোচনা করেন।  ওই মাহফিলে আব্বাসি বলেন, ‘ইশরাক হোসেন মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। অবশ্যই এটা ঠিক। তার পিস্তল উঁচিয়ে ধরার পদ্ধতিটা খারাপ ছিল, উদ্দেশ্য মহৎ ছিল। কিন্তু একদল সাংবাদিক সেটা নেতিবাচকভাবে প্রচার করেছে।’ সাংবাদিকদের সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকেরা ইতিবাচক সংবাদ প্রচার করলে মাদকের বিরুদ্ধে ইশরাকের অভিযান নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত ভিন্ন হতে পারত। কিন্তু ‘হলুদ সাংবাদিকেরা’ তা করেননি। এ সময় তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে খারাপ এরা। এদেরকে কুত্তার মতো পেটানো দরকার।’ পরে মাহফিলে ‘কুত্তার মতো পেটানো দরকার’ নিয়ে আব্বাসীর দেওয়া ওই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। আরটিভি/এসকে
সাংবাদিকদের পেটানো নিয়ে উল্টো সুর এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীর
পূজা-অর্চনা, আরতি ও পুষ্পাঞ্জলিতে চলছে দুর্গোৎসবের বিদায়পর্ব
পূজা, আরতি ও পুষ্পাঞ্জলির মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছে শারদীয় দুর্গোৎসবের সমাপনপর্ব। 
পূজা-অর্চনা, আরতি ও পুষ্পাঞ্জলিতে চলছে দুর্গোৎসবের বিদায়পর্ব
আজ বিজয়া দশমী, প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে দুর্গাপূজা
শুভ বিজয়া দশমী আজ। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বুধবার(২১ অক্টোবর) শেষ হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা।
আজ বিজয়া দশমী, প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে দুর্গাপূজা
আজকের নামাজের সময়সূচি
বুধবার (২১ অক্টোবর) ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ-
আজকের নামাজের সময়সূচি
শারদীয় দুর্গাপূজার আজ মহানবমী, দেবীর বিদায়ের সুর
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার আজ মহানবমী। পূজা-অর্চনা, অঞ্জলি নিবেদন, প্রসাদ বিতরণ ও নানা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে দিনটি উদ্‌যাপন করবেন ভক্তরা। মহানবমীর মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের শেষ পর্ব শুরু হওয়ায় মণ্ডপে মণ্ডপে এখন দেবীর বিদায়ের সুর।
শারদীয় দুর্গাপূজার আজ মহানবমী, দেবীর বিদায়ের সুর
আরও পড়ুন
সিঁদুর খেলার পর ত্বকের যত্ন নেবেন যেভাবে
দুর্গাপূজায় সম্প্রীতির বার্তা অভিনেত্রী মন্দিরার
পূজায় গিয়ে নৌকাডুবি, স্ত্রী-মেয়েকে হারিয়ে বাবার আহাজারি
সদরপুরের মণ্ডপে মণ্ডপে আরাধনা, ভক্তদের মনে দেবী বিদায়ের সুর