
সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, অর্থনৈতিক লেনদেন কিংবা ভুল বোঝাবুঝির কারণে আপন ভাইয়ের সঙ্গে অনেক সময় কথা বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের অভিমান থেকে তৈরি হয় দূরত্ব, যা একসময় রূপ নেয় পারস্পরিক বিদ্বেষে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ থাকলে কি আল্লাহর কাছে দোয়া কবুল হয়? আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে রাখলে কি আল্লাহর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে?
ইসলামে দোয়া কবুলের বিষয়ে নিরাশ হতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা ও পারস্পরিক শত্রুতা পুষে রাখার ব্যাপারে কুরআন-হাদিসে কঠোর সতর্কতা রয়েছে। তাই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার পাশাপাশি বিরোধ মিটিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টাও গুরুত্বপূর্ণ।
দোয়া কবুলের বিষয়ে হাদিসে যা বলা হয়েছে
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলিম গুনাহের কাজ কিংবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দোয়া না করলে তার দোয়া কবুল হতে থাকে। দোয়া কবুলে বিলম্ব হচ্ছে মনে করে হতাশ হয়ে পড়তেও নিষেধ করেছেন তিনি।
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, বান্দা তাড়াহুড়া করে হতাশ হয়ে বললে যে সে দোয়া করেছে, কিন্তু তার দোয়া কবুল হতে দেখেনি, তখন সে দোয়া করা ছেড়ে দেয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৩৫)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, দোয়া কবুল হতে দেরি হচ্ছে মনে করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা বন্ধ করা উচিত নয়। একই সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো গুনাহ থেকেও বিরত থাকতে হবে।
তবে ভাইয়ের সঙ্গে বিরোধ থাকলেই একজন মানুষের সব দোয়া কবুল হবে না, এমন কোনো সাধারণ বিধান ইসলামে নেই। বরং নিজের ভুল সংশোধন, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা এবং সম্পর্কের অবনতি দূর করার চেষ্টা করা উচিত।
তিন দিনের বেশি কথা বন্ধ রাখা কি জায়েজ?
ব্যক্তিগত রাগ, অভিমান কিংবা বিরোধের কারণে দীর্ঘদিন কথা বন্ধ করে রাখাকে ইসলাম নিরুৎসাহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলিমের জন্য তার ভাইয়ের সঙ্গে তিন রাতের বেশি সম্পর্ক ছিন্ন করে থাকা বৈধ নয়। তাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে আগে সালাম দেয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৭৭)
এ নির্দেশনা অনুযায়ী, আপন ভাইয়ের সঙ্গে বিরোধ হলেও সম্ভব হলে আগে সালাম দিয়ে যোগাযোগ শুরু করা এবং ভুল বোঝাবুঝি দূর করার উদ্যোগ নেওয়া উত্তম।
তবে নির্যাতন, হুমকি কিংবা নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলে কাউকে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে যেতে হবে, এমন নয়। প্রয়োজনে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ফোন, বার্তা বা নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা যায়।
পারস্পরিক বিদ্বেষ ক্ষমা লাভে বাধা হতে পারে
ভাইয়ের সঙ্গে বিরোধ দীর্ঘস্থায়ী হয়ে শত্রুতা ও বিদ্বেষে রূপ নিলে তা আধ্যাত্মিক জীবনের জন্যও উদ্বেগের বিষয়। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, সোমবার ও বৃহস্পতিবার আল্লাহর সঙ্গে শিরক করে না এমন বান্দাদের ক্ষমা করা হয়। তবে যাদের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা রয়েছে, তাদের বিষয়ে মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৫)
হাদিসটি থেকে বোঝা যায়, পারস্পরিক বিদ্বেষ পুষে রাখা গুরুতর বিষয়। তাই নিজের ভুল থাকলে ক্ষমা চাওয়া, অন্যের অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়া এবং প্রয়োজনে মধ্যস্থতার সাহায্য নিয়ে বিরোধ মিটিয়ে নেওয়া জরুরি।
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার পরিণতি
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৪)
এ হাদিস আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার ভয়াবহতা তুলে ধরে। তাই সম্পত্তি, অর্থ কিংবা ব্যক্তিগত অভিমানের কারণে আপন ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার আগে নিজের আচরণ পর্যালোচনা করা উচিত।
তবে এ সতর্কবাণীর ভিত্তিতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির আখেরাতের পরিণতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। মানুষের প্রকৃত অবস্থা ও তার পরিণতির চূড়ান্ত বিচার আল্লাহর হাতে।
কুরআনের শিক্ষা: ক্ষমা ও উদারতা
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা যেন ক্ষমা করে এবং উদারতা প্রদর্শন করে। তোমরা কি চাও না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিন? আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আন-নুর, আয়াত: ২২)
এ আয়াত মানুষকে ক্ষমা ও উদারতার শিক্ষা দেয়। আল্লাহর ক্ষমা প্রত্যাশা করলে অন্যের ভুলের ক্ষেত্রেও যথাসম্ভব ক্ষমাশীল হওয়া এবং সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।
অবশ্য ক্ষমা করার অর্থ অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া নয়। সম্পত্তি বা আর্থিক লেনদেন নিয়ে বিরোধ থাকলে ন্যায়সংগত সমাধান করতে হবে। কারও প্রাপ্য অধিকার আটকে রাখা হলে তা ফিরিয়ে দিতে হবে। প্রয়োজন হলে বিশ্বস্ত আলেম, আইনজ্ঞ কিংবা নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে করণীয়
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, বিরোধ মেটাতে আগে সালাম দিয়ে যোগাযোগ শুরু করা, নিজের ভুল থাকলে ক্ষমা চাওয়া এবং অন্যের অধিকার যথাযথভাবে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। সরাসরি কথা বলা কঠিন হলে ফোন বা বার্তার মাধ্যমেও যোগাযোগ করা যায়।
একই সঙ্গে ভাইয়ের কল্যাণ কামনা করে দোয়া করা, অন্তরের বিদ্বেষ দূর করার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা এবং ন্যায্য সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলে বিশ্বস্ত ব্যক্তির মাধ্যমে যোগাযোগ করাও একটি উপায় হতে পারে।
তাহলে ভাইয়ের সঙ্গে কথা বন্ধ থাকলে কি দোয়া কবুল হবে?
ইসলামের দৃষ্টিতে, আপন ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ থাকলেই সব দোয়া প্রত্যাখ্যাত হবে এমন কথা বলা যায় না। দোয়া কবুলের বিষয়টি আল্লাহর ইচ্ছা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং দীর্ঘদিন বিদ্বেষ পুষে রাখার বিষয়ে হাদিসের সতর্কতা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তাই ভাইয়ের সঙ্গে বিরোধ থাকলেও দোয়া বন্ধ করা উচিত নয়। আল্লাহর কাছে নিজের ভুলের ক্ষমা চাইতে হবে, অন্তরের কঠোরতা দূর করার প্রার্থনা করতে হবে এবং সম্পর্ক মেরামতের আন্তরিক চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য একটি সালাম, একটি ফোনকল কিংবা আন্তরিক একটি বার্তাই হতে পারে প্রথম পদক্ষেপ। আর সরাসরি যোগাযোগ নিরাপদ না হলে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে হবে, তিনি যেন পারস্পরিক বিদ্বেষ দূর করে পরিবারে শান্তি, ন্যায় ও ভালোবাসা ফিরিয়ে দেন।
আরটিভি/এসকে


