
কার্পাস তুলা থেকে বীজ ছড়ানো, চরকায় সুতা কাটা, সেই সুতা প্রাকৃতিকভাবে রঙ করা আর তারপর কোমর তাঁতের খটখট শব্দে রাতভর কাপড় বোনা। ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে তৈরি করতে হয় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের পরিধেয় পবিত্র বস্ত্র ‘চীবর’। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হারুয়ালছড়ি বৌদ্ধ জেতবন বিহারে গত ৫ ও ৬ নভেম্বর এমনই এক কঠিন ধর্মীয় সাধনার দৃশ্য দেখা গেল, যা যুগ যুগ ধরে ধরে রেখেছে আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্যকে।
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে ‘কঠিন চীবর দান’ সবচেয়ে মহিমান্বিত উৎসব। আর এই উৎসবের মূল আকর্ষণ হলো সম্পূর্ণ কায়িক শ্রমে ও নিখাদ ভক্তিতে চীবর বুনন প্রক্রিয়া।
গত ৫ নভেম্বর বিকেল থেকেই হারুয়ালছড়ি বৌদ্ধ জেতবন বিহার প্রাঙ্গণে শুরু হয় উৎসবের তোড়জোড়। রাঙ্গামাটি জেলার পাহাড়ি অঞ্চলের শত শত বৌদ্ধ নারী জড়ো হন বিহারের চত্বরে। সবার চোখে-মুখে ক্লান্তিহীন ভক্তি। নিয়মানুযায়ী, প্রথমে কার্পাস তুলা ধোলাই করে বীজ আলাদা করা হয়। এরপর প্রবীণ থেকে তরুণী—সব বয়সের নারীরা চরকা ও তকলি নিয়ে বসে যান সুতা কাটতে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কাপড় তৈরি করতে হবে, তাই এখানে কোনো অবসরের সুযোগ নেই। আলোর স্বল্পতা দূর করতে প্রদীপের আলো আর আধুনিক বাতির নিচে চলে সুতা কাটার এই যৌথ মহাযজ্ঞ।
সুতা কাটা শেষ হতেই শুরু হয় রঙের কাজ। কৃত্রিম কোনো রঙ এখানে নিষিদ্ধ। সম্পূর্ণ প্রথাগত পদ্ধতিতে গাছের বাকল, বিশেষ লতা-গুল্মের শিকড় ও ফলের খোসা বড় পাত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেদ্ধ করে তৈরি করা হয় চীবরের চেনা গেরুয়া বা চুনট রঙ। গরম রঙে সুতা ডুবিয়ে তা দ্রুত শুকিয়ে নেওয়া হয় বুননের জন্য।
পরের ধাপটি সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও কঠিন। শুকানো সুতাগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হয় ঐতিহ্যবাহী ‘বেইন’ বা কোমর তাঁতের ফ্রেমে। সুতা সাজানোর এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘বেইন টানা’। গভীর রাতে যখন চারপাশ নিস্তব্ধ, তখন বিহার প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে তাঁতের খটখট শব্দে। অভিজ্ঞ বয়নশিল্পীরা আঙুলের জাদুতে অত্যন্ত দ্রুততায় বুনে চলেন পবিত্র কাপড়। সাধারণ একটি চীবর বুনতে যেখানে কয়েক দিন সময় লাগার কথা, সেখানে শত মানুষের ভক্তি আর শ্রমের শক্তিতে মাত্র কয়েক ঘণ্টাতেই তৈরি হয়ে যায় থান কাপড়।
৬ নভেম্বর ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই বুনন পর্ব শেষ হয়। এরপর শুরু হয় কাটিং ও সেলাই। বৌদ্ধ শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে থান কাপড়টিকে নির্দিষ্ট মাপে কেটে খণ্ড খণ্ড করা হয়। সাধারণত ৫টি, ৭টি বা তার বেশি খণ্ডে কেটে আবার সেলাই করে জোড়া দেওয়া হয়, যা দেখতে অনেকটা ধানের ক্ষেতের আইলের মতো দেখায়। সেলাই শেষে প্রস্তুত হয় ভিক্ষুদের পরিধেয় ‘ত্রি-চীবর’ (অন্তর্বাস, উত্তরাসঙ্গ ও সঙ্ঘাটী)।
৬ নভেম্বর দুপুরের আগেই সম্পন্ন হয় চীবর প্রস্তুতের এই পুরো কাজ। এরপর বিহার প্রাঙ্গণে এক বর্ণাঢ্য ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ ধর্মীয় সভার আয়োজন করা হয়। ভিক্ষু মহামন্ডলের পরম পূজনীয় সংঘরাজ ভদন্ত শাসনানন্দ মহাথেরোর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই পুণ্যময় সভার শুভ উদ্বোধন করেন ভদন্ত বোধিশ্রী থেরো।
অনুষ্ঠানে সমবেত পুণ্যার্থীদের উদ্দেশ্যে স্বাগত বক্তব্য রাখেন হারুয়ালছড়ি বৌদ্ধ জেতবন বিহার ও সমাজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি বাবু পবিত্র বড়ুয়া। মহতী এই ধর্মসভায় প্রধান জ্ঞাতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরম শ্রদ্ধেয় বুদ্ধপ্রিয় মহাথেরো। সদ্ধর্মের গুঢ় তত্ত্ব নিয়ে প্রধান সদ্ধর্মদেশক হিসেবে অমৃতবাণী বর্ষণ করেন ভদন্ত শাসনাবংশ মহাথেরো এবং মুখ্য আলোচক হিসেবে চীবর দানের তাৎপর্য তুলে ধরেন ভদন্ত জয়পাল ভিক্ষু।
ধর্মীয় এই মহাসম্মেলনে শুধু ভিক্ষু সংঘই নন, সংহতি জানাতে শামিল হয়েছিলেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে স্থানীয় সাংসদ সরোয়ার আলমগীর উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি ব্যস্ততার কারণে সেখানে উপস্থিত হতে পারেননি তবে সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সম্প্রীতির বার্তা দেন হারুয়ালছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন চৌধুরী ও ইউপি সদস্য মোহাম্মদ শাহাজাহান। এছাড়াও বিহার পরিচালনা কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি রিপন বড়ুয়া, লায়ন সুকান্ত বড়ুয়া বিপুল এবং সাধারণ সম্পাদক দুদুল বড়ুয়াসহ অঞ্চলের শত শত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পুণ্যার্থী উপস্থিত ছিলেন।
সপ্তাহান্তের এই ধর্মীয় মহাসমাবেশের শেষাংশে প্রথাগত উপাচার, সঙ্ঘদান ও পঞ্চশীল গ্রহণের মাধ্যমে পুণ্যার্থীরা বিপুল সাধনায় তৈরি এই পবিত্র চীবর ভিক্ষু সংঘের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন। আড়াই হাজার বছর আগে বুদ্ধের জীবদ্দশায় মহীয়সী নারী বিশাখা যেভাবে মাত্র এক রাতের মধ্যে চীবর বুনে বুদ্ধকে দান করেছিলেন, ফটিকছড়ির হারুয়ালছড়ি জেতবন বিহারে যেন প্রতিধ্বনিত হলো সেই প্রাচীন ইতিহাসেরই এক রূপকথা। আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও এই কঠিন নিয়ম ও কায়িক শ্রমের মাধ্যমে কাপড়ের সুতায় সুতায় পুণ্য বোনার এই ঐতিহ্য সত্যিই অনন্য।
আরটিভি/এমএইচজে

