
২০২৩ সালে সাফল্য-ব্যর্থতায় মোড়ানো এক বছর পার করেছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। কি ছিল না এই বছরে! বছরের শেষ দিকে নিউজিল্যান্ডের মাঠে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি ম্যাচ জয়ের নজির গড়েছে টাইগাররা। পাশাপাশি হোম ভেন্যুতে প্রথমবারের মতো কিউইদের টেস্টে হারিয়েছে লাল-সবুজেরা।
চলতি বছর সাফল্যে রাঙানোর সুবর্ণ সুযোগও হাতছাড়া করে শান্তরা। ওয়ানডে বিশ্বকাপে শোচনীয় ব্যর্থতা হতাশ করেছে টাইগার সমর্থকদের। বিশ্বকাপে মাত্র দুটি ম্যাচে জিতেছে লাল-সবুজেরা। এতে অষ্টম স্থানে থেকে বৈশ্বিক আসর শেষ করে কোন মতে, ২০২৫ আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে সাকিব-লিটনরা।
বছর জুড়ে সাফল্যের নানান পালক ধরা দিলেও বিশ্বকাপের আগে টক অব দ্য কান্ট্রিতে রূপ নেওয়া দুই তারকা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান এবং তামিম ইকবালের মধ্যকার অলিখিত দ্বন্দ্ব ক্রিকেটকে অনেকটাই লজ্জায় ফেলেছে। তবে পরের বছরে পজিটিভ ইমেজ ধরে রাখতে পারবে তো বাংলাদেশ- এমন জিজ্ঞাসা নিয়েই শুরু হচ্ছে ২০২৪ সালে টাইগারদের পথচলা।
টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ : ২০২৩ সালে টেস্টে সোনার হরফে লিখে রাখার মতো সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। চার ম্যাচের মধ্যে তিনটিতেই জিতেছে লাল-সবুজেরা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সাফল্য হোম ভেন্যুতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয়। এ ছাড়া আয়ারল্যান্ডকে ৭ উইকেটে হারানোর পর আফগানিস্তানকে ৫৪৬ রানের বড় ব্যবধানে হারায় টাইগাররা। আফগানদের বিপক্ষে জয় টেস্ট ইতিহাসে তৃতীয় বড় এবং যেকোনো দলের বিপক্ষে সবচেয়ে বড় জয়। এই ম্যাচে মুমিনুল হকের পর দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে টেস্টের দুই ইনিংসে সেঞ্চুরি করেন নাজমুল হোসেন শান্ত। এরপর সিলেটে কিউইদের ১৫০ রানে হারায় লাল-সবুজেরা। এতে চলতি বছরে টেস্টে অপরাজিত থাকার সুযোগ তৈরি করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু মিরপুরে নিজেদের পাতানো ফাঁদে পড়ে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমবার টেস্ট সিরিজ জয়ের সুযোগ নষ্ট করে স্বাগতিকরা।
ওয়ানডে গর্ব ধূলিসাৎ : ২০১৫ থেকে ২০২২ পর্যন্ত ঘরের মাঠে ওয়ানডে ফরম্যাটে মাত্র একটি সিরিজ হেরেছিল বাংলাদেশ। এতে হোম ভেন্যুকে নিজেদের দুর্গে পরিণত করেছিল লাল-সবুজেরা। তবে চলতি বছরে সেই রেকর্ড ভেঙে চুরমার হয়। ফলে কলঙ্কিত হয় ওয়ানডেতে গর্ব করার মত সাফল্য। হোম ভেন্যুতে ইংল্যান্ড, আফগানিস্তান এবং নিউজিল্যান্ডের কাছে সিরিজ হারের লজ্জা পায় সাকিব বাহিনী। মন্থর উইকেট বানিয়েও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে পারেনি লাল-সবুজেরা। এর মধ্যে দুঃস্বপ্নের বিশ্বকাপ অভিযান ছিল বাংলাদেশের। তবে হতাশাজনক বছরের শেষ দিকে নিউজিল্যান্ডের মতো কঠিন কন্ডিশনে জয়ের দেখা পেয়েছে লাল-সবুজেরা। মাত্র ৯৮ রানে গুটিয়ে প্রথমবার ব্ল্যাক-ক্যাপসদের আঙিনায় ওয়ানডে ম্যাচ জিতে টাইগাররা। সব মিলিয়ে ২০২৩ সালে ৩২ ওয়ানডেতে ১১ জয়ের বিপরীতে ১৮টিতে হার দেখেছে লাল-সবুজেরা। এ ছাড়া পরিত্যক্ত হয় বাংলাদেশের তিনটি ম্যাচ।
টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে আধিপত্য : সবশেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভরাডুবির পর চলতি বছরে এই ফরম্যাটে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। ৫০ ওভারের সংস্করণের ন্যায় এই ফরম্যাটেও দাপট দেখায় সাকিব আল হাসানের নেতৃত্বাধীন লাল-সবুজ শিবির। চলতি বছরে ৭ ম্যাচ খেলে (চলমান টি-টোয়েন্টি সিরিজ ছাড়া) ৬ জয়ের বিপরীতে মাত্র একটিতে হেরেছে টাইগাররা। এর মধ্যে হোম ভেন্যুতে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডকে হোয়াইটওয়াশ করে ইতিহাস রচনা করে বাংলাদেশ। এরপর আয়ারল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে ও আফগানদের হোয়াইটওয়াশ করে টাইগাররা।
তামিমের অবসর-অধিনায়কত্ব : আফগানিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠে ওয়ানডে সিরিজ চলাকালীন হঠাৎ করেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তামিম ইকবাল। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে ২৮ ঘণ্টার মধ্যে অবসরের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেন চট্টগ্রামের এই ক্রিকেটার। সে সময়ে গুঞ্জন উঠে, প্রধান কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের সঙ্গে সম্পর্কে ফাটল ধরেছিল তামিমের। এমনকি সাকিবের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিয়েও নানান প্রশ্ন উঠে আসে। এরপর রহস্যময় ইনজুরি নিয়ে উদ্বেগ থাকায় ওয়ানডেতে অধিনায়কত্ব ছাড়েন তামিম।
তামিম-সাকিব বৈরী সম্পর্ক : চলতি বছরে সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালের মধ্যকার অনাকাঙ্ক্ষিত দ্বন্দ্ব। ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক ভিডিও বার্তায় তামিম দাবি করেন, চারপাশের কিছু ব্যক্তির নোংরা আচরণে ক্লান্ত তিনি। পাশাপাশি ইনজুরি নিয়ে উদ্বেগ থাকায় বিশ্বকাপে না খেলার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। তামিমের এই বার্তার কয়েক ঘণ্টা পর দেশের এক বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তামিমের শিশুসুলভ আচরণের জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাকিব। এতে অনেকেই ধারণা করেন, এই বিবাদের কারণে বৈশ্বিক ইভেন্টে বাংলাদেশের ভরাডুবি হয়েছে।
এশিয়ান গেমসে ব্রোঞ্জ পদক : চীনের হাংজুতে অনুষ্ঠেয় এশিয়ান গেমসে স্বর্ণ জয়ের লক্ষ্যে পাড়ি জমালেও বাংলাদেশকে ব্রোঞ্জ পদকেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। এই টুর্নামেন্টে জাতীয় দলে খেলা ক্রিকেটারদের নিয়ে স্কোয়াড সাজানোর কারণে প্রত্যাশা আরও বেশি ছিল। গ্রুপ পর্বে সহযোগী দেশগুলোর বিপক্ষে সব ম্যাচেই জয় পেয়েছিল লাল-সবুজেরা। কিন্তু সেমির পরীক্ষায় ভারতের কাছে ৯ উইকেটে হেরে যায় বাংলাদেশ। এরপর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে পাকিস্তানকে হারিয়ে ব্রোঞ্জ জিতে লাল-সবুজ শিবির।
অনূর্ধ্ব-১৯ দলের এশিয়া কাপ শিরোপা : অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে এশিয়া কাপের শিরোপা জিতে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দল। ফাইনালে ওপেনার আশিকুর রহমান শিবলির দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে ১৯৫ রানের বিশাল ব্যবধানে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে হারায় টাইগার যুবারা। শিরোপা জয়ের পথে প্রথমবার ভারত ও শ্রীলংকাকে হারায় লাল-সবুজেরা। দুটি করে সেঞ্চুরি ও হাফ-সেঞ্চুরিতে টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ৩৭৮ রান করেন শিবলি। অন্যদিকে দ্বিপাক্ষিক সিরিজে মিশ্র সাফল্য ছিল টাইগার যুবাদের।
বছরজুড়ে আলো ছড়িয়েছে টাইগ্রেসরা : ২০২৩ সালে দারুণ একটি বছর পার করেছে বাংলাদেশ নারী দল। ঘরের মাঠে ওয়ানডে সিরিজে শক্তিশালী ভারতের সঙ্গে ড্রয়ে (১-১) নিজেদের শক্তির জানান দেয় টাইগ্রেসরা। ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে হারলেও এক ম্যাচে জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। এরপর এশিয়ান গেমসে ব্রোঞ্জ পদক জিতে লাল-সবুজের বাঘিনীরা। পরবর্তীতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি সিরিজে ২-১ ব্যবধানে জয় পায় জ্যোতি-পিংকিরা। এরপর প্রোটিয়াদের বিপক্ষে প্রথমবার টি-টোয়েন্টি ও ওয়ানডেতে জয়ের স্বাদ পায় তারা। টি-টোয়েন্টি সিরিজ ড্র করলেও ২-১ ব্যবধানে ওয়ানডে সিরিজে হারে বাঘিনীরা। সব মিলিয়ে নারী ক্রিকেটারদের জন্য স্মরণীয় বছরই ছিল।
দুর্দান্ত পিংকি, অসাধারণ শান্ত : চোটাক্রান্ত সাকিব আল হাসানের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নাজমুল হোসেন শান্ত। টপ-অর্ডার এই ব্যাটারের নৈপুণ্যে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সাফল্যের পর তাকেই ভবিষ্যৎ অধিনায়ক হিসেবে দেখতে চান অনেকেই। এ ছাড়া পুরো বছরজুড়েই দুর্দান্ত ফর্মে তিনি। ওয়ানডে ও টেস্ট ফরম্যাটে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক বাঁ-হাতি এই ব্যাটার। টি-টোয়েন্টিতে তৃতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও শান্ত। টেস্টে তিন সেঞ্চুরিতে ৪৪০ রান করেছেন তিনি। অল্পের জন্য ওয়ানডে ১ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করতে পারেননি শান্ত। দুই সেঞ্চুরি ও ৮ হাফ-সেঞ্চুরিতে ৯৯২ রান করেছেন ভারপ্রাপ্ত এই দলপতি।
প্রথম বাংলাদেশি নারী ক্রিকেটার হিসেবে ব্যাটারদের তালিকায় আইসিসির ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ ২০-এ জায়গা করে নেন ফারজানা হক পিংকি। আইসিসির সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, ১৩তম স্থানে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। ভারতের বিপক্ষে ১০৭ রানের ইনিংসের পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে রেকর্ডগড়া ইনিংসে ১০২ রান করেন তিনি।




