
ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’। ঝড়টির নাম ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে ঘূর্ণিঝড়ের নাম কে রাখে, কীভাবে এই নাম নির্বাচন করা হয় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের নামকরণের প্রয়োজনই বা কেন?
ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ কোনো ব্যক্তি বা একটি দেশের ইচ্ছামতো করা হয় না। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করে এই নামকরণ করা হয়।
নাম প্রস্তাব করে ১৩টি দেশ
বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের জন্য রয়েছে উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নির্দিষ্ট ব্যবস্থা। এ অঞ্চলে বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশ ঘূর্ণিঝড়ের নাম প্রস্তাব করে। অন্য দেশগুলো হলো ভারত, ইরান, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, ওমান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেন।
দেশগুলো আগে থেকেই নির্দিষ্ট কিছু নাম জমা দেয়। পরে নির্ধারিত ক্রম অনুযায়ী সেই তালিকা থেকে ঘূর্ণিঝড়ের নাম ব্যবহার করা হয়। উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কোনো ঘূর্ণিঝড় নামকরণের উপযুক্ত পর্যায়ে পৌঁছালে ভারতের আবহাওয়া বিভাগের আঞ্চলিক বিশেষায়িত আবহাওয়া কেন্দ্র (আরএসএমসি) সেই নাম নির্ধারণ করে।
বাংলাদেশও এই তালিকার জন্য নাম প্রস্তাব করে। তবে কোনো দেশ নাম প্রস্তাব করলেই ঘূর্ণিঝড়টি সেই দেশেই আঘাত হানবে, এমন নয়। ঝড়ের নামকরণের সঙ্গে এর সম্ভাব্য গতিপথের কোনো সম্পর্ক নেই।
কেন ঘূর্ণিঝড়ের নাম রাখা হয়?
ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ঝড়কে সহজে শনাক্ত করা এবং এর বিষয়ে সতর্কবার্তা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। শুধু অবস্থানাঙ্ক বা কারিগরি পরিচয় দিয়ে ঝড়ের বিষয়ে তথ্য জানানো হলে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা মনে রাখা কঠিন হতে পারে। একটি পরিচিত নাম ব্যবহার করলে সংবাদমাধ্যম, আবহাওয়াবিদ, উদ্ধারকর্মী ও সাধারণ মানুষ সহজেই নির্দিষ্ট ঝড়টিকে শনাক্ত করতে পারেন।
একই সময়ে একাধিক সামুদ্রিক ঝড় তৈরি হলে আলাদা নাম ব্যবহার করে প্রতিটির গতিপথ, সম্ভাব্য প্রভাব এবং সতর্কবার্তা সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে তথ্য দেওয়া যায়। এতে যোগাযোগের বিভ্রান্তি কমে এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হয়।
নাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে কী নিয়ম রয়েছে?
ঘূর্ণিঝড়ের নাম সাধারণত সংক্ষিপ্ত, সহজে উচ্চারণযোগ্য এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষের কাছে বোধগম্য হওয়ার উপযোগী করে নির্বাচন করা হয়। নামটি যেন আপত্তিকর না হয় কিংবা অন্য নামের সঙ্গে সহজে গুলিয়ে না যায়, সেটিও বিবেচনায় রাখা হয়।
উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ১৩টি দেশের প্রস্তাবিত নাম নির্ধারিত ক্রমে ব্যবহার করা হয়। কোনো নাম একবার ব্যবহার হয়ে গেলে সাধারণত সেটি আবার এই অঞ্চলের নতুন ঘূর্ণিঝড়ের নাম হিসেবে ব্যবহার করা হয় না। ফলে তালিকা থেকে পরবর্তী নামটি নেওয়া হয়।
নামের উৎসও এক রকম নয়। বিভিন্ন ভাষার শব্দ, প্রকৃতি বা সংশ্লিষ্ট দেশের প্রস্তাবিত অন্য কোনো নাম তালিকায় থাকতে পারে।
নামের সঙ্গে কি ঘূর্ণিঝড়ের শক্তির সম্পর্ক আছে?
না। ঘূর্ণিঝড়ের নামের সঙ্গে এর শক্তি বা ধ্বংসক্ষমতার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। নামটি মূলত ঝড়কে শনাক্ত করার জন্য ব্যবহার করা হয়। ঝড় কতটা শক্তিশালী, বাতাসের গতি কত, কোথায় আঘাত হানতে পারে এবং কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে এসব নির্ভর করে আবহাওয়াগত পরিস্থিতির ওপর।
তাই কোনো ঝড়ের নাম আকর্ষণীয় বা পরিচিত হলেই সেটি বেশি শক্তিশালী হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়। ঝড়ের নামের চেয়ে এর অবস্থান, তীব্রতা, সম্ভাব্য গতিপথ এবং সরকারি সতর্কবার্তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ কেবল পরিচিতির জন্য নয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় যোগাযোগ সহজ করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। কোনো ঘূর্ণিঝড়ের নাম সংবাদে শোনার পর সেটি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য জানা, আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তা অনুসরণ করা এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আরটিভি/এসকে


