
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমান তার দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে (১৯২৯-২০০৬) এক স্বতন্ত্র কাব্যভাষা, গভীর নাগরিক দর্শন এবং প্রতিবাদী লেখকসত্তার জন্ম দিয়েছেন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্থে বাংলা কবিতাকে তিনি শুধু আধুনিকতার পথে চালিত করেননি, বরং জনজীবনের সঙ্গে কবিতার এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন। পুরান ঢাকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠার কারণে তার কবিতায় নগর জীবনের ক্লান্তি, হতাশা ও সৌন্দর্যের নিবিড় চিত্রায়ন ঘটেছে, যার জন্য তিনি 'নাগরিক কবি' এবং বাংলাদেশের ‘অঘোষিত জাতীয় কবি’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তার কবিতা ছিল একাধারে অন্তরঙ্গ, গীতিময় এবং একই সঙ্গে গণ-আন্দোলন ও সংগ্রামের প্রতিবাদের শাণিত হাতিয়ার।
শামসুর রাহমানের সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠা তিরিশের দশকের কবিদের পরে। তাকে জীবনানন্দ-পরবর্তী বাংলা কবিতার প্রধান পুরুষ হিসেবে গণ্য করা হয়। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ (১৯৬০) প্রকাশের পর থেকেই সচেতন পাঠক মহলে তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এই কাব্যে তিনি নাগরিক জীবনের নিঃসঙ্গতা, ও অস্তিত্ববাদী চেতনাকে তুলে ধরেন। তার প্রথম দিকের কবিতায় প্রবল রোমান্টিকতা ও দার্শনিক উপলব্ধির সঙ্গে প্রতীক, চিত্রকল্প ও শব্দের ব্যঞ্জনাময় ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। এই সময়ে ‘রুপালি স্নান’-এর মতো কবিতা লিখে তিনি বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে এক নতুন আঙ্গিক ও ভাষা নিয়ে আসেন, যা পূর্ববঙ্গের পাঠকের নান্দনিক ক্ষুধাকে মেটায়। তার কাব্য দর্শন মূলত মানবতাবাদী, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক। তিনি মনে করতেন, কবির কাজ শুধু নান্দনিকতা সৃষ্টি নয়, বরং সমাজের অন্যায়, অবিচার, ধর্মান্ধতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধেও এক তীব্র অবস্থান নেওয়া। এই দায়বদ্ধতা তাকে অন্তর্মুখী স্বভাবের কবি হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বারবার কলম ধরতে বাধ্য করেছে।
শামসুর রাহমানের লেখকসত্তার সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকটি হলো তার তীব্র স্বদেশপ্রেম ও সমকাল সচেতনতা, তাকে 'স্বাধীনতার কবি' উপাধি এনে দিয়েছে। তার কবিতা বাঙালির জাতীয় জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়কে ধারণ করেছে। ভাষা ও সংস্কৃতির উপর আঘাত এলে তার কলম থেকে বেরিয়ে আসতো মর্মস্পর্শী কবিতা; যেমন—রোমান হরফ প্রবর্তনের উদ্যোগের বিরুদ্ধে লেখা 'বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা', যা মাতৃভাষার প্রতি মমত্ববোধের এক উজ্জ্বল দলিল। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ আসাদের রক্তাক্ত শার্ট দেখে তিনি রচনা করেন বিখ্যাত কবিতা 'আসাদের শার্ট' (যা জনগণের প্রতিবাদের প্রতীকী পতাকা হয়ে উঠেছিল: ‘আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা’। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় তিনি তার শ্রেষ্ঠ কিছু কবিতা রচনা করেন—‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ এবং ‘স্বাধীনতা তুমি’। এই কবিতাগুলো স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামের দৃঢ় প্রতিচ্ছবি। এই সময়ের কবিতাগুলো নিয়েই পরে প্রকাশিত হয় ‘বন্দী শিবির থেকে’ (১৯৭২) কাব্যগ্রন্থ, যা তাকে কবি হিসেবে চূড়ান্ত খ্যাতি এনে দেয়।
স্বাধীনতার পরেও যখন দেশ সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ ও স্বৈরশাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে, তখনো শামসুর রাহমান নীরব থাকেননি। সামরিক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে তিনি লেখেন 'বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়'। এছাড়াও, আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনকে বিদ্রুপ করে লেখা ‘হাতির শুঁড়’ এবং পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে আশাহত হয়ে 'এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়' বা 'উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ'-এর মতো কবিতা রচনা করেছেন। এই সব কবিতায় তার অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত সমাজের আকাঙ্ক্ষা বারবার মূর্ত হয়েছে।
শামসুর রাহমান মূলত একজন কবি হিসেবে পরিচিতি পেলেও পেশাগত জীবনে ছিলেন একজন সফল সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সম্পাদক। তিনি দৈনিক মর্নিং নিউজ, দৈনিক বাংলা এবং সাপ্তাহিক বিচিত্রার মতো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ মাধ্যমে কাজ করেছেন। সাংবাদিকতা তাকে সমাজের গভীরে প্রবেশ করতে এবং সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টকে কবিতার বিষয়বস্তু করতে সাহায্য করেছে। সাংবাদিকতার কারণে তিনি ‘সিন্দবাদ’, ‘চক্ষুষ্মান’ বা ‘মজলুম আদিব’-এর মতো ছদ্মনামও ব্যবহার করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তার কবিতায় মায়ের প্রতি ভালোবাসা এবং প্রকৃতির প্রতি অনুরাগও উঠে এসেছে। জীবনের শেষ দিকে মৌলবাদী শক্তির টার্গেটে পরিণত হওয়া সত্ত্বেও তিনি তার কলম থামাননি, যা তার প্রগতিশীল ও নির্ভীক লেখকসত্তার প্রমাণ।
শামসুর রাহমান আধুনিক বাংলা কবিতার এক অক্ষয় নাম। তিনি কেবল কবিতায় শৈল্পিক উৎকর্ষতা আনেননি, বরং জাতীয় চেতনা ও ইতিহাসকে কবিতার চরণে ধারণ করেছেন। তার নাগরিক দর্শন, তীব্র দেশপ্রেম এবং প্রতিবাদী লেখকসত্তা তাকে বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষার প্রধান কবি হিসেবে চিরকাল প্রাসঙ্গিক করে রাখবে। তার কবিতা বাঙালির জীবনে অনুপ্রেরণার উৎস, সংগ্রামের সাহস এবং স্বাধীনতার চেতনার এক চিরন্তন দলিল।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি




