
‘মা, এবার ঢাকা থেকে ফিরে তোমার জন্য নতুন ঘর করে দেব’ মাকে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েই নির্মাণশ্রমিকের কাজে ঢাকায় এসেছিলেন ২৪ বছর বয়সী মেহেদী হাসান মিম। পরিবারের অভাব দূর করার পাশাপাশি জরাজীর্ণ ঘরটি সংস্কারের স্বপ্ন ছিল তার। তবে সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই রাজধানীর বারিধারায় প্রাইভেটকারের চাপায় প্রাণ হারিয়েছেন এই তরুণ।
মেহেদী নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের হাজীপাড়া গ্রামের দিনমজুর এরশাদুল হকের ছেলে। তিনি ডোমার সরকারি কলেজের বিএ দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। বাক্প্রতিবন্ধী হওয়ায় ইশারায় কথা বলতেন। পড়াশোনার পাশাপাশি নির্মাণশ্রমিকের কাজ করে পরিবারের হাল ধরেছিলেন। অবসরে কাগজের ফুল তৈরি করে গ্রামীণ মেলা ও বিভিন্ন দোকানে বিক্রি করতেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার রাতে কয়েকজন নির্মাণশ্রমিকের সঙ্গে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন মেহেদী। মঙ্গলবার সকালে ঢাকায় পৌঁছান তিনি। ওই দিন বিকেলে বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনের ১ নম্বর সড়কে আসরের নামাজ শেষে ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে দ্রুতগতির একটি প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে উঠে তাকে চাপা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
মেহেদীর মা মিনু বেগম জানান, প্রচণ্ড গরমের কারণে এর আগে ছেলে ঢাকায় যেতে চাইলেও তাকে যেতে দেননি। পরে আবহাওয়া কিছুটা ঠান্ডা হলে সোমবার রাতে কাজে পাঠান। যাওয়ার সময় মেহেদী বলেছিলেন, ঢাকায় কাজ করে টাকা জমিয়ে ঈদের আগে বাড়ি ফিরবেন। সেই টাকা দিয়ে ভাঙাচোরা ঘরটি ঠিক করবেন।
মিনু বেগম বলেন, আমার ছেলে ভালো করে কথা বলতে পারত না, কিন্তু সবকিছু বুঝত। ভেবেছিলাম ঢাকায় গিয়ে কিছু আয়-রোজগার করলে সংসারে সচ্ছলতা আসবে। বাড়ির ঘরটাও ঠিক করবে। কিন্তু যাওয়ার এক দিনের মাথায় আমার ছেলে লাশ হয়ে ফিরল।
স্বজনরা জানান, মেহেদী এর আগেও নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতে ঢাকায় আসতেন। নিজের খরচ বাদ দিয়ে মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়িতে পাঠাতেন। বাবার সামান্য আয় ও মেহেদীর উপার্জনেই চলত তাদের সংসার।
তিন ভাই-বোনের মধ্যে মেহেদী ছিলেন দ্বিতীয়। বড় ভাই ও ছোট বোনের বিয়ে হয়েছে। বাবা-মায়ের সঙ্গেই থাকতেন তিনি। পরিবারের আর্থিক সংকটের পাশাপাশি পুরোনো ঘরটি সংস্কারের দায়িত্বও নিজের কাঁধে নিয়েছিলেন মেহেদী।
মেহেদীর বাবা এরশাদুল হক বলেন, সোমবার রাতে আমি নিজে তাকে ঢাকার গাড়িতে তুলে দিলাম। আজ তার লাশ বাড়িতে এসেছে। এটা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। এভাবে আমার বাবাকে হারাব জানলে তাকে ঢাকায় যেতে দিতাম না। এখন আমার সব শেষ হয়ে গেল।
মেহেদীর ফুফাতো ভাই সাজ্জাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, তাদের ১০ শতক জমির ভিটেটুকুই সম্বল। বাবার দিনমজুরি ও মেহেদীর উপার্জনে চলত সংসার। বাক্প্রতিবন্ধী হলেও মেহেদীর মধ্যে অনেক প্রতিভা ছিল। গ্রামের সবাই তাকে ভালোবাসতেন।
বুধবার দুপুরে মেহেদীর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। বাড়ির সামনে স্বজন ও প্রতিবেশীরা শেষবারের মতো তাকে দেখতে ভিড় করেন। পরে বিকেলে হাজীপাড়া কবরস্থানে জানাজা শেষে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা গাড়িতে থাকা এক কিশোরকে আটক করে পুলিশের কাছে দেন। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতেও গাড়ির চালকের আসনের দিক থেকে এক কিশোরকে বের হতে দেখা যায়। তবে প্রথম দিকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল এবং মামলায় তার নামও ছিল না।
মামলায় গাড়িটির মূল চালক হিসেবে আকাশ মারক নামের এক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক ছিলেন।
তবে পরে তদন্তে চালকের আসনে থাকা কিশোরের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়ে তাকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। গ্রেপ্তার কিশোরের নাম আজান আলী শরীফ (১৭)। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশান এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গুলশান জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ আমিনুল হক বাপ্পী গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এ ঘটনায় দুর্ঘটনার সময় গাড়িটি আসলে কে চালাচ্ছিল এবং প্রথমে আটক করার পর ওই কিশোরকে কেন মামলায় আসামি করা হয়নি তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তে পাওয়া তথ্য, ভিডিও ফুটেজসহ অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আরটিভি/এসকে




