
রাজধানীর মালিবাগে একটি হোটেল সংলগ্ন সড়কে ঢাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরকে হত্যাচেষ্টার ঘটনার সত্যতা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে নুর, পুলিশ এবং এক গাড়ি ব্যবসায়ীর পৃথক বক্তব্য পাওয়া গেছে। যাতে নুর অভিযোগ করছেন, তিনি প্রতিদিন যে মোটরসাইকেলে করে বাসায় ফিরেন ওই মোটরসাইকেলকেই টার্গেট করে বাসে ধাক্কা লাগিয়ে দিয়েছে একটি প্রাইভেটকার, যা তাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে। যদিও তিনি ওই রাতে সেই মোটরসাইকেলে না থেকে পাশেই অন্য একটি প্রাইভেটকারে ছিলেন। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, ঘটনাস্থলে দূর্ঘটনা ঘটলেও মোটরসাইকেল সংক্রান্ত কোনও দূর্ঘটনা ঘটেনি। এমনকি হত্যা চেষ্টার অভিযোগ এনে নুর মিথ্যা জিডি করেছেন। এদিকে যে প্রাইভেটকারটি ঘিরে এতো কাণ্ড সেই প্রাইভেটকারের ভেতরে ছিলেন সাকিব আহমেদ নামের এক গাড়ি ব্যবসায়ী। তিনিও এ নিয়ে আরটিভি নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন।
দুর্ঘটনার শিকার ধুসর রঙের গাড়ির মালিক সাকিবের বক্তব্য:
‘আমার নাম সাকিব আহমেদ। আমি প্রাইভেটকারের ব্যবসা করি। বিজয় স্বরণীতে অটোডিল এবং গুলশানে অটোবিজ নামের গাড়ির দুইটা শো রুম আছে আমার। দূর্ঘটনার শিকার আমার গাড়িটি এখন আছে খিলাগাঁওয়ের একটি গ্যারেজে।
আমি বেইলী রোড থেকে খিলাগাঁয়ের দিকে যাচ্ছিলাম, গাড়িটি চালাচ্ছিলো আমার ড্রাইভার। এসময় আমি শান্তিনগর মোড় থেকে ফ্লাইওভারে উঠে মালিবাগ আবুল হোটেলের ঢাল দিয়ে নামতেছিলাম। ওই সময়ে আমার গাড়িটা একটু বেশি স্পিডে ছিলো, ঘণ্টায় আনুমানিক ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার হবে। ফ্লাইওভার থেকে নামার সময় যখন ঢালে আমার ড্রাইভার গাড়িটির ব্রেক ধরে স্পিড কমানোর চেষ্টা করে, কিন্তু কোনোভাবেই গাড়িটা থামতেছিলো না। তখন আমার ড্রাইভার হ্যান্ড ব্রেক ধরলেও গাড়িটি দাঁড়ালো না। সড়কে আশপাশে অনেক লোকজন দেখে ডানে বা বামে না কেটে তাৎক্ষণীক সিদ্ধান্ত নিয়ে গাড়িটি স্টপেজে দাঁড়িয়ে থাকা সু-প্রভাত পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের পেছনে মেরে দেয় আমর ড্রাইভার। যাতে কোনো মানুষজনের ক্ষতি না হয়। জোরে ধাক্কা লাগায় আমি গাড়ির ভেতরেই মাথায় এবং পায়ে আঘাতপ্রাপ্ত হই, আমার শরীর থেকে রক্তও বের হতে শুরু করে। পরে স্থানীয় ৫০-৬০ জন লোক আমাকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। ঘটনার ৩ থেকে ৪ মিনিটের মধ্যেই স্পটে রামপুরা থানার পুলিশ চলে আসে। ওই সময়ে আমি ঘটনাস্থলে ১ ঘণ্টা যাবৎ অবস্থান করছিলাম। তখন আমার গাড়িটা যে বাসে লেগেছিলো, সেই বাসের চালক এবং যাত্রীদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম কারো কোনো ক্ষতি হয়েছে কিনা? কিন্তু তারা বলেছে, কারোই কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
এরপরেই আমি গাড়িটি গ্যারেজে পাঠিয়ে দেই এবং পুলিশ আমার নাম-ঠিকানা সব লিখে রাখে। এরপর যখন আমি বাসায় চলে গেলাম, ওই রাতেই ৩ টার দিকে হঠাৎ আমার স্ত্রী নুরদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আমার দূর্ঘটনার ভিডিও ফেসবুকে আমাকে দেখায়। তখন আমি অবাক হয়ে যাই!
যে নুরকে আমি ছিনিও না, কখনো দেখিও না, তবে নাম শুনেছি কেবল। তার অনেক আলোচনা-সমালোচনাও দেখেছি। কিন্তু আমি রাজনীতি করিনি কখনো, যেহেতু আমি ব্যবসায়ী, এমনকি রাজনীতির কোনো লোকের সাথে আমার কোনো সম্পর্কও নেই।
এরপর আজ সকালে যখন আমি গ্যারেজে যাই, তখন পুলিশ আমাকে ফোন করে জানায়, আমার নামে নাকি নুর জিডি করেছে। এরপর হাতিরঝিল জোনের পুলিশের এডিসি আমাকে ফোন করে জানান যে আমার নামে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে আমি থানায় গেলে নুরদের জিডির বিষয়টি জানতে পারি। পুলিশ যাচাই করে দেখেছে এটি একটি এক্সিডেন্ট মাত্র, আর কিছু নয়। এই দূর্ঘটনা কেবল আমি এবং আমার গাড়ির চালক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, আর কেউ না।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর আমার অনেক ক্ষতি করেছে। আমর মানহানি করেছে। আমার নামে বিভিন্ন রকমের মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছে। আমি তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আমার তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছি।
অবশ্যই সে (নুর) রাজনৈতিক কোনো ফায়দা নিতে আমাকে বলির পাঠা বানিয়েছে। অথচ নুরকে আমি জীবনে কখনোই সামনে থেকে দেখিনি। আমি কেনো তাকে হত্যা করতে যাবো! সে কখনোই দেখাতে পারবে না যে, আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত আছি।
নুরুল হক নুরের বক্তব্য:
গতকাল বুধবার আনুমানিক রাত ১১টার সময় আমি পল্টন থেকে বাড্ডায় বাসায় ফিরছিলাম। পথে মালিবাগ ফ্লাইওভার থেকে নামার সময় একটি প্রাইভেটকার পেছন থেকে আমার নিয়মিত ব্যবহৃত মোটরসাইকেলকে অনুসরণ ও তাড়া করে। ফ্লাইওভার থেকে নামার পর প্রাইভেটকারটি আমার মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু মোটরসাইকেলের চালক আমিনুল ইসলাম কৌশলে তা এড়িয়ে যায়। এতে প্রাইভেটকারটি মালিবাগ আবুল হোটেলের সামনে একটি বাসকে ধাক্কা দেয়। অবশ্য ঘটনার সময় আমি নিজে ওই মোটরসাইকেলে ছিলাম না। আমি ছিলাম পাশের একটি গাড়িতে। তবে ঘটনাটি আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই ঘটানো হয়েছে।
আজ সংবাদ সম্মেলনে নুর বলেন, চিরতরে কণ্ঠ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য এই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আমার প্রাণনাশের পরিকল্পনা নিয়েছে তারা। এর সাথে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি ।
ডিএমপি’র তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) হারুন অর রশীদের বক্তব্য:
আজ বৃহস্পতিবার (১০ ডিসেম্বর) ডিসি হারুন বলেন, ঢাকসুর সাবেক ভিপি নুর মিথ্যা অভিযোগ করেছে। তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়নি। ঘটনাস্থলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। উল্টো দূর্ঘটনার শিকার এক যুবকের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নুর মিথ্যা রটিয়েছে। পুরো ঘটনা সাজানো। আর প্রাইভেটকারটি কোনো সচিবের নয় বা সচিবালয়ের স্টিকার ছিলো না, এটি ব্যক্তিগত গাড়ি।
কেএফ/এমকে




