
নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার জয়পুর ইউনিয়নের চাঁচই গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস শুকুর জমাদ্দার। ১৯৭১ সালে রাইফেল কাঁধে নিয়ে জয় বাংলা স্লোগান বুকে ধারণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। দীর্ঘ ৯ মাস রণাঙ্গনে সম্মুখ সমরে যুদ্ধ করে দেশকে শত্রুমুক্ত করে স্বাধীন বাংলাদেশে উড়িয়েছিলেন লাল সবুজের পতাকা।
সেই তরতাজা যুবক আজ বয়সের ভারে ন্যূব্জ। শরীর জুড়ে রোগ ভর করেছে। এখন আর মুখ দিয়ে জয়বাংলা স্লোগান শোনা যায় না। কথাও বলতে পারেন না। যেন বোবা হয়ে গেছেন। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। কাঁধে রাইফেলের পরিবর্তে এখন পরের কাঁধে ভর করে চলতে হয় এই মুক্তিযোদ্ধাকে। আর্থিক অনটনে সঠিকভাবে চিকিৎসাও করাতে পারছেন না তিনি।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস শুকুর ১৯৪৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমান বয়স ৭৩ বছরের একটু বেশি। পিতার নাম মরহুম আরিফ জমাদ্দার। এই বীর মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী, চার ছেলে ও দুটি মেয়ে সন্তান রয়েছে। দুটি ছেলে বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। করোনার কারণে তাদেরও আর্থিক অনটন চলছে। একটি মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। অবিবাহিত ছোট মেয়ে ও দুটি ছেলে নিয়ে বসবাস করেন। বর্তমানে দুই ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস বসবাস করেন ৯ শতক জমির একটি পুরনো টিনের চালার বাড়িতে। ছোট ছেলে এখনও পড়ালেখা করছে। সেজ ছেলে শাহীন জমাদ্দার একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। এই পরিবারটির সম্বল মাত্র ৯ শতক জমি আর টিনের চালার এই ঘরটি।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস শুকুরের প্রতিবন্ধী ছেলে শাহীন জমাদ্দার বলেন, আমাদের বসতবাড়ির ৯ শতক জমি ছাড়া কিছুই নেই। সরকার প্রদত্ত ১২ হাজার ভাতার টাকা দিয়েই আমাদের সংসারের খরচ চালাতে হয়। আমি প্রতিবন্ধী। কিছুদিন দর্জির কাজ করেছি। কিন্তু করোনার কারণে সেখানে রোজগার একেবারেই কম। আমি অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেছি। মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও প্রতিবন্ধী কোটায় সরকারি চাকরির জন্য বিভিন্ন দপ্তরে বহু ঘুরেও চাকরি মেলাতে পারিনি। চাকরির বয়স শেষের দিকে। একটি চাকরি হলে আমার অসুস্থ্য বাবা মা ও ভাই বোনদের নিয়ে কোনোরকম বেঁচে থাকতে পারতাম।
বীর মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী শিরিনা বেগম বলেন, আমি ও আমার স্বামী দুজনেই অসুস্থ। বয়সের সাথে সাথে আমার স্বামীর শরীরে রোগব্যাধি যেন মাকড়সার জালের মতো বিস্তার করেছে। মাঝে মধ্যে চিকিৎসার জন্য যশোর ও খুলনা নিতে হয়। সরকারের দেয়া ১২ হাজার ভাতার টাকা দিয়েই আমাদের সংসার চলে। চিকিৎসার জন্য ভাতা থেকে ২ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছি। তাই ভাতার টাকা থেকে ঋণের টাকা কেটে নিচ্ছে। বর্তমানে খুবই কষ্টে ছেলে-মেয়ে নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। সরকার যদি আমাদের চিকিৎসার জন্য বিশেষ অনুদান দিতো, তাহলে আমার ও অসুস্থ স্বামীর সুচিকিৎসা করাতে পারতাম।
লোহাগড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আব্দুল হামিদ বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস শুকুর দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। তিনি চলাফেরা করতে পারেন না। মুখ দিয়ে এখন আর কথা বলতে পারেন না। তার সুচিকিৎসা প্রয়োজন। মহান এই বিজয়ের মাসে সহযোদ্ধা আব্দুস শুকুরের উন্নত চিকিৎসার পাশাপাশি আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে তার সন্তানদের বিশেষ বিবেচনায় চাকরি দেওয়ার দাবি জানাই।
নড়াইল জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা বলেন, বর্তমান সরকার আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি বিশেষ নজর দিয়েছেন। অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি তৈরি করে দিয়েছেন, ভাতা বৃদ্ধি করেছেন। অসুস্থ এই বীর মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসার জন্য বিশেষ অনুদানের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে সহযোগিতা করা হবে।
পি




