
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কার্যক্রমের ওপর সম্প্রতি একটি মহাপরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম খালেদ ইকবাল ঘোষিত এই মহাপরিকল্পনা নিয়ে বিশেষজ্ঞ এবং বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে বেশ কৌতূহলের উদ্রেক করেছে। তারা বলছেন চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়বে এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আদৌ এসব পরিকল্পনা যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে সন্দিহান তারা। আর এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পুরোপুরি সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
যা আছে মহাপরিকল্পনায়
মহাপরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের ইপিজেড থেকে দক্ষিণ কাট্টলি রাসমনি ঘাট পর্যন্ত সমুদ্র তীরবর্তী স্থানে বে টার্মিনাল নির্মাণ। ২০২১ সালের আগেই এর প্রথম পর্বের নির্মাণ কাজ এবং ২০২৫ সালের মধ্যে দ্বিতীয় ধাপের নির্মাণ কাজ শেষ করা। এরপর তৃতীয় ধাপের নির্মাণ কাজ শুরু করা।এছাড়া রিজিওনাল কানেক্টিভিটি বৃদ্ধি করা এবং ভারতের সেভেন সিস্টার ও চীনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলকে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে দেয়া। তা থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়। কার্গো এবং কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং প্রবৃদ্ধি সামাল দেয়ার জন্য ২০১৯ সালের মধ্যেই ৬০০ মিটার দীর্ঘ পতেঙ্গা টার্মিনাল নির্মাণ শেষ করা।
আরো আছে ৮৭০ মিটার দীর্ঘ কর্ণফুলী কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ। এজন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের সাথে সরকার এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সমঝোতা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারীত্বের ভিত্তিতে ৮২০ মিটার দীর্ঘ লালদিয়া মাল্টি-পারপাস টার্মিনাল আগামী বছরের মাঝামাঝি শুরু করাও ছিল ওই পরিকল্পনায়। মিরশরাইয়ে একটি জেটি নির্মাণ ছাড়াও বঙ্গোপসাগরে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফ্লোটিং হার্বার নির্মাণ এবং কক্সবাজার এলাকায় ক্রুজ টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা আছে এতে।
বন্দর সংরক্ষিত এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য সম্পূর্ণ এলাকা সিসিটিভি কভারেজের আওতায় নিয়ে আসা; ‘চট্টগ্রাম বন্দর এবং জাপানের কোবে পোর্টের সাথে ‘সিস্টার পোর্ট’ সম্পর্কের উপর শীঘ্রই ‘এমওইউ’ স্বাক্ষর করা; চট্টগ্রাম বন্দরের ট্রেনিং সিস্টেম এবং ট্রেনিং ইস্টিটিউটের উন্নতির জন্য নেদারল্যান্ড সরকারের এক মিলিয়ন ডলারের অনুদান প্রাপ্তির আশা; কর্ণফুলীর নাব্যতা ফেরাতে সদরঘাট থেকে বাকলিয়ার চর পর্যন্ত ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু করা এসবও ছিল পরিকল্পনায়।
আরো আছে বন্দর প্রশাসনিক ভবনের পেছনে ৪০ তলা সিপিএ টাওয়ার নির্মাণ; ৩০ মেগাওয়াটের পাওয়ার প্লান্ট তৈরি; বন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় ১,২০,০০০ বর্গমিটারের ইয়ার্ড নির্মাণ; মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর ও প্রতিবন্ধী স্কুল নির্মাণ; বিভিন্ন ধরনের কন্টেইনার ও কার্গো হ্যান্ডেলিং ইক্যুইপমেন্ট ক্রয় করা।
এর পাশাপাশি সম্প্রতি চট্টগ্রামে এসে নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান এবং বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ জানিয়েছেন সোনাদিয়া বা মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ কাজ শুরু হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ এবং ব্যবসায়ীরা যা বললেন
চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান এম খালেদ ইকবাল বলছেন, ‘আমরা সরকারের রূপকল্প -২০২১ এবং ২০৪১, সাসটেইনঅ্যাবল ডেভেলপমেন্ট গোল এবং সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা সামনে রেখে চট্টগ্রাম বন্দরের ‘স্ট্রাটেজিক মাস্টার প্লান’ এর ভিত্তিতে স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি।’ তার মতে, বন্দর কর্তৃপক্ষ যে পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করেছে তা বাস্তবায়ন করা গেলে ২০২১ সালে বিশ্বের সেরা ১০০টি বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর ৩০তম অবস্থানে আসতে পারবে।’
এ প্রসঙ্গে চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রির পরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ার শওকত আফসার আরটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘বন্দরের এই মহাপরিকল্পনা অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এটি অবশ্যই সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন হতে হবে। এক্ষেত্রে বন্দর কর্তৃপক্ষের দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রীতার কারণে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন অনেক কঠিন হবে।
এই ব্যবসায়ী নেতা আরো বলছেন, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বর্তমান বন্দরের সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ বাড়ানো সম্ভব। অথচ বন্দর কর্তৃপক্ষতো সেটিই পারছেনা। আর বন্দরের দক্ষতা নিশ্চিত করতে কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হবে সে ব্যাপারেও একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন, যেটি এখন নেই। আর দুটি ঈদের আগে পরে ৬ মাস বন্দরের জন্য ‘পিক আওয়ার’। অথচ এব্যাপারে বন্দর কর্তৃপক্ষের কোন পূর্ব প্রস্তুতিই থাকেনা। ফলে ব্যবসায়ীদের এখনো নানা রকম সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনোমিক রিসার্সের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আহসানুল আলম আরটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘গভীর সমুদ্র বন্দর আমাদের প্রয়োজন, তবে এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো নানা জটিলতা আছে। রিজিওনাল কানেক্টিভিটির মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ভারত বা চীনে পণ্য
পরিবহনের জন্য যে অবকাঠামো দরকার তা আমাদের নেই। বিশেষ করে আমাদের রাস্তাগুলোর খুবই নাজুক অবস্থা। বন্দরের পরিকল্পনায় এই বিষয়গুলোও মাথায় রাখতে হবে। তাছাড়া সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়েরও এক্ষেত্রে বিশাল দ্বায়িত্ব রয়েছে।’
আর বেটার্মিনাল সম্পর্কে তার মত হলো, ‘বে টার্মিনাল হলে বন্দরের সক্ষমতা দুই থেকে তিন গুন বাড়বে এবং ব্যবসায়ীদের ‘বিজনেস অব কস্ট’ কমে আসবে। তবে বর্তমানে কাজের যে গতি তাতে এটি যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা যাবে কিনা তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।’ বাকি পরিকল্পনাগুলোও যথাসময়ে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তার সন্দেহ আছে বলে জানান তিনি।
তবে এসব সমালোচনার জবাবে বন্দরের প্রশাসন এবং পরিকল্পনা বিভাগের সদস্য মোহাম্মদ জাফর আলম আরটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘এধরনের সমালোচনা অমূলক। বন্দরের মহপরিকল্পনা যথাসময়ে বাস্তবায়ন করার জন্য পরোপুরি সক্ষমতা বন্দর কর্তৃপক্ষের রয়েছে। এ মহাপরিকল্পনা যথাসময়েই বাস্তবায়িত হবে।
এসজে




