
কুমিল্লার দেবিদ্বারে তিন শিশুর সঙ্গে অনৈতিক কাজের অভিযোগে আবদুল কাদের নামে ৬৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধকে দুই দফা সামাজিক সালিশে ১০১ বেতের আঘাত (দোররা) এবং গলায় জুতার মালা এবং মাথা ন্যাড়াসহ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দেবিদ্বার পৌর এলাকার বারেরা গ্রামের আইছা গাজীর বাড়িতে এ ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার পর থেকে ওই বৃদ্ধ বাকরুদ্ধ এবং অসুস্থ হয়ে নিজবাড়িতে শয্যাশায়ী।
স্থানীয়রা আরটিভি নিউজকে জানিয়েছেন, গত শনিবার দুপুরে ৭ বছর বয়সী এক কন্যা শিশুকে ডেকে এনে শ্লীলতাহানি চেষ্টার অভিযোগে আবদুল কাদেরের বিরুদ্ধে ওই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এর আগেও ওই বৃদ্ধ আরও দুই শিশুর সঙ্গে একই আচরণ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় তোলপাড় শুরু হলে গত শনিবার সামাজিকভাবে সালিশ ডাকা হয়। সালিশে একই বাড়ির চট্টগ্রামে কর্মরত পুলিশ সদস্য মো. ইউনুছ মিয়া, খুলনায় সেটেলম্যান্ট অফিসে কর্মরত আবদুল হাকিম, কৃষক সুলতান আহমেদ, আলমগীর হোসেনের উপস্থিতিতে ওই বৃদ্ধের মাথা ন্যাড়া করে গলায় জুতার মালা ঝুলিয়ে কান ধরে উঠবস করানো হয়।
একই সঙ্গে কাফফারা হিসেবে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। পরবর্তীতে তাকে হুজুরের মাধ্যমে শুদ্ধি করার নামে গত সোমবার (১৩ ডিসেম্বর) আবারও সালিশ ডাকা হয়। সালিশে বারেরা মোল্লাবাড়ির ইমাম মাওলানা মো. নুরুল ইসলাম এবং বারেরা দাখিল মহিলা মাদরাসার সহকারী মৌলভী মো. ইব্রাহীম খলিলসহ দুই হুজুরকে ডাকা হয়।
বৈঠকে মাওলানা মো. নুরুল ইসলামের ফতোয়ায় বৃদ্ধকে ১০১টি বেতের আঘাত। জুতার মালা গলায় দিয়ে উপস্থিত সবার সামনে কান ধরে ক্ষমা চাওয়ার ফতোয়া জারি করা হয়। একই সঙ্গে ১০১ দোররা মারার দায়িত্বটা মাওলানা মো. নুরুল ইসলাম নিজ হাতে কার্যকর করেন।
সালিশদার আলমগীর হোসেন আরটিভি নিউজকে বলেন, ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী বেতের আঘাত (দোররা)'র ফতোয়ার বিষয়টি রাষ্ট্রীয় আইনে নিষিদ্ধ এটা আমার জানা ছিল না। ফতোয়া কার্যকর করার সময় মাওলানা মো. নুরুল ইসলাম ১০টি বেত একত্র করে ১০ বার বেত্রাঘাত এবং একটি বেত দিয়ে একবার বেত্রাঘাতে ওই রায় কার্যকর করেন। তাছাড়া অভিযুক্তের স্ত্রী মিনুয়ারা বেগমকে দিয়ে মাথা ন্যাড়া করার রায় কার্যকর করা হয়। ১০ হাজার টাকা জরিমানার রায় হলেও তা এখনও কার্যকর করা হয়নি।
অন্যদিকে এলাকার বিশিষ্ট সালিশদার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মনিরুল হক মোল্লা আরটিভি নিউজকে জানিয়েছেন, বিষয়টা তিনি পরে শুনেছেন। তাকে জানালে রাষ্ট্রের আইনবিরোধী ফতোয়া জারি ও বাস্তবায়নের সুযোগ পেত না। অপরাধ প্রমাণ হলে তাকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে তুলে দিতে পারত। অভিযুক্ত আবদুল কাদের ৫ ছেলে ও ৩ কন্যাসন্তানের জনক। ২ ছেলে কুরআনে হাফেজ, এক ছেলে প্রবাসী, এক ছেলে প্রতিবন্ধী, এক ছেলে বাড়িতে থেকে কৃষিকাজ করেন ও তিন কন্যারই বিয়ে হয়ে গেছে।
এ ব্যাপারে বারেরা দাখিল মহিলা মাদরাসার সহকারী মৌলভী মো. ইব্রাহীম খলিল আরটিভি নিউজকে বলেন, আমাকে তারা ডেকে নিয়ে গেছেন। বিষয়টি জানার পর মাওলানা মো. নুরুল ইসলাম হুজুরকে বলেছি, ফতোয়া এখন রাষ্ট্রীয় আইনবিরোধী। বেতের আঘাতের রায় কার্যকর করা যাবে না। আর যদি ইসলামী শরিয়া মতে বিচার করতে হয়, তাহলে মুফতির নির্দেশনা লাগবে।
বারেরা মোল্লাবাড়ি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা মো. নুরুল ইসলাম বলেন, আমি ইসলামী শরিয়ামতে সবার উপস্থিতিতে দোররা কার্যকর করেছি এবং তওবা পড়িয়েছি।
অভিযুক্ত আবদুল কাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদে কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি, তবে মাথা ন্যাড়া করার বিষয়ে জবাব দিয়েছেন।
এ ব্যাপারে দেবিদ্বার থানার ওসি মো. আরিফুর রহমান আরটিভি নিউজকে বলেন, বিষয়টি আমাদের জানা নেই, কেউ অভিযোগও করে নাই। বিষয়টি যেহেতু আমাদের নলেজে এসেছে আমরা তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
এমআই/টিআই




