
টানা তিন দিনের ছুটিতে ৩ লাখ পর্যটক সমাগম ঘটেছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে। এ কারণে হোটেলে রুম না পেয়ে সৈকতের বালিয়াড়ি ও বাসে রাত কাটাচ্ছে পর্যটকরা। গেল সোমবার (১৩ ডিসেম্বর) থেকে কক্সবাজারমুখী হয়ে ওঠে পর্যটকরা। এতে কক্সবাজারের সাড়ে ৪ শতাধিক হোটেল-মোটেলে চড়া দামেও রুম পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে সৈকতের বালিয়াড়িতে রাত যাপন করছে অনেক পর্যটক। আবার কেউ কেউ যাত্রীবাহী বাসের ভেতরেই রাত কাটাচ্ছেন। সেখানেও এক শ্রেণির লাঠিয়াল বাহিনী গাড়ি পার্কিংয়ের নামে ৮০০ টাকা করে আদায় করছে। আর পর্যটকদের সৈকতে নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।
এদিকে হোটেল-মোটেল ছাড়াও পরিবহন ভাড়া আদায় করছে অতিরিক্ত দ্বিগুণ। শহরের রিকশাচালক ও রেস্টুরেন্ট সবখানে এসব বাণিজ্য করছে। এতে করে দূর থেকে আসা পর্যটকরা হয়রানি ও প্রতারিত হচ্ছে।
হোটেলে রুম না পাওয়ার সুযোগে খাবার হোটেলগুলোও বাড়িয়ে দিয়েছে খাবারের দাম। পাশাপাশি পর্যটন এলাকায় রাস্তা মেরামতের কাজ চলমান থাকায় যানজটসহ নানা সংকট ও দুর্ভোগে পড়েছে পর্যটকরা। অনেক ভ্রমণকারী রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন রাত কাটানোর একটি কক্ষের জন্য। অবশ্য এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন পুলিশ ও জেলা প্রশাসন।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের পক্ষ থেকে শুক্রবার (১৭ ডিসেম্বর) পৃথক সময়ে পর্যটকদের যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হয় সে জন্য হোটেল ও রেস্টুরেন্টে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় সি পার্ল ১ ও ২ হোটেল থেকে ২ জন পর্যটকের টাকা ফেরত দেওয়া হয়। দুইটি হোটেলকে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার জন্য জরিমানা করা হয়। একইসঙ্গে পর্যটকদের কোনো ধরনের অভিযোগ থাকলে জেলা প্রশাসনের তথ্য ও অভিযোগ কেন্দ্রে জানানোর জন্য মাইকিং করা হয়। জেলা প্রশাসনের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে সাংবাদিকদের জানানো হয়।
এদিকে, ঢাকা থেকে আসা আতাউর রহমান নামের এক পর্যটক আরটিভি নিউজকে জানিয়েছেন, ছুটিতে প্রথমবার কক্সবাজার সৈকত ভ্রমণে এসেছি। কিন্তু এখনকার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ঢাকার মতো মানুষের ভিড়। বৃহস্পতিবার কক্সবাজার আসলেও এক রাত সৈকতে কাটিয়েছি। শুক্রবার (১৭ ডিসেম্বর) সকালে চড়া দামে হোটেলে রুম পেয়েছি। আমার মনে হয় মৌসুমে কক্সবাজার না আসা উচিত।
জামালপুর থেকে আসা শাহীন দম্পতি জীবনের প্রথমবার এসেছেন কক্সবাজারে। তারা আরটিভি নিউজকে জানিয়েছেন, এই প্রথমবার এসে কক্সবাজার দেখলাম। একসঙ্গে এতো বিপুল সংখ্যক মানুষ আর দেখিনি। সৈকতে এতো বেশি মানুষ দেখে মনে হচ্ছে এটা ঢেউয়ের সাগর নয়, যেন মানুষের সাগর।
দেখা গেছে, হোটেল মোটেলগুলোতে স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত রুম ভাড়া আদায় করছে। অনেক হোটেলে প্রকাশ্যে এসব ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। আগে যে রুম ভাড়া ১ থেকে ২ হাজার টাকা ছিল, তা বেড়ে এক লাফে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করছে। একইভাবে পরিবহণ, খাবারের দোকান ও রেস্টুরেন্টে অস্বাভাবিক দামে পর্যটকদের ঠকাচ্ছে। বিশেষ করে শহরের কলাতলী মোড় থেকে সুগন্ধা পয়েন্ট পর্যন্ত ইজিবাইক ও রিকশা ভাড়া জন প্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা। যদি কেউ প্রাইভেটে আসে তাহলে ৩০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া আদায় করার বিধান রয়েছে।
কিন্তু রিকশা ও ইজিবাইক চালকরা এতে আদায় করছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। বিশেষ করে এক শ্রেণির ইজিবাইক চালকরা পর্যটক দেখলেই দ্রুত পাশে গিয়ে কৌশলে গাড়িতে ওঠে। পথ অনেক দূর আছে, এমন মিথ্যা অজুহাত দিয়ে ভিন্ন পথে নিয়ে আদায় করছে অতিরিক্ত ভাড়া। এতে করে কক্সবাজার পর্যটন শিল্প নিয়ে পর্যটকদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের লাবনী পয়েন্ট ট্যুরিস্ট পুলিশ কার্যালয়ের সঙ্গে লাগোয়া কয়লা রেস্টুরেন্ট। এ রেস্টুরেন্টের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ করেছেন অনেক পর্যটক। কক্সবাজারে বেড়াতে এসে বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত রহমান আরমান আরটিভি নিউজকে বলেন, শুধু গলাকাটা বললেই কম হবে, রীতিমতো অবাক হয়েছি কয়লা রেস্টুরেন্টে এক বাটি ডালের দাম রাখা হয়েছে ৪০০ টাকা। অথচ এ মানের অন্য রেস্টুরেন্টে এক বাটি ডালের দাম নেওয়া হচ্ছে ১০০ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু কোরাল রেস্টুরেন্ট বা কয়লা রেস্টুরেন্ট নয়, কক্সবাজার হোটেল-মোটেল জোন, ইনানিসহ মেরিন ড্রাইভ সড়কের বিভিন্ন স্থানে যে চার শতাধিক রেস্টুরেন্ট রয়েছে এরমধ্যে বেশিরভাগ রেস্টুরেন্টে চলছে গলাকাটা বাণিজ্য। এতে হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন কক্সবাজার ভ্রমণে আসা পর্যটকরা।
হোটেল-মোটেলগুলোতে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার কথা স্বীকার করে কক্সবাজার হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাসেম বলেন, ভরা মৌসুমে হোটেলের রুম ভাড়া একটু বেশি। তবে মাত্রাতিরিক্ত যে হোটেল মালিক ভাড়া আদায় করে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযানও চলছে। কিছু হোটেল আর রেস্তোঁরায় জরিমানা করা হয়েছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পুলিশ সুপার জিল্লুর রহমান আরটিভি নিউজকে জানিয়েছেন, ছুটিতে কয়েক লাখ পর্যটক কক্সবাজারে অবস্থান নিয়েছে। এসব পর্যটকদের উপস্থিতি দেখে ট্যুরিস্ট পুলিশ আগের চেয়ে দ্বিগুণ নিরাপত্তা জোরদার করেছে। কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ও হোটেল-মোটেল এলাকায় তারা দায়িত্ব পালন করছে। কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোতায়েন করা হয়েছে সাদা পোশাকে বিশেষ পুলিশ।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (পর্যটন সেল) আবু সুফিয়ান বলেন, আগত পর্যটকদের হয়রানি করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। যেখানেই অভিযোগ পাওয়া যাবে সঙ্গে সঙ্গে সেখানে গিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এমআই/এসকে




