ঢাকা রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩

ধর্ষণ মামলায় ফাঁসানো হয় ইমামকে, ভুক্তভোগীর সন্তানের ডিএনএ টেস্টে মিলল ভয়াবহ সত্য

ফেনী প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ০৭ মে ২০২৬, ০৭:৫০ পিএম
মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয় ইমাম মোজাফফরকে। ছবি আরটিভি

ঘটনাটি ফেনীর সীমান্তবর্তী উপজেলা পরশুরামের। এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে গ্রামের এক ইমামের বিরুদ্ধে। অভিযোগের পরপরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে এক মাসেরও বেশি সময় জেল খাটতে হয়। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে চরম অপমানের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। হারাতে হয় চাকরিও। কিন্তু দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর সামনে আসে ভয়ংকর এক সত্য। কিশোরীর গর্ভের সন্তানের ডিএনএ পরীক্ষায় জানা যায়, শিশুটির বাবা ওই ইমাম নন; বরং মেয়েটিরই আপন বড় ভাই। পরে পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে ভাই নিজেও বোনকে জোরপূর্বক ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন।

ফরেনসিক পরীক্ষায় পরশুরামের বক্সমাহমুদে ধর্ষণের শিকার সেই কিশোরীর ভূমিষ্ঠ সন্তানের সঙ্গে তার আপন বড় ভাইয়ের ডিএনএর মিল পাওয়া গেছে। আর এই অপরাধের দায় থেকে ভাইকে বাঁচাতে ফাঁসানো হয়েছিল স্থানীয় এক মসজিদের ইমামকে। এক মাস দুইদিন কারাভোগের পর ধর্ষণ মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন তিনি।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর ওই গ্রামের ভুক্তভোগী খুকু (ছদ্মনাম) আক্তারের (১৪) মা তার মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে একই গ্রামের স্থানীয় জামে মসজিদের ইমাম ও মক্তবের শিক্ষক মোজাফফরের বিরুদ্ধে পরশুরাম মডেল থানায় মামলা করেন। নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও ছাড় পাননি মোজাফফর। অভিযোগ মিথ্যা উল্লেখ করে ওই পরিবারের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর ফেনীর আদালতে মামলা করতে যান মোজাফফর। এ সময় আদালত প্রাঙ্গণ থেকে গ্রামের মাতব্বর ও মামলার বাদী তাকে জোরপূর্বক পুলিশের হাতে তুলে দেন। এদিকে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে সন্তান প্রসব করে স্থানীয় একটি মক্তবে অধ্যয়নরত ভুক্তভোগী কিশোরী। আর এর দায় চাপানো হয় ওই মক্তবের শিক্ষক মোজাফফর আহমদের (২৫) কাঁধে। একমাস দুইদিন কারাভোগ করেন তিনি।

একই বছরের ২২ ডিসেম্বর অভিযুক্ত মোজাফফরকে ঢাকার মালিবাগে পুলিশের সিআইডি বিভাগের ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য স্ব-শরীরে ও খুকু আক্তারের সংরক্ষিত ভ্যাজাইনাল সোয়াব পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ঢাকার মালিবাগের ফরেনসিক ল্যাবরেটরি থেকে থেকে ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি ডিএনএ প্রতিবেদন পান পরশুরাম মডেল থানার উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) জাহিদুল ইসলাম।

ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে, পরীক্ষায় ভ্যাজাইনাল সোয়াবে পুরুষের বীর্যের উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত হয়নি। ভ্যাজাইনাল সোয়াবে বীর্যের উপস্থিতি শনাক্ত না হওয়ায় মোজাফফরের ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে তুলনা করে মতামত প্রদান করা সম্ভব নয়। এরপর ওই কিশোরী ও তার সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশু কন্যা সন্তানের জৈবিক পিতার নির্ধারণে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য তাদের পরীক্ষাগারে উপস্থিত হয়ে ডিএনএর নমুনা প্রদানের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়।

এর মধ্যে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে বিস্ময়কর তথ্য। ডিএনএ রিপোর্টে কিশোরীর সন্তানের সঙ্গে মোজাফফরের ডিএনএর মিল না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। পরে কিশোরীকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে এক পর্যায়ে ওই কিশোরী তার আপন বড় ভাই মোরশেদ তাকে লাগাতার ধর্ষণ করেছে বলে স্বীকারোক্তি দেয়। ঘটনা আড়াল করে ভাইকে বাঁচাতে শিক্ষক মোজাফফরকে ফাঁসানো হয়। পরে ২০২৫ সালের ১৯ মে বড় ভাই মোরশেদকে (২২) গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। আদালতে আপন বোনকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করে ২০ মে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করেন মোরশেদ।
আদালতে আবেদনের প্রেক্ষিতে ওই কিশোরী ও তার ভূমিষ্ঠ সন্তান ও বড় ভাই মোরশেদের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য একই বছরের ৪ আগস্ট ঢাকায় পুলিশের ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। ৯ আগস্ট ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ভিকটিমের সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়ার শিশু কন্যার সঙ্গে মোরশেদের ডিএনএ নমুনা মিলে যাওয়ায় তিনি তার জৈবিক পিতা।

ডিএনএ পরীক্ষক মো. জাহিদুল ইসলাম ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ডিএনএ পরীক্ষায় মোরশেদের সঙ্গে তার বোনের সন্তানের পিতা হিসেবে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ মিল রয়েছে। মোজাফফর আহমেদ ওই সন্তানের জৈবিক পিতা নন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পুলিশ পরিদর্শক শরীফ হোসেন অভিযোগপত্রে মোজাফফর আহমেদের বিরুদ্ধে আনিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০০) এর ৯(১) ধারায় অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় ধর্ষণ মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আর মোরশেদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমনের একই ধারায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর থেকে মোরশেদ ফেনী জেলা কারাগারে রয়েছেন। আদালতে ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট উপস্থাপনের পর এক মাস দুইদিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান মোজাফফর।

পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো/ আশ্রাফুল ইসলাম জানান, বিষয়টি নিয়ে পুলিশ গভীরভাবে তদন্ত করে। ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পর চার্জশিট থেকে তার নাম প্রত্যাহার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, নিরপরাধ একজনকে ফাঁসানোর জন্য চেষ্টা করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

পরশুরামের বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের উত্তর টেটেশ্বর গ্রামের পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদের ইমাম ও মক্তবের শিক্ষক ছিলেন মোজাফফর আহমেদ। এ ঘটনার পর মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি হারান তিনি। মামলার খরচ জোগাতে বিক্রি করেছেন ৫ শতক জমি। প্রতিনিয়ত সামাজিকভাবে হেয় হয়েছেন। এসব কারণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন মোজাফফর আহমেদ।

মোজাফফর আহমদ বলেন, অবশেষে সত্যের জয় হয়েছে। এ ঘটনায় আমি সামাজিক ও পারিবারিকভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছি। মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি হারিয়েছি। মামলার খরচ চালাতে বাড়ির পাশে মূল্যবান জায়গা বিক্রি করে দিয়েছি, অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। কারাভোগ, সামাজিক মর্যাদাহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ দাবি করেন তিনি।

আরও পড়ুন

তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় প্রায় মসজিদের ইমাম ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের বিভিন্ন অপবাদ দিয়ে ফাঁসানো হয়। প্রকৃত সত্য তুলে ধরা হলে এভাবে আমার মতো অনেক নিরপরাধ মানুষ বেঁচে যাবে।

মোজাফফর আহমেদের আইনজীবী আবদুল আলিম মাকসুদ বলেন, এ ধরনের ঘটনা বিরল। তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। ডিএনএ পরীক্ষায় সত্য উদঘাটন হয়েছে।

জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের পরশুরাম উপজেলার সাধারণ সম্পাদক মুফতি আমিনুল ইসলাম জানান, সুন্নি, কওমী বা সরকারি বুঝি না, সে একজন মজলুম ইমাম ও তালেবে ইলম। ক্ষতিগ্রস্ত ইমামের ক্ষতিপূরণ কে দেবে? তাকে মানসিকভাবে সাহস দেওয়ার পাশাপাশি, আর্থিক ও আইনিভাবে সহযোগিতা করা উচিত।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
জামালপুরে বিদেশি মদসহ গ্রেপ্তার ৫
জামালপুরের বকশীগঞ্জে অভিযান চালিয়ে ২১৭ বোতল ভারতীয় মদ ও একটি মোটরসাইকেলসহ পাঁচ মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি-১)। গ্রেপ্তার পাঁচজনের মধ্যে একজন উপজেলার ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান উদয়। শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাতে উপজেলার বৈষ্ণব পাড়া ও লাউচাপড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ভারতীয় মদসহ ওই ছাত্রদল নেতাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তাররা হলেন মো. সুজাত মিয়া (৩৭), মো. সিফাত (২০), মো. রুবেল মিয়া (২৭), মো. ফুরকান হোসেন (১৯) এবং আমান উল্লাহ উদয় (২৭)। ডিবি পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, উদ্ধার করা মাদকের আনুমানিক বাজারমূল্য ৬ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আমদানি নিষিদ্ধ ভারতীয় মদের চোরাচালানে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেলও জব্দ করা হয়েছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ডিবি-১ এর এসআই মো. সোহাগ রানার নেতৃত্বে উপজেলার বৈষ্ণব পাড়ার সুজাত মিয়ার বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর সময় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লাউচাপড়া এলাকা থেকে ছাত্রদল নেতা উদয়কে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে বকশীগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছেন, সীমান্ত এলাকা থেকে চোরাইপথে মদ এনে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করতেন তারা। এ বিষয়ে জামালপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীনুর ইসলাম তালুকদার বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এ ধরনের অভিযান চলমান থাকবে। রোববার দুপুরে মাদকসহ পাঁচজনকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। আরটিভি/ এসআর
জামালপুরে বিদেশি মদসহ গ্রেপ্তার ৫
সাজেকের পরিস্থিতি নিরসনে কমিটি গঠন
সাজেকের চলমান পরিস্থিতি নিরসন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে রাঙামাটিতে হেডম্যান ও কার্বারীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও সমস্যা সমাধানে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সাজেকের পরিস্থিতি নিরসনে কমিটি গঠন
চলন্ত বাসে নারী যাত্রীকে ধর্ষণ, চালকসহ তিনজনের যাবজ্জীবন
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে চলন্ত বাসে এক নারী যাত্রীকে ধর্ষণ ও তার মালামাল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় বাসের চালক, সহকারী ও কন্ট্রাক্টরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি প্রত্যেককে দুই লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
চলন্ত বাসে নারী যাত্রীকে ধর্ষণ, চালকসহ তিনজনের যাবজ্জীবন
আমঝোল সীমান্তে ভারতীয় বাঘের আক্রমণ, নারীসহ আহত ৩
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী ইউনিয়নের আমঝোল সীমান্তে বাঘের আক্রমণে নারীসহ তিনজন আহত হয়েছেন।
আমঝোল সীমান্তে ভারতীয় বাঘের আক্রমণ, নারীসহ আহত ৩
গোপালগঞ্জে পুলিশের গাড়িতে হামলার ঘটনায় ১০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ৭
গোপালগঞ্জে পুলিশের গাড়িতে হামলার ঘটনায় ৪০ জনের নাম উল্লেখ এবং ৬০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করার পর ৭ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
গোপালগঞ্জে পুলিশের গাড়িতে হামলার ঘটনায় ১০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ৭
আরও পড়ুন
চলন্ত বাসে নারী যাত্রীকে ধর্ষণ, চালকসহ তিনজনের যাবজ্জীবন
নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়তেই বেরিয়ে এলো আমিনুলের ‘আসল রূপ’, অতঃপর...
প্রেমিকের ডাকে সাড়া দিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার তরুণী
স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ, মোশারফের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড