চট্টগ্রামে বন্যা-পাহাড়ধসে মৃত ৩৯, বিপর্যস্ত ৯ লাখ ২৮ হাজার মানুষ

আরটিভি নিউজ

শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬ , ১২:১৬ পিএম


চট্টগ্রামে বন্যা-পাহাড়ধসে মৃত ৩৯, বিপর্যস্ত ৯ লাখ ২৮ হাজার মানুষ
ফাইল ছবি

টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম বিভাগে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৩৯ জনে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় প্রায় ৯ লাখ ২৮ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও পানির নিচে থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের শুক্রবার (১০ জুলাই) প্রকাশিত সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সবচেয়ে বেশি ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে কক্সবাজারে। নিহতদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা। এছাড়া চট্টগ্রামে আটজন, বান্দরবানে ছয়জন এবং রাঙ্গামাটিতে দুজন মারা গেছেন।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে জেলার ১৬টি উপজেলাসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যার কবলে পড়েছে।

দুর্যোগ মোকাবিলায় ৬৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ২৩ হাজার ৮৫৩ জন।

বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় সরকার ৭০০ টন চাল ও ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ৩০০ টন চাল, ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২২ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ১৮ হাজার ৩৩০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য আরও ৪০০ টন চাল ও ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা মজুত রয়েছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গতকাল বিকেল ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সংস্থাটি সতর্ক করে জানিয়েছে, ১২ জুলাই পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে।

আরও পড়ুন

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির সবচেয়ে বেশি অবনতি হয়েছে। এই দুই উপজেলায় পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

গতকাল বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নে আকস্মিক বন্যার স্রোতে ভেসে গিয়ে আশিক (১১) ও মিরাজ (৬) নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্গম উপকূলীয় অনেক ইউনিয়নে এখনও ত্রাণ পৌঁছেনি। টানা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা ও মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সাতকানিয়া অংশ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) থেকে পানির নিচে রয়েছে। বর্তমানে যান চলাচল চালু থাকলেও পানি আরও বাড়লে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বৃদ্ধি এবং পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়ার বাজালিয়া, কেওচিয়া, ছদাহা, কালিয়াইশ, ধর্মপুর, খাগরিয়া, আমিলাইশ, ঢেমশা, নলুয়া, চরতি ও পুরানগড় ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানিতে বসতঘর, কৃষিজমি, মাছের ঘের, বাজার ও গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় নৌকাই এখন একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যসংকটও প্রকট হয়ে উঠেছে।

ছদাহা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোরশেদুর রহমান জানান, ইউনিয়নের অন্তত পাঁচটি ওয়ার্ড পুরোপুরি পানির নিচে। প্রায় ১ হাজার ৫০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন এক টন চাল বরাদ্দ দিলেও পানির কারণে তা এখনও আনা সম্ভব হয়নি।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, চার লাখের বেশি মানুষ এখনও পানিবন্দি। উপজেলার প্রায় অর্ধেক কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্গম এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় সেখানে পৌঁছানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেনাবাহিনী স্পিডবোট ব্যবহার করে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

অন্যদিকে বাঁশখালীর ১৪টি ইউনিয়নেই বন্যার পানি ছড়িয়ে পড়েছে। জোয়ারের পানিতে খানখানাবাদ, কাথারিয়া, বাহারছড়া, গণ্ডামারা, শেখেরখীল, সরল, ছনুয়া ও গুণাগরী ইউনিয়নের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, হাজার হাজার কাঁচাঘর ধসে পড়েছে। তিন দিন ধরে বহু এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য ও ওষুধের সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, উপজেলার প্রায় অর্ধেক এলাকা এখনও পানির নিচে। এক লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ পর্যন্ত ৪৬ টন চাল, ৫ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ৬ হাজার মানুষের জন্য রান্না করা খাবার বিতরণ করা হলেও কয়েকটি এলাকায় এখনও পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

এদিকে ফটিকছড়ি, রাউজান, হাটহাজারী, মিরসরাই ও আনোয়ারার নিম্নাঞ্চলেও বন্যার পানি ঢুকে বসতঘর, কৃষিজমি ও মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

কক্সবাজারে বন্যার প্রভাবে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চকরিয়া ও মাতামুহুরী এলাকায়। ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা প্লাবিত হওয়ায় প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এতে সড়ক যোগাযোগ ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

বন্যার পানিতে নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক এলাকায় কোমর থেকে বুকসমান পানি থাকায় রান্নাঘর ডুবে গেছে এবং অসংখ্য পরিবার রান্না করতে পারছে না।

ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ধস ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে রাঙামাটির সাজেক উপত্যকায় আটকে পড়া ৪৬১ জন পর্যটককে উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পানিতে তলিয়ে যাওয়া সড়ক নৌকায় পার করিয়ে পরে সড়কপথে তাদের গন্তব্যে পাঠানো হয়।

অন্যদিকে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত আরও তিন দিন বাড়ানো হয়েছে। ফলে ১৫ জুলাই পর্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকবে।

রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি-হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (রাইমস) এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের যৌথ বিশেষ পাহাড়ধস সতর্কতা বুলেটিনে বলা হয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় মৌসুমি বায়ু এবং ভারতের উত্তর-পশ্চিম মধ্যপ্রদেশ ও সংলগ্ন এলাকায় সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে ১২ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। পাঁচটি জেলাকেই পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

৯ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ২২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে টেকনাফে ১৬৯ মিলিমিটার, রাঙ্গামাটিতে ১০৬ মিলিমিটার এবং কক্সবাজারে ৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।

এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে জানান, সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টি, বন্যা ও পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জের তিন উপজেলার চার ইউনিয়নের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় নদীর বাঁধের একটি অংশ ভেঙে যায়। এতে সদর উপজেলার লস্করপুর ও পইল ইউনিয়ন, বাহুবল উপজেলার লামাতাশি ইউনিয়ন এবং বানিয়াচং উপজেলার মক্রমপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

পানি বাড়তে থাকায় বহু পরিবার গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। বানিয়াচংয়ের রাধাপুর এলাকায়ও বাঁধ উপচে পানি প্রবেশ করেছে। শহররক্ষা বাঁধের মছুলিয়া পয়েন্ট ঝুঁকির মুখে থাকায় স্থানীয়রা তা রক্ষায় কাজ করছেন।

আরও পড়ুন

হবিগঞ্জ শহরের কামড়াপুর ও দানিয়ালপুর এলাকাও প্লাবিত হয়েছে। হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের কয়েকটি অংশ পানির নিচে চলে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। পানি আরও বাড়লে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তারা দ্রুত নদীভাঙন প্রতিরোধ, পর্যাপ্ত ত্রাণ বিতরণ এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন।

টানা বর্ষণে বাগেরহাটের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পানির নিচে চলে যাওয়ায় জনজীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় মোংলা সমুদ্রবন্দরের জন্য ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রেখেছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর।

বন্যাকবলিত এলাকায়, বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিকভাবে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং জেলা প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।

এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান শুক্রবার সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন। একই সঙ্গে উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission