বান্দরবানে সশস্ত্র সংগঠন কুকি চীন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) অস্থিরতা কাটিয়ে পাহাড়ে দুর্গম এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। কেএনএফের উৎপাতে ও আতঙ্কে ঘরছাড়া সাধারণ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে স্থায়ী শান্তি, সম্প্রীতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সব ধরনের মানবিক সহায়তা ও প্রত্যাবর্তন অব্যাহত রেখেছে।
ভারতের মিজোরামসহ অন্যত্রে আশ্রয় নেওয়া বম, ত্রিপুরা ও ম্রো জনগোষ্ঠী তাদের নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে ফিরে এসেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় গ্রামে ফিরে এসেছে ২২১টি পরিবারের ৫৩১ লোকজন।
এছাড়ও সশস্ত্র সংগঠন কেএনএফের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া বেশ কয়েকজন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে আত্মসমর্পণ করেছেন। তবে পরিবহন সংকট এবং বিভিন্ন সময়ে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতার কারণে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে।
এ প্রেক্ষাপটে ২৪ পদাতিক ডিভিশন এবং ৬৯ পদাতিক ব্রিগেড তথা বান্দরবান রিজিয়ন এর সরাসরি তৎপরতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের আস্থা, সম্প্রীতি ও টেকসই আর্থসামাজিক উন্নয়নে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে পাতা পাড়া, কাইতন পাড়া ও বাকলাই পাড়াসহ বেশ কিছু পাড়ার স্থানীয় বম, ম্রো ও ত্রিপুরাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কেএনএফ এর কারণে অনেক নির্যাতনের শিকার হয়েছে গ্রামবাসীর লোকজন। সুন্দর ভাবে বসবাস করতে পারি কেএনএফ এর কারণে। পাড়ার ছেলে মেয়েরা লেখাপড়া করতে ভয়ে বাসা থেকে বের হতো না। ভয়ে অনেক পরিবার উপজেলা, জেলা শহরে বসবাস করছে পরিবার পরিজন নিয়ে।
ছেলে-মেয়েরদেরকে কেএনএফে যোগদান করার জন্য পরিবারের প্রতি চাপসৃষ্টি করেছে। কিন্তু তাদের কথা মতে রাজি না হলে শুরু হতো নির্যাতন।
পাড়াবাসী আরও বলেন, গ্রামে গ্রামে এসে তাদের কথা মতে চলাফেরা না করলে গরু, ছাগল, মুরগিসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যেতো। আমাদের পরিবারের উপর কেএনএফ সদস্যরা অনেক নির্যাতন চালিয়েছে। বর্তমানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং ক্যাম্প স্থাপনের কারণে তাদের ছেলে-মেয়েরদের লেখাপড়ার পাশা-পাশি শান্তি বসবাস করছে, এমনটাই জানালেন পাহাড়ি পরিবারের ভুক্তভোগীরা।
অপরদিকে বম স্যোশাল কাউন্সিলের সংগঠনের সভাপতি লালজার লম বম বলেন, পাহাড়ে অস্থিরতায় দুর্গম এলাকার অনেকগুলো পাড়া গ্রাম একসময় জনশূন্য হয়ে পড়ে ছিল। সন্ত্রাসী তৎপরতায় আতঙ্কিত হয়ে লোকজন গ্রাম ছেড়ে পাশে রাষ্ট্র মিজোরামে পালিয়ে গিয়েছেছিল। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় তারা পুনরায় গ্রামে ফিরে আসছে। তবে আর কোনো বম, বা অন্য সম্প্রদায়ের লোকজন যেন ভয়ে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রে না যাওয়ার আহ্বান জানান।
বান্দরবান রিজিয়ানের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের আইন কানুন যারা মেনে চলবে না এবং বাংলাদেশের জন্য যারা হুমকি স্বরূপ তাদেরকে ধরতেই হবে। তবে পাড়াবাসী যারা রয়েছে তারা স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করেন। নিরাপত্তা বাহিনী আপনাদের পাশে রয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি, সম্প্রীতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সর্বদা সাধারণ জনগণের পাশে থেকে এই ধরনের মানবিক সহায়তা ও প্রত্যাবর্তন কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
সেনা এই কর্মকর্তা আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়, একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সেই সমন্বিত লক্ষ্য সামনে রেখে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি শান্তি, সম্প্রীতি এবং উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
প্রসঙ্গত, সেনাবাহিনী জানায়, ২০২০ সালে কুকি-চিন সন্ত্রাসী তৎপরতার সময় ভারতে মিজোরামে আশ্রয় নেওয়ার পর দেশে ফিরে আসা ছয়টি বমপাড়া, একটি ত্রিপুরাপাড়া ও পাঁচটি ম্রোপাড়াসহ মোট ১২টি গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ও পরিবহন সংকট নিরসনে এ উদ্যোগ দুইটি চাঁদের গাড়ি দেওয়া হয়েছে।
আরটিভি/এসএস



