
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রধান জীবিকা ও ঐতিহ্যবাহী পেশা জুম চাষ। বান্দরবানের সবুজ পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে এখন সোনালি রঙের পাকা জুমধান। চারদিকে ছড়াচ্ছে জুমধানের মৌ মৌ গন্ধ। পাহাড়ে চলছে জুমধান কাটার ধুম। তবে যেসব পাহাড়ে একসময় জুম চাষ হতো, এখন সেসব পাহাড়ের বেশির ভাগেই চাষ হচ্ছে মাল্টা, ড্রাগন, কপি, আনারস, কমলাসহ বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ফল। ফলে জুমধানের পরিবর্তে দীর্ঘস্থায়ী ও লাভজনক ফসল হিসেবে মিশ্র ফল চাষের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন চাষিরা। এতে পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতেও পরিবর্তন আসছে।
তবে আদি পদ্ধতিতে জুম চাষের কারণে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। জুম চাষের জন্য পাহাড়ের ঝাড়-জঙ্গল পুড়িয়ে ফেলার কারণে সরকারি রিজার্ভ ফরেস্টসহ অনেক সবুজ পাহাড় বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ছে। ফলে প্রতিবছর পাহাড়ে জুমের আবাদ কমে আসছে।
মৃত্তিকা সম্পদবিষয়ক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের মতে, জুম চাষের স্থান পরিবর্তন এবং জঙ্গল পোড়ানোর কারণে মাটির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। একই সঙ্গে বনাঞ্চল উজাড় হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাহাড়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। টেকসই বিকল্প কৃষি পদ্ধতি, মিশ্র ফল চাষ এবং জুমের পরিবর্তে আম, কাঁঠাল, আনারস, পেঁপে, লিচু ও কফি চাষের মাধ্যমে পাহাড়ের মাটির ক্ষয় রোধ করা সম্ভব। একই জমিতে ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের পাশাপাশি বিভিন্ন ফসল চাষ করা হলে মাটির উর্বরতা ধরে রাখা সম্ভব বলেও জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
স্থানীয় জুম চাষিরা জানান, জুম চাষে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু সেই তুলনায় ধানের ফলন পাওয়া যায় না। এ কারণে জুম চাষের পরিবর্তে বিকল্প চাষাবাদের পরিকল্পনা করছেন তারা। পাহাড়ে জলবায়ু পরিবর্তন, মাটির উর্বরতা হ্রাস এবং জনসংখ্যার চাপের কারণে ঐতিহ্যবাহী জুম চাষের ফলন দিন দিন কমে যাচ্ছে।
চাষিরা আরও জানান, পাহাড়ের ঢাল কেটে ধাপ তৈরি করে চাষ করলে মাটির ক্ষয় কমে এবং ফলন ভালো হয়। এ ছাড়া উচ্চফলনশীল ও জলবায়ু সহনশীল ফসলের বীজ ব্যবহার করা যায়। জুমের পরিবর্তে মিশ্র ফলের বাগান করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন তারা। এতে পার্বত্য অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতেও পরিবর্তন আসছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, জুম চাষে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় চাষিরা বিকল্প ও লাভজনক চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছেন। জুম চাষে অতিরিক্ত পরিশ্রমের পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিত লাভ না আসায় দীর্ঘদিনের পেশা পরিবর্তন করে মিশ্র ফলের আবাদে আগ্রহী হয়ে উঠছেন চাষিরা এবং এতে তারা লাভবানও হচ্ছেন।
জনপ্রতিনিধিরা বলেন, একই স্থানে বারবার জুম ধানের চাষ করা যায় না। পাহাড়ে অতিরিক্ত জায়গাও নেই। একই স্থানে পুনরায় জুম চাষ করতে হলে প্রায় তিন বছর অপেক্ষা করতে হয়। তাই জুমের পরিবর্তে চাষিরা মিশ্র ফলের বাগানে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
স্থানীয় সিনিয়র সাংবাদিক মমতাজ আহম্মদ বলেন, পাহাড়ের পরিবেশের ক্ষতির অন্যতম কারণ জুম চাষ। এক একর জায়গায় জুম চাষের জন্য যে পরিমাণ গাছ পোড়ানো হয়, সেই পরিমাণ জুমধান উৎপাদন হয় না। তবে সম্প্রদায়ভিত্তিকভাবে তাদের পুনর্বাসন করা হলে রিজার্ভ এলাকা আবার গভীর অরণ্যে পরিণত হতে পারে।
মৃত্তিকা সম্পদ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মাহাবুবুল ইসলাম বলেন, আদিকাল থেকেই পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়িরা জুম চাষ করে আসছেন। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ছাড়া জুম উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই। আধুনিক প্রযুক্তিতে জুম চাষাবাদ করতে হবে। এতে ভূমির ক্ষতি কম হবে এবং জৈব পদার্থ যোগ হবে। এভাবে জুম চাষ করলে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ক্ষতি কমানো সম্ভব।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক আবু নাঈম মো. সাইফুদ্দিন বলেন, পাহাড়ে আগে থেকেই তাদের ঐতিহ্যগত জুম চাষ রয়েছে। তবে জুমের চেয়ে সবজি চাষে লাভ বেশি। বাজারের চাহিদা, দ্রুত ফলন এবং একই জমিতে একাধিকবার ফসল ফলানোর সুবিধা রয়েছে। এসব কারণে চাষিদের মধ্যে জুমের পরিবর্তে মিশ্র ফল চাষের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
তিনি জানান, চলতি অর্থবছরে ৮ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমিতে জুমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৩৮৭ দশমিক ৯৩ মেট্রিক টন। গত অর্থবছরের তুলনায় জুমের আবাদ কিছুটা কমে আসছে এবং মিশ্র ফলের আবাদ বাড়ছে।
আরটিভি/এমএইচজে


