ঢাকা সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

ঋণের টাকায় রাশিয়া গিয়ে যুদ্ধবন্দি গাইবান্ধার রিমেল

​সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৭:২৫ পিএম
রিমেল মিয়া। ছবি: সংগৃহীত

অভাবের সংসারে হাল ধরতে আর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের শেষ বয়সের একমাত্র আশ্রয় হতে চেয়েছিলেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তরুণ রিমেল মিয়া। কিন্তু ভাগ্যবিড়ম্বনা এবং দালালের অভিনব প্রতারণার জালে জড়িয়ে আজ তার সেই সুন্দর স্বপ্নগুলো নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। দালালের ফাঁদে পা দিয়ে তিনি এখন ইউক্রেনের একটি ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। দীর্ঘ প্রায় এক বছর ধরে ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে পরিবার যখন তাকে মৃত বলেই ধরে নিয়েছিল, ঠিক তখন ইউক্রেনের একটি ডিটেনশন সেন্টার থেকে জুমের মাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তার জীবিত থাকার আকস্মিক খবর প্রকাশ্যে আসে। এই ঘটনায় পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে মিশ্র অনুভূতির জন্ম দিয়েছে।

​গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ছাপড়হাটী ইউনিয়নের উত্তর মরুয়াদহ গ্রামের হতদরিদ্র সৈয়দ আলী ও রেখা বেগম দম্পতির চার ছেলের মধ্যে রিমেল দ্বিতীয়। তাদের পরিবারে অভাব-অনটন যেন চিরদিনের নিত্যসঙ্গী। চার ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই এরশাদ আলী ঢাকায় একটি গার্মেন্টসে চাকরি করেন, তৃতীয় ভাই রুবেল মিয়া সৌদি আরবে কর্মরত এবং ছোট ভাই সোহেল মিয়া স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।

পরিবারের চরম আর্থিক সংকট এবং সংসারের জোড়াতালি দেওয়া অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার তীব্র বাসনা থেকেই রিমেল বিদেশ যাওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন।

তিনি স্থানীয় শোভাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০২২ সালে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে এসএসসি পাস করেন। এরপর ২০২৪ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দুটি বিষয়ে পরীক্ষা দেওয়ার পর বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেন এবং আর পরীক্ষা সম্পন্ন করতে পারেননি। পরিবারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন বুকে নিয়ে আত্মীয়স্বজন ও বিভিন্ন এনজিও থেকে প্রায় ছয় লাখ টাকা চড়া সুদে ধারদেনা করেন। এরপর ২০২৫ সালের মার্চ মাসে নির্মাণশ্রমিকের আকর্ষণীয় কাজের ভিসায় দেশ ছেড়ে রাশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি জমান রিমেল।

​রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর শুরুর দিকে রিমেলের জীবন মোটামুটি স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। তিনি সেখানে প্রথমে একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে মাসিক ৭০০ ডলার বেতনের একটি কাজ পেয়েছিলেন। নিজের উপার্জনে কিছুটা স্বস্তি ফিরছিল এবং নিয়মিত পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখতেন। কিন্তু ছয় মাস পেরোতেই তার জীবনে নেমে আসে বড় ধরনের বিপত্তি। হঠাৎ করেই তিনি সেই কাজ হারিয়ে ফেলেন। এরপর রাশিয়ায় আইনি জটিলতার মুখে পড়েন।

​বিদেশ বিভুঁইয়ে কাজ হারিয়ে এবং বৈধভাবে থাকার কোনো উপায় না পেয়ে চরম হতাশায় দিন কাটাতে থাকেন তিনি। ঠিক এই সংকটময় মুহূর্তে এক দালালের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তিনি এক লোভনীয় বেতনের সঙ্গে চাকরির প্রস্তাব দেন। তাকে জানানো হয়, অত্যন্ত ভালো বেতনের একটি চাকরি রয়েছে, যা তার সব আর্থিক সমস্যার সমাধান করে দেবে। সরল মনে রিমেল সেই ফাঁদে পা দেন এবং রুশ ভাষায় লিখিত একটি চুক্তিপত্রে সই করেন। আর এই একটিমাত্র ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই তার জীবন থেকে হারিয়ে যায় সব আলো।

আরও পড়ুন

​চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করার পরই রিমেলের জীবন চলে যায় এক অন্ধকার অধ্যায়ে। তাকে কোনো নির্মাণকাজে না পাঠিয়ে সরাসরি পাঠানো হয় রুশ সেনাবাহিনীর কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। সম্পূর্ণ রুশ ভাষায় লেখা চুক্তিপত্রটি তিনি না বুঝেই স্বাক্ষর করেছিলেন, যেখানে উচ্চ বেতন এবং পরবর্তীতে রাশিয়ার নাগরিকত্ব দেওয়ার লোভ দেখানো হয়েছিল।

​কিন্তু মাত্র তিনদিনের সংক্ষিপ্ত ও দায়সারা গোছের প্রশিক্ষণ শেষেই তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় সরাসরি ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াল সম্মুখসারিতে। গোলাগুলি আর বোমার বিকট শব্দে মুখরিত যুদ্ধক্ষেত্রে তাকে একটি বাংকারে দায়িত্ব পালন করতে হয়। একটানা প্রায় এক মাস জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংকারে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনিসহ অনেকেই ইউক্রেনীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এর ফলে তিনি সরাসরি যুদ্ধবন্দির খাতায় নাম লেখান।

​আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটস এবং ইউক্রেনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ট্রুথ হাউন্ডসের সাম্প্রতিক তথ্য ও গবেষণায় উঠে এসেছে এক লোমহর্ষক চিত্র। কাজের প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া অনেক বাংলাদেশি যুবককে কৌশলে ও প্রতারণার মাধ্যমে রুশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত করা হয়েছে। তাদের অনেকেই সম্মুখযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন, অনেকে গুরুতর আহত হয়েছেন এবং অনেকে রিমেলের মতো যুদ্ধবন্দি হিসেবে বিভিন্ন সেন্টারে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

সরেজমিনে রিমেলের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা মিলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের। একটি ছোট ও জীর্ণশীর্ণ ঝুপড়ি ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছে তার পরিবার। রিমেলের বাবা সৈয়দ আলী স্থানীয় শোভাগঞ্জ বাজারে একটি ক্ষুদ্র পানের দোকান চালিয়ে কোনোমতে টেনেটুনে সংসার চালান।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবা সৈয়দ আলী বলেন, ধারদেনা করে ছেলেকে অনেক আশা নিয়ে বিদেশ পাঠিয়েছিলাম। রাশিয়া যাওয়ার পর প্রথম পাঁচ-ছয় মাস সে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। কিন্তু তারপর দীর্ঘ প্রায় ১১ মাস তার কোনো খোঁজখবরই পেতাম না। সে বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে, আমাদের জানা ছিল না। সম্প্রতি পত্রিকায় তার ছবি দেখে জানতে পারি আমার ছেলে এখনো বেঁচে আছে। আমরা সরকারের কাছে হাতজোড় করে অনুরোধ করছি, আমার সন্তানকে দ্রুত নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।

​মা রেখা বেগম বলেন, ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে প্রতিদিন জায়নামাজে বসে আল্লাহর কাছে কেঁদেছি। মন বলত হয়ত আমার কলিজার টুকরা আর বেঁচে নেই। এখন জানতে পেরেছি সে জীবিত আছে। আমি আর কিছু চাই না, শুধু আমার ছেলেকে একবার বুকে জড়িয়ে ধরতে চাই। সরকার যেন আমার এই অবুঝ ছেলেকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করে।

বর্তমানে ইউক্রেনের একটি ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি জীবন কাটানো রিমেলসহ অন্য বাংলাদেশিরা বাংলাদেশ সরকারের কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে নিরাপদে দেশে ফিরতে চান। একই সঙ্গে তারা জোরালো দাবি জানিয়েছেন যে, রাশিয়ায় চুক্তিভিত্তিক কাজের সময় তাদের নামে জমা থাকা বকেয়া বেতন এবং অন্যান্য পাওনা অর্থ যেন যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রী বদ্ধপরিকর: এমপি ফজলুল হক মিলন
শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রী বদ্ধপরিকর বলে মন্তব্য করেছেন গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলন।
শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রী বদ্ধপরিকর: এমপি ফজলুল হক মিলন
ভাঙ্গা গোলচত্বরে দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
ফরিদপুরের ভাঙ্গায় দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে স্বাধীন (২০) ও এজাজুল (২০) নামে দুই যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন আরও দুজন। 
ভাঙ্গা গোলচত্বরে দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ২
অপহরণের ৯ দিন পার হলেও উদ্ধার হয়নি কলেজছাত্র রিদোয়ান
অপহরণের দীর্ঘ ৯ দিন পেরিয়ে গেলেও বিবিএ পড়ুয়া কলেজছাত্র রিদোয়ান আনসারীকে (২৫) আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উদ্ধার করতে না পারায় মানববন্ধন করেছেন মানিকগঞ্জের সাধারণ মানুষ।
অপহরণের ৯ দিন পার হলেও উদ্ধার হয়নি কলেজছাত্র রিদোয়ান
সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নানা ষড়যন্ত্র চলছে: রিজভী
সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে দেশে নানা ষড়যন্ত্র ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। 
সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নানা ষড়যন্ত্র চলছে: রিজভী
গাইবান্ধায় দ্রুতগামী ট্রাকের ধাক্কায় পান শ্রমিকের মৃত্যু
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অটোভ্যানে মালবোঝাই ট্রাকের ধাক্কায় এনামুল হক (৪০) নামে এক পান শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় অটোভ্যানচালকসহ দুজন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে আনোয়ার হোসেন (৪২) নামে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সোমবার (২ নভেম্বর) সকালে উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের জামালহাটের কামরাঙ্গার তল এলাকায় রংপুর-সুন্দরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত এনামুল হক রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ইমাদপুর ইউনিয়নের ইমাদপুর (হাজীপাড়া) গ্রামের মৃত সোলেমানের ছেলে। আহত আনোয়ার হোসেন একই এলাকার মো. মোন্তাজ আলীর ছেলে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সকালে তিন শ্রমিক স্থানীয় একটি পানের বরজে কাজ করতে যাচ্ছিলেন। এ সময় মহাসড়কের পাশে তাদের অটোভ্যানটি দাঁড়িয়ে থাকলে পেছন থেকে আসা একটি মালবোঝাই ট্রাক ধাক্কা দেয়। এতে ছিটকে পড়ে ট্রাকের নিচে পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই এনামুল হক মারা যান। আহত হন অটোভ্যানচালকসহ আরও দুজন। পরে স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। তাদের মধ্যে আনোয়ার হোসেনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। অটোভ্যানচালক প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বামনডাঙ্গা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, দাঁড়িয়ে থাকা অটোভ্যানে ট্রাকের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই একজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন। মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আরটিভি/এমএইচজে
গাইবান্ধায় দ্রুতগামী ট্রাকের ধাক্কায় পান শ্রমিকের মৃত্যু
আরও পড়ুন
জোর করে বাংলাদেশসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ রাশিয়ার
মেলানিয়া ট্রাম্পের উদ্যোগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধবিরতি, জানাল হোয়াইট হাউস
রাশিয়া থেকে ৪০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল কিনল যুক্তরাষ্ট্র
প্রেমের টানে রাশিয়ায় গিয়ে গুপ্তচর মামলায় ১৫ বছরের কারাদণ্ড