সেতুর অভাবে বিচ্ছিন্ন পদ্মার চরাঞ্চলের প্রায় এক লাখ মানুষ

আরটিভি নিউজ

সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬ , ০২:২০ পিএম


সেতুর অভাবে বিচ্ছিন্ন পদ্মার চরাঞ্চলের প্রায় এক লাখ মানুষ
কাঁচা রাস্তায় লোকজন গাড়ি ধাক্কা দিয়ে পার করছে : ছবি সংগৃহীত

স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা পদ্মা নদীর চরাঞ্চলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাসহ নানা অবকাঠামো গড়ে উঠলেও দুটি সেতুর অভাবে রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের প্রায় এক লাখ মানুষ এখনও মূল ভূখণ্ড থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন। ফলে নাগরিক সুবিধার অনেকটাই তাদের কাছে রয়ে গেছে অধরাই।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাগজোত ও সুখারঘাটে সেতু না থাকায় বছরের পর বছর দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে চরবাসীকে। বর্ষাকালে উত্তাল পদ্মা নদী পারাপারে তাদের একমাত্র ভরসা নৌকা। আর শুষ্ক মৌসুমে মাইলের পর মাইল বালুচর পাড়ি দিতে হয় ভ্যান, ট্রলি, মোটরসাইকেল কিংবা ঘোড়ার গাড়িতে। এতে শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন তারা।

উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের এই চরাঞ্চলের ভেতরে কিছু সড়ক নির্মিত হলেও মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সরাসরি কোনো সেতু না থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনও অত্যন্ত নাজুক। ফলে বিদ্যমান অবকাঠামোর পূর্ণ সুফল পাচ্ছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা।

আরও পড়ুন

সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়তে হয় জরুরি রোগীদের। মুমূর্ষু রোগীকে উপজেলা বা জেলা শহরের হাসপাতালে নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লেগে যায়। অনেক সময় পথেই রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটে। একই সঙ্গে কৃষকদের উৎপাদিত ধান, পাট, ভুট্টা, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে নিতে না পারায় ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হতে হচ্ছে।

উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ভাগজোত ঘাটে ৩৫০ মিটার এবং সুখারঘাটে ৯৬ মিটার দীর্ঘ দুটি সেতু নির্মাণের জন্য সম্প্রতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে কবে প্রকল্পটি অনুমোদন পাবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।

চরাঞ্চলের মানুষের অভিযোগ, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের প্রায় সব প্রার্থীই ভাগজোত ও সুখারঘাটে সেতু নির্মাণ, উন্নত সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে সেই প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়ন হয় না। সরকার বদলায়, জনপ্রতিনিধি বদলায়; কিন্তু বদলায় না চরবাসীর ভাগ্য।

স্থানীয় বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে চরাঞ্চলের শিশুরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শিক্ষকরা এখানে দীর্ঘদিন চাকরি করতে চান না। কেউ এলেও অল্প সময়ের মধ্যেই বদলি নিয়ে চলে যান। এতে শিক্ষার মান দিন দিন খারাপ হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, এখানে কোনো পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে। রোগী নিয়ে সেখানে পৌঁছাতে অনেক সময় লেগে যায়। কৃষকদেরও নৌকা কিংবা ঘোড়ার গাড়িতে করে ফসল বাজারে নিতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায় এবং লাভের বড় অংশই খরচ হয়ে যায়।

স্থানীয় গৃহবধূ শেফালী খাতুন বলেন, পরিবারের বয়স্ক বা অসুস্থ সদস্যকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিতে হলে খুব কষ্ট হয়। বালুচর পেরিয়ে ভ্যান বা ঘোড়ার গাড়িতে রোগী বহন করতে হয়। অনেক সময় রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

উপজেলা প্রকৌশলী আসাদ উল্লাহ বাচ্চু বলেন, ভাগজোত ও সুখারঘাটে সেতু নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। বাজেট অনুমোদন পেলেই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু করা হবে।

রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজ মণ্ডল বলেন, দুটি সেতু নির্মিত হলে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থাই উন্নত হবে না, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তাই দ্রুত প্রকল্প অনুমোদনের দাবি জানাচ্ছি।

দ্রুত প্রকল্প অনুমোদনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি উল্লেখ করেু কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, ভাগজোত ও সুখারঘাটে সেতু নির্মাণ এবং নদীভাঙন রোধ আমার উপজেলার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেছি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়েও ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে। 

চরের মানুষের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি এবার বাস্তবে রূপ নেবে। ভাগজোত ও সুখারঘাটে দুটি সেতু নির্মিত হলে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হবে রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের প্রায় এক লাখ মানুষ। সেই সঙ্গে বহু বছরের বিচ্ছিন্নতা, দুর্ভোগ ও উন্নয়নবঞ্চনার অবসান ঘটবে—এমন আশাই চরবাসীর।

আরটিভি/এমএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission