
মাসের শেষ দিকে বাজারের ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের হিসাবটা খুব জটিল নয়। চাল, ডাল, মাছ, সবজি, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, সব মিলিয়ে মাসের আয় থেকে কতটা বাঁচবে, সেই হিসাবই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই সময়ে একজন সরকারি কর্মচারীও হয়তো নতুন বেতন কাঠামোয় তার আয় কতটা বাড়বে, তা নিয়ে হিসাব করছেন। দুই মানুষের হিসাবের জায়গা আলাদা হলেও প্রশ্নটি একই, আয় বাড়ছে কি না, আর বাড়লে সেই বাড়তি আয়ে জীবনটা কতটা স্বস্তির হবে? জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদনের পর তাই শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন কত বাড়ল, সেই প্রশ্নে থেমে থাকলে পুরো বিষয়টি দেখা হবে না। বরং আরও বড় প্রশ্ন হলো, এই বেতন বৃদ্ধির প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবন, বাজার ও রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে কীভাবে পড়বে?
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ এ বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বেড়েছে ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ। নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে এবং মূল বেতন তিন ধাপে ১ জুলাই ২০২৭ এর মধ্যে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিভিন্ন ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।
নতুন কাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বেতন বৈষম্য কিছুটা কমানোর চেষ্টা। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মূল বেতনের অনুপাত আগের ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা এবং সব গ্রেডের কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতার আওতা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তও রয়েছে। ফলে নতুন বেতন কাঠামোকে শুধু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধির কাঠামো হিসেবে দেখলে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার চাপও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
তবে এই হিসাবের অন্য পাশে আছে দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট ২০২৬ এ দেশে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ০২ শতাংশ, আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। একই সময়ে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। অর্থাৎ গড় মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে সামান্য কম ছিল। এই ব্যবধানটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কাগজে কারও আয় কিছুটা বাড়লেও যদি একই সময়ে পণ্য ও সেবার দাম আরও দ্রুত বাড়ে, তাহলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে না, অনেক ক্ষেত্রে কমেও যেতে পারে। তাই সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে আলোচনা করতে হলে শুধু বেতন বৃদ্ধির শতাংশ নয়, বাস্তবে সেই অর্থ দিয়ে কতটা পণ্য ও সেবা কেনা যাচ্ছে, সেটিও দেখতে হবে।
এখানেই সাধারণ মানুষের প্রশ্নটি সামনে আসে। সরকারি চাকরিতে বেতন নির্ধারণের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আছে। বেতন কমিশন হয়, পর্যালোচনা হয়, গ্রেড নির্ধারণ করা হয়, ভাতা নির্ধারণ করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কাঠামো কার্যকর হয়। কিন্তু দেশের বিপুলসংখ্যক বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীর ক্ষেত্রে এমন নিশ্চয়তা নেই। পোশাকশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, দোকানের কর্মচারী, গৃহকর্মী, পরিবহনশ্রমিক, দিনমজুর কিংবা ছোট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষের আয় অনেক সময় বাজারের ওপর নির্ভরশীল। তাদের জীবনেও একই মূল্যস্ফীতি, একই বাড়িভাড়া, একই চিকিৎসা ব্যয় এবং সন্তানের শিক্ষার একই চাপ। কিন্তু তাদের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সম্পর্কটি রাষ্ট্রীয় বেতন কাঠামোর মতো সরাসরি নিয়ন্ত্রিত নয়। ফলে নতুন বেতন স্কেলের সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রশ্নটি সম্ভবত এখানেই, রাষ্ট্র কীভাবে অর্থনীতির অন্যান্য অংশের মানুষের প্রকৃত আয় ও জীবনযাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে?
একজন আইন শিক্ষার্থী হিসেবে বিষয়টি দেখলে আরও একটি প্রশ্ন সামনে আসে, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে ন্যায্যতার ধারণাটি কীভাবে কাজ করছে? বাংলাদেশের সংবিধানের ২০ অনুচ্ছেদে কাজকে অধিকার, কর্তব্য ও সম্মানের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং ২৮ অনুচ্ছেদে বৈষম্যবিরোধী নীতির নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তবে এসব বিধানের অর্থ এই নয় যে সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারীদের বেতন অবশ্যই সমান হতে হবে। সরকারি চাকরির দায়িত্ব, নিয়োগব্যবস্থা, চাকরির নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় সেবা প্রদানের ভূমিকা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন নির্ধারণের যৌক্তিকতা থাকতে পারে। কিন্তু বৃহত্তর সাংবিধানিক ও সামাজিক ন্যায্যতার প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে সমতা ও বৈষম্যহীনতার বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে এবং অর্থনীতির বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের ওপর সুবিধা ও ব্যয়ের ভার কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে।
এখানে সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কোনো সরল অভিযোগ তোলাও ঠিক হবে না। একজন সরকারি কর্মচারীও বাজারের একই দামে খাবার কেনেন, বাড়িভাড়া দেন, সন্তানের শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় বহন করেন। দীর্ঘদিন একই বেতন কাঠামোতে থাকার পর জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন পুনর্নির্ধারণের দাবি স্বাভাবিক। বরং নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে রাষ্ট্রের কাছ থেকে আরেকটি প্রত্যাশা তৈরি হয়, বেতন ও আর্থিক সুবিধা বাড়ার পাশাপাশি সরকারি সেবার মানও আরও উন্নত হবে। ভূমি অফিসে একটি সেবা পেতে মানুষকে অযথা ঘুরতে হবে না, সরকারি হাসপাতালে সেবার মান বাড়বে, নাগরিক সনদ বা প্রশাসনিক সেবা পেতে হয়রানি কমবে, কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সরকারি সহায়তা পেতে আরও সহজ পথ পাবেন, এমন পরিবর্তনই মানুষের কাছে বেতন বৃদ্ধির সামাজিক মূল্যকে অর্থবহ করতে পারে। এটি কোনো সরাসরি আইনগত বিনিময় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের সঙ্গে জবাবদিহি ও সুশাসনের একটি স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
কারণ শেষ পর্যন্ত সরকারি কর্মচারীদের বেতনও আসে রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা থেকে। রাষ্ট্রের রাজস্ব আসে মূলত নাগরিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সংগৃহীত করসহ বিভিন্ন উৎস থেকে। ২০২৬ থেকে ২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা খাতে ৮৯ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। বাজেট প্রণয়নের সময় নতুন বেতন কাঠামোর জন্য আলাদা অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হয়নি বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন। পরে সরকার নতুন কাঠামো অনুমোদন করে এবং ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবস্থাপনা করা হবে, রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে, নাকি বাজেটের অন্য খাত পুনর্বিন্যাস করে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ ২৫ হাজারের বেশি পেনশনভোগী ও অন্যান্য সুবিধাভোগী যুক্ত হবেন। অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণও ছোট নয়। ফলে এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এর সঙ্গে রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, মূল্যস্ফীতি এবং ভবিষ্যৎ বাজেটের ওপরও প্রভাবের প্রশ্ন জড়িত। সরকার নিজেও এ কারণে একযোগে পুরো কাঠামো বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পথ বেছে নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে সরকারের বিবেচনার মধ্যে ছিল আর্থিক সক্ষমতা, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয়।
অবশ্য সরকারি বেতন বাড়লেই বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, এমন সরল সমীকরণও ঠিক নয়। মূল্যস্ফীতির পেছনে উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ, বিনিময় হার, মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতিসহ নানা বিষয় কাজ করে। তবে বড় অঙ্কের সরকারি ব্যয় অর্থনীতিতে কীভাবে প্রবাহিত হবে এবং তার বিপরীতে উৎপাদন ও সরবরাহ কতটা বাড়ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। শুধু মানুষের হাতে টাকা বাড়ালেই হবে না, সেই টাকার বিনিময়ে বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য ও সেবা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
আমার কাছে তাই নতুন বেতন স্কেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ‘সরকারি কর্মচারীর বেতন কত বাড়ল’ নয়, বরং ‘এই বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কতটা বাড়ল’, সেটি। একজন সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়া তার ব্যক্তিগত জীবনে স্বস্তি আনতে পারে। সেটি অর্থনীতিতেও চাহিদা তৈরি করতে পারে। কিন্তু একই সময়ে একজন বেসরকারি কর্মচারী যদি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আয় বাড়াতে না পারেন, একজন দিনমজুর যদি বাড়তি খাবারের খরচ সামলাতে না পারেন, একজন নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার যদি চিকিৎসা ব্যয়ে সঞ্চয় হারাতে থাকে, তাহলে সামগ্রিক অর্থনীতির স্বস্তির ছবি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি শুধু সরকারি কর্মচারীর বেতন কত বাড়ল, সেই সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। মানুষের প্রকৃত আয়, ক্রয়ক্ষমতা, সঞ্চয়, চিকিৎসা ও শিক্ষার সুযোগ, কর্মসংস্থান এবং রাষ্ট্রীয় সেবা পাওয়ার অভিজ্ঞতা, সব মিলিয়েই অর্থনীতির বাস্তব চিত্র তৈরি হয়। নতুন জাতীয় বেতন স্কেল সেই অর্থে সরকারের জন্য শুধু বেতন পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নয়, এটি রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জনসেবা এবং সামাজিক ন্যায্যতার ওপরও একটি পরীক্ষা। সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়বে, এটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু সেই সঙ্গে যদি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চাপও কমে, আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ব্যবধানও কমে এবং সরকারি সেবার মানও বাড়ে, তখনই নতুন বেতন স্কেলের সুফলকে বৃহত্তর অর্থে রাষ্ট্রের সাফল্য বলা যাবে। শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের প্রশ্ন খুব সহজ, সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়ল, কিন্তু আমার জীবনটা কি একটু সহজ হলো?
লেখা: সাবেক সভাপতি, গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি,
শিক্ষানবিশ আইনজীবি।
আরটিভি/ এসকেডি



