শিক্ষক সংকট ও কোচিং বাণিজ্যের জালে নড়াইল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

নড়াইল প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬ , ০৩:০৩ পিএম


শিক্ষক সংকট ও কোচিং বাণিজ্যের জালে নড়াইল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
নড়াইল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

নড়াইল শহরের নারী শিক্ষা প্রসারের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যাপীঠ নড়াইল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়টি দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এ জেলায় নারী শিক্ষার অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। প্রতি বছরই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় সুনামের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে দেশের স্বনামধন্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করছে। তবে ঐতিহ্য ও অর্জনের এ সাফল্যমণ্ডিত ভাবমূর্তির আড়ালে বর্তমানে প্রকট হয়ে উঠেছে নানা অবকাঠামোগত ও প্রশাসনিক সংকট।

বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে চরম শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ ভবনে ঝুঁকি নিয়ে পাঠদান এবং কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ন্ত্রিত প্রাইভেট ও কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে, অন্যদিকে পাঠদানের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহল।

অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে শিক্ষকদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রাইভেট ও কোচিংনির্ভরতা। অভিযোগ রয়েছে, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে পূর্ণ মনোযোগ না দিয়ে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব কোচিং সেন্টার বা প্রাইভেটে পড়ার জন্য পরোক্ষভাবে মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়।

কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্ধারিত প্রাইভেটে অংশ না নিলে পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত নম্বর না পাওয়া এবং শ্রেণিকক্ষে অবহেলার শিকার হওয়ার আশঙ্কায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেককে সেখানে ভর্তি হতে হচ্ছে। এ জন্য প্রতি মাসে শিক্ষার্থীপ্রতি এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুন

তবে এ বিষয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক জানান, পাঠ্যক্রমের পরিধি বড় হওয়া এবং শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় না পাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের প্রয়োজনেই অতিরিক্ত সহায়তার জন্য শিক্ষকদের কাছে আসে। বিষয়টিকে একতরফাভাবে ‘বাধ্য করা’ হিসেবে দেখা ঠিক নয় বলেও দাবি করেন তারা।

শিক্ষার পরিবেশের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সংকটও অত্যন্ত প্রকট। সরেজমিনে দেখা যায়, বহু পুরোনো একাডেমিক ভবনটি দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভবনের বিভিন্ন অংশের ছাদ ও দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে এবং ভেতর থেকে জংধরা রড বেরিয়ে এসেছে।

নিরাপত্তার স্বার্থে ভবনটির তৃতীয় তলা ইতোমধ্যে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে শ্রেণিকক্ষের তীব্র সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এতে প্রতিনিয়ত কাঠামোগত দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে ক্লাস করছে শিক্ষার্থীরা। অভিভাবকদের মাঝেও সন্তানদের নিরাপদে বিদ্যালয়ে পাঠানো ও ফিরিয়ে আনা নিয়ে উদ্বেগ বিরাজ করছে।

কোচিং বাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সনাতন রায়। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিয়ম ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গেই শ্রেণিকক্ষে পাঠদান পরিচালনা করেন। খাতায় নম্বর কম দেওয়া বা অন্য কোনো অনিয়মের অভিযোগ ভিত্তিহীন।

তবে অবকাঠামো ও শিক্ষকসংকটের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, আমাদের শ্রেণিকক্ষের সংকট প্রকট এবং তীব্র শিক্ষকস্বল্পতা রয়েছে। আমরা বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার মধ্যেই সর্বোচ্চ চেষ্টা করে শিক্ষার্থীদের পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছি। নতুন ভবন নির্মাণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সমস্যা নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।

বিদ্যালয়ের বিদ্যমান সংকট পর্যবেক্ষণ এবং সরেজমিনে পরিস্থিতি জানতে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেন নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম। পরিদর্শনের সময় তিনি শিক্ষকসংকট নিরসন এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন।

তবে বিদ্যালয় চত্বরে চলমান নতুন ভবনের নির্মাণকাজ পরিদর্শনকালে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। নির্মাণকাজে মানসম্মত রড, ইট ও সিমেন্ট ব্যবহার না করার অভিযোগ তুলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও তদারকি কর্মকর্তাদের সতর্ক করেন। সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম বলেন, একটি ঐতিহ্যবাহী নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণে কোনো ধরনের নিম্নমানের কাজ বরদাশত করা হবে না। নতুন ভবনের কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নড়াইলের সর্বস্তরের মানুষ ও অভিভাবকদের মতে, বিদ্যালয়টির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও সুনাম ধরে রাখতে হলে দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষকসংকট দূর করা, প্রাইভেট ও কোচিংকেন্দ্রিক অনিয়ম বন্ধে কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং সর্বোপরি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ অবকাঠামো নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। জেলা প্রশাসন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় দ্রুত বিষয়টি তদন্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

আরটিভি/টিআর

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission