
বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের আখাউড়া ও শায়েস্তাগঞ্জের বিভিন্ন দপ্তরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, জনবল ব্যবস্থাপনা, দায়িত্ব বণ্টন, কর্মচারীদের যোগদান এবং বেতন-ভাতা নিয়ে একের পর এক অভিযোগ উঠছে।
এর মধ্যে আখাউড়া দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উচ্চমান সহকারী মো. ইছরাইল মিয়ার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, কর্মচারীদের হয়রানি, নিয়মবহির্ভূতভাবে দায়িত্ব পাওয়া এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তার সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং বিভাগীয় তদন্তের দাবিও জানানো হয়েছে।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, মো. ইছরাইল মিয়ার মূল পদ টাইমকিপার। তিনি আগে এসএসএই/ওয়ে/শ্রীমঙ্গল দপ্তরে টাইমকিপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরে আখাউড়া দপ্তরে অফিস সহকারী (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর পুনরায় তাকে উচ্চমান সহকারী (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তবে একজন টাইমকিপারকে কীভাবে একের পর এক ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দিয়ে উচ্চমান সহকারীর দায়িত্ব দেওয়া হলো, এ দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরাদেশ, প্রশাসনিক অনুমোদন ও বিধিগত ভিত্তি কী, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগকারীরা বলেন, কমন পদ বিধিমালা, ২০১৯ অনুযায়ী টাইমকিপার থেকে উচ্চমান সহকারী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একই সঙ্গে তারা উল্লেখ করেন, উচ্চমান সহকারী পদে পদোন্নতি পাওয়ার যোগ্যদের একটি খসড়া তালিকা বাংলাদেশ রেলওয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রয়েছে। ওই তালিকায় বাংলাদেশ রেলওয়ের কোনো টাইমকিপারের নাম উল্লেখ নেই। বাংলাদেশ রেলওয়ের যেসব দপ্তরে উচ্চমান সহকারী (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাদের সবাই অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক।
অভিযোগকারীরা আরও উল্লেখ করেছেন, বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ অর্থাৎ ঢাকার নিয়ন্ত্রণাধীন তিনজন উচ্চমান সহকারী এবং ১০ জন অফিস সহকারী থাকা সত্ত্বেও কেন একজন টাইমকিপারকেই উচ্চমান সহকারীর দায়িত্ব দেওয়া হলো, এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের দাবি, এখানে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের সম্ভাবনা রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কর্মচারীদের বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজ নিয়ে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সার্ভিস বুক সংরক্ষণ, পে-ফিক্সেশন, উচ্চতর গ্রেড নির্ধারণ, বদলি, টিএ বিল, ছুটি, অবসর ও পারিবারিক পেনশনের ফাইল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নিয়মিত ঘুষ দাবি করা হতো।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৪ সালের ২৭ মার্চ এবং ১১ নভেম্বর নবনিয়োগপ্রাপ্ত ওয়েম্যানদের সার্ভিস বুক সংরক্ষণের জন্য ফাইল ক্রয়ের নামে জনপ্রতি ৫০০ টাকা এবং পে-ফিক্সেশনের জন্য জনপ্রতি ৩ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৪ সালে নিয়োগ পাওয়া ওয়েম্যানদের চাকরির ১০ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেডের বেতন নির্ধারণের জন্য জনপ্রতি ৫ হাজার টাকা দাবি করার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, অধিকাংশ কর্মচারী অর্থ দেওয়ার পর তাদের বেতন নির্ধারণ করা হলেও যারা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তাদের ফাইল দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখা হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, এসএসএই/ওয়ে/শায়েস্তাগঞ্জ এবং আখাউড়া সেকশনের কর্মচারীদের টিএ বিল থেকে মোট প্রাপ্য অর্থের ৫০ শতাংশ অগ্রিম নেওয়ার পর বিল পাঠানো হয়েছে।
চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের টিএ বিল পাসের ক্ষেত্রেও ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানালে বিভিন্ন অজুহাতে বিল ফেরত দেওয়া হতো।
অন্যদিকে, অনুপস্থিত কর্মচারীদের এলএপি ছুটি অনুমোদনের ক্ষেত্রেও প্রাপ্ত অর্থের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
হেমারম্যান মো. তাজুল ইসলাম তার লিখিত অভিযোগে দাবি করেছেন, এলএপি ছুটি অনুমোদনের জন্য প্রকল্প গেটম্যান মো. সোনা মিয়ার মাধ্যমে তার কাছে ৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করার পর তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
মো. তাজুল ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, খালাসী পদ থেকে পদোন্নতি পেয়ে হেমারম্যান হিসেবে যোগদানের প্রায় আড়াই বছর পার হলেও তার বেতন ফিক্সেশন এখনো সম্পন্ন হয়নি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক পার্সোনেল-৩ শাখার ২০২৩ সালের ১২ ডিসেম্বরের অফিস আদেশে তিনি ২০তম গ্রেডের খালাসী পদ থেকে ১৮তম গ্রেডের হেমারম্যান পদে পদোন্নতি পান।
পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আদেশ অনুযায়ী তিনি আখাউড়া দপ্তরে হেমারম্যান হিসেবে যোগদান করেন।
কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও ফিক্সেশন শিট প্রস্তুত বা হালনাগাদ না হওয়ায় তিনি এখনো ১৮তম গ্রেডের পরিবর্তে আগের ২০তম গ্রেড অনুযায়ী বেতন পাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
তার দাবি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র একাধিকবার জমা দেওয়ার পরও টাইমকিপার (ভারপ্রাপ্ত উচ্চমান সহকারী) মো. ইছরাইল মিয়ার অসহযোগিতার কারণে ফিক্সেশন প্রক্রিয়া ঝুলে আছে।
এ কারণে তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন। একই সঙ্গে চিত্তবিনোদন ছুটিও নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক বছর পর ভোগ করতে হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
এদিকে, বাদল মিয়া নামে একজন ভারপ্রাপ্ত কার্পেন্টার হেলপারকে যোগদানের বিষয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই কর্মচারী ছয় মাস ২০ দিন অনুপস্থিত থাকার পর রেলওয়ে ডাক্তারের সনদপত্র ছাড়াই তার যোগদানের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ৭ জুন ২০২৬ তারিখে বাদল মিয়া অফিসের বাইরে মো. ইছরাইল মিয়ার সঙ্গে দেখা করে যান এবং ৮ জুন ২০২৬ তারিখে ওই কর্মচারীর যোগদান হয়ে যায়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ওয়েম্যান মো. মাহবুব আহমেদের কাছ থেকে চাকরি ছাড়ার সময় ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানালেও নানা ধরনের হয়রানির পর ওই অর্থ দিয়ে অব্যাহতি নিতে বাধ্য হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত এবং মৃত কর্মচারীদের পারিবারিক পেনশনের কাগজপত্র প্রস্তুত ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ দাবি করার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হতো।
শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়, মো. ইছরাইল মিয়ার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগও আনা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, চাকরির আয়-ব্যয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে তিনি আখাউড়া এলাকায় জমি কিনেছেন, বাড়ি নির্মাণ বা পাকা করেছেন এবং স্থানীয় বাজারে জমি কিনে দোকানঘর নির্মাণ করেছেন।
অভিযোগকারীরা তার সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ঐক্য পরিষদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া শাখার পক্ষ থেকে রেলপথ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক, পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক, প্রধান প্রকৌশলী, প্রধান সংস্থাপন কর্মকর্তা, দুর্নীতি দমন কমিশন, জেলা প্রশাসন, বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপকসহ মোট ১৭টি দপ্তরে অভিযোগের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগে মো. ইছরাইল মিয়ার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত, সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, একই দপ্তরে টাইমকিপার মো. ইছরাইল মিয়াকে ‘উচ্চমান সহকারী (ভারপ্রাপ্ত)’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও পৃথক লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
আখাউড়া দপ্তরের ওয়েম্যান মো. জুনায়েদ মিয়া ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া অভিযোগে বলেন, অফিস সহকারী হিসেবে দক্ষ জনবল থাকা সত্ত্বেও তাদের পরিবর্তে একজন টাইমকিপারকে উচ্চমান সহকারীর দায়িত্ব দেওয়ায় দাপ্তরিক কাজ, ফাইল এবং কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সংক্রান্ত কার্যক্রমে বিলম্ব ও হয়রানির সৃষ্টি হচ্ছে।
এ ছাড়া ২০২০ সালের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট যথাযথভাবে অনুমোদিত হওয়ার পাশাপাশি ইনক্রিমেন্ট স্লিপ ও সার্ভিস বইয়ে এন্ট্রি থাকার পরও তা আইবাসে হালনাগাদ না করার অভিযোগও করা হয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর আরও দাবি, শায়েস্তাগঞ্জ ও আখাউড়া এসএসএই/ওয়ে দপ্তরে টাইমকিপারের সংকট রয়েছে। ওয়েম্যান দিয়ে মৌখিক নির্দেশে কাজ করানো হচ্ছে। অথচ টাইমকিপারকে অন্য দায়িত্বে রাখায় জনবল ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে এবং কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ পড়ছে।
তবে ভারপ্রাপ্ত উচ্চমান সহকারীর দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী, আখাউড়া মো. আবু হানিফ পাশা জানান, মো. ইছরাইল মিয়াকে কীভাবে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানেন না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ সংক্রান্ত দপ্তরাদেশ বিভাগীয় প্রকৌশলী-২, ঢাকা, আহসান হাবিব জারি করেছেন।
বিভাগীয় প্রকৌশলী-২, ঢাকা, আহসান হাবিব বলেন, টাইমকিপার ব্লক পদ না। আমরা তাকে পদোন্নতি দিইনি। আমরা তাকে যেটা দিয়েছি, নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে উচ্চমান সহকারীর দায়িত্ব পালন করবে। এর জন্য কোনো প্রকার আর্থিক সহযোগিতা সে পাবে না।
অন্যদিকে, মো. ইছরাইল মিয়ার বিরুদ্ধে আনা ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অন্যান্য অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।
আরটিভি/টিআর


