
নেত্রকোণার মোহনগঞ্জে রফিকুল ইসলাম হিরণ নামে এক হাতুরে চিকিৎসকের মাধ্যমে দাঁতের মাড়ির পাশে বেড়ে ওঠা মাংস কাটার পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মো. লিয়ন মিয়া (১৪) নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে।
সোমবার (১০ আগস্ট) সন্ধ্যা ছয়টার দিকে উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্বজন ও ক্ষুব্ধ লোকজন ওই হাতুরে চিকিৎসকের চেম্বারে ভাঙচুর চালান।
পরিবারের অভিযোগ, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে চেম্বার করা এক হাতুড়ে দন্ত চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নেওয়ার পর থেকেই লিয়নের অবস্থার অবনতি হতে থাকে।
তবে ওই চিকিৎসক দাবি করেছেন, চিকিৎসার কারণে নয়, আগে থেকেই শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় কিশোরটির মৃত্যু হয়েছে।
নিহত লিয়ন মিয়া মোহনগঞ্জ পৌরশহরের টেংগাপাড়া এলাকার খোকন মিয়ার ছেলে। সে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে লিয়নের দাঁতের মাড়ির পাশে মাংস বেড়ে যাওয়ায় তাকে চিকিৎসার জন্য মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে থাকা রফিকুল ইসলাম হিরণের চেম্বারে তাকে নিয়ে যান এক ব্যক্তি। পরিবারের ভাষ্য, ওই ব্যক্তি হিরণকে ভালো চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। পরে হিরণ লিয়নের মাড়ির বাড়তি মাংস কেটে দেন। এর পরপরই রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরদিন লিয়নের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পরিবারের সদস্যরা তাকে আবার হিরণের কাছে নিয়ে যান। তখন হিরণ নতুন করে ওষুধপত্র লিখে দেন। কিন্তু বাড়িতে নেওয়ার পরও লিয়নের অবস্থার উন্নতি হয়নি। এরপর সোমবার দুপুরে লিয়নকে আবার হিরণের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন হিরণ তাকে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দন্ত চিকিৎসক ডা. জয়া রানী দেবনাথের কাছে নিয়ে যান। জয়া রানী দেবনাথ লিয়নের অবস্থা গুরুতর দেখে দ্রুত ময়মনসিংহে নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে রেফার করেন। এরই মধ্যে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থাকা অবস্থায় লিয়ন অচেতন হয়ে পড়ে। সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত লিয়নের বাবা খোকন মিয়া বলেন, লিয়নের দাঁতের মাড়ির পাশে মাংস বেড়ে যাওয়ায় শনিবার সকালে তাকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাই। গেটের কাছে এক ব্যক্তি ভুল বুঝিয়ে হিরণ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। পরে জানতে পারি, ওই ব্যক্তি দালাল। হিরণ মাড়ির অতিরিক্ত মাংস কেটে দেওয়ার পর থেকেই রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এরপর কয়েক দফা তার কাছে নিয়ে গেলেও লিয়নের অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে ময়মনসিংহে রেফার করেন। কিন্তু তার আগেই লিয়ন অচেতন হয়ে পড়ে এবং পরে মারা যায়।
অভিযুক্ত চিকিৎসক রফিকুল ইসলাম হিরণ বলেন, ওই ছেলের দাঁতের মাড়ির মাংস পচে ক্যানসার হয়ে গিয়েছিল। আমি শুধু ড্রেসিং করেছি, কোনো অপারেশন করিনি। তেমন বেশি রক্তক্ষরণও হয়নি। আমার চিকিৎসার কারণে তার মৃত্যু হয়নি। আগে থেকেই তার অবস্থা খারাপ ছিল। প্রয়োজন হলে ময়নাতদন্ত করা হোক। উল্টো আমার চেম্বারে হামলা চালিয়ে যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করেছে। আমি এর বিচার চাই।
তবে নিজের চিকিৎসাসংক্রান্ত যোগ্যতা ও পদবি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। তার চেম্বারে ‘এলএমএএফ’ ও ‘ডিএমএ’ পদবি লেখা রয়েছে।
মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) অলক কান্তি তালুকদার বলেন, বিষয়টি ওই সময়ই চিকিৎসকরা আমাকে জানিয়েছেন। এলএমএএফ কোর্সধারীরা কোনো চিকিৎসক নন। কোনো রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার এখতিয়ার তাদের নেই। সাধারণ মানুষকে বলব, আমাদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দন্ত চিকিৎসক রয়েছেন। আপনারা কারও প্ররোচনায় না পড়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সেবা নিন।
মোহনগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুল লতিফ বলেন, খবর পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ দেয়নি।
আরটিভি/এমএইচজে


