
সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে নিজের দুই শিশু সন্তানকে হত্যার অভিযোগে কামরুল হাসান (৩২) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে গ্রামবাসী।
আটক কামরুল ইসলাম ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী ও দিরাই উপজেলার চরনারচর ইউনিয়নের পেরুয়া-মধুপুর গ্রামের বাসিন্দা।
পুলিশ জানিয়েছে, কামরুল ইসলাম দুই শিশু সন্তানকে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন।
নিহত দুই শিশু হলো- মোহাদ্দিছ মিয়া (৭) ও মেয়ে তুলনা আক্তার (৪)।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দুপুরে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের পাশ থেকে অজ্ঞাতনামা হিসেবে শান্তিগঞ্জ উপজেলার দামোধরতপী-নোয়াগাঁও গ্রামের কাছ থেকে তুলনা আক্তার এবং বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের পূর্ব পাশে সদর উপজেলার দেখার হাওরপাড় থেকে ছেলে মোহাদ্দিসের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ আগস্ট বিকেলে ছেলে মোহাদ্দিছ মিয়া ও মেয়ে তুলনা আক্তারকে নিয়ে বাড়ির বাইরে যান কামরুল ইসলাম। এরপর থেকে তিনি দুই সন্তানসহ নিখোঁজ ছিলেন। নানা জায়গায় খোঁজ করেও তাদের কোনো সন্ধান পায়নি স্বজনরা। পরে গত ১০ আগস্ট রাতে তিনি একা বাড়িতে ফেরেন। এরপর গ্রামের লোকজনের সন্দেহ হলে তার কাছে সন্তানদের খোঁজ জানতে হওয়া হয়। মঙ্গলবার রাতে স্থানীয়দের তিনি জানান বুধবার সকাল ১০টায় একটি সুখবর দেবেন। এরপর বুধবার সকালে গ্রামবাসী তাকে চাপ প্রয়োগ করলে দুই সন্তানকে হত্যার বিবরণ দেন তিনি।
গ্রামের লোকজন জানান, গ্রামবাসীর কাছে কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন ছেলে-মেয়েকে নিয়ে তিনি মদনপুর-দিরাই রাস্তা হয়ে সিলেটে যান। সিলেটের যাওয়ার পথে মেয়ে তুলনাকে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের পাশে শান্তিগঞ্জের দমোধরতপী-নোয়াগাঁও গ্রামের কাছে ফেলে দেন। পরে ছেলেকে নিয়ে সিলেটে শহরে ঘুরে বেড়ান। বাড়ি ফেরার পথে ছেলেকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে হত্যা করে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মদনপুর এলাকার দেখার হাওরে ফেলে দেন। এ সময় গ্রামবাসী তাকে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পরিতোষ রায়ের বাড়ি পেরুয়াতে নিয়ে যান। পরে চেয়ারম্যান অভিযুক্ত কামরুল ইসলামকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন।
মধুপুর গ্রামের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কামরুল ইসলাম এক ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী গ্রামে গ্রামে ঘুরে নানা জিনিসপত্র বিক্রি করেন। ছেলে-মেয়েকে নিয়ে মাঝে-মধ্যে এলাকার বাজারেও যান। গত শুক্রবার বিকেলে মেয়ে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হতে কেউ কেউ দেখেছেন। কিন্তু সন্ধ্যার পর ছেলে-মেয়ে দুইজন নিখোঁজ হওয়ায় পানিতে পড়ার আশঙ্কায় গ্রামবাসী আশপাশের এলাকায় জাল ফেলে খোঁজেন। কিন্তু কোথাও তাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে দুই দিন আগে গ্রামের একজন তাকে ছেলেকে নিয়ে সিলেট শহরের নাইওপুল এলাকায় ঘুরতে দেখেছে। এরপর সোমবার রাতে একা বাড়িতে ফেরার পর গ্রামের লোকজনের সন্দেহ হয়। এক পর্যায়ে গ্রামবাসীর জেরার মুখে ছেলে-মেয়েকে খুন করার কথা স্বীকার করে। এরপর গ্রামের লোকজন তাকে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছে নিয়ে যায়।
চরনারচর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পরিতোষ রায় বলেন, গত শুক্রবার থেকে মধুপুর গ্রামের কামরুল ইসলামের ছেলে-মেয়ে নিখোঁজ ছিল। আজ সকাল ১১টার দিকে মধুপুর গ্রামের লোকজন কামরুল ইসলামকে ধরে আমার বাড়িতে নিয়ে আসে। এলাকার সবার উপস্থিতিতে সে ছেলে-মেয়েকে খুন করার কথা স্বীকার করেছে। সে জানিয়েছে ছেলে-মেয়েকে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের পাশে ফেলে দিয়েছিল। এরপর তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) সুজন সরকার বলেন, পারিবারিক কলহের জেরে কামরুল ইসলাম দুই সন্তানকে হত্যা করে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের পাশে ফেলে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে। তাকে নিজ এলাকা থেকে আটক করা হয়েছে। নিহত দুই শিশুর লাশ ইতোমধ্যে অজ্ঞাতনামা হিসেবে উদ্ধার করা হয়েছিল। কামরুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, প্রাথমিকভাবে তিনি দুই সন্তানকে হত্যা করে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের পাশে ফেলে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী উদ্ধার করা অজ্ঞাত দুই শিশুর মরদেহ তারই সন্তান। তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি জানান, কামরুল ইসলাম মা ও দুই সন্তানকে স্ত্রীর নির্যাতনের প্রতিবাদে রাগ-ক্ষোভে থেকে এই কাজ করেছেন।
এদিকে বুধবার বিকেলে অজ্ঞাতানা হিসেবে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল মর্গে নিহত দুই শিশুর মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। শিশুদের পরিচয় শনাক্তের জন্য পুলিশ সুপারের নির্দেশনা চেয়েছেন বলে জানিয়েছেন সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রতন শেখ।
আরটিভি/এমএইচজে


