
ঢাকার ধামরাইয়ে হকারদের লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেলের আঘাতে বুলডোজার চালকের রক্ত ঝরিয়ে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের কয়েক কোটি টাকার সম্পদ উচ্ছেদ করা হলেও তা দখলমুক্ত রাখতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
গত ৬ জুন পৌর এলাকার ঢুলিভিটা বাসস্ট্যান্ডে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের জমি ও অবৈধ ফুটপাতে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর সময় উত্তেজিত হকাররা একজোট হয়ে উচ্ছেদকারী দলের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে বুলডোজার চালক মনির হোসেন (৪৮) ও তাঁর সহকারী আব্বাস হোসেন (৩৫) রক্তাক্ত জখম হন। আহত হন আরও চারজন। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে উচ্ছেদ কার্যক্রম স্থগিত রেখে আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে পাঠাতে বাধ্য হয় প্রশাসন।
হামলার দুদিন পর তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিদওয়ান আহমেদ রাফি এবং নয়ারহাট শাখার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী নূরে আলম সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ফের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় প্রায় শতাধিক অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়ে কয়েক কোটি টাকার সরকারি জমি উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ঢুলিভিটা অংশে সওজের কোটি টাকার জায়গা ইজারা দিয়ে আসছে ধামরাই পৌরসভা। সওজের জায়গা ৯৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার দরপত্রে ইজারা নিয়েছেন বিএনপি নেতা হাবীবুর রহমান। দরপত্রে সওজের জায়গা উল্লেখ থাকলেও ফুটপাত দখল করে অবৈধ দোকানপাট বসিয়ে বাণিজ্য চালিয়ে আসছে এই প্রভাবশালী চক্রটি।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, সওজ বিভাগের সঠিক তদারকি ও সদিচ্ছার অভাবেই অভিযানের নামে লোকদেখানো ‘নাটক’ তৈরি করা হলেও তা টেকসই করতে কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। ফলে সরকারি অর্থ ও জ্বালানি খরচ করে উচ্ছেদ চালানোর মাসখানেকের মধ্যেই সড়ক ও ফুটপাতগুলো ফের চলে যায় অবৈধ দখলদারদের কবজায়।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, ইজারাদারকে মোটা অঙ্কের জামানত ও নিয়মিত খাজনা দেওয়া সত্ত্বেও ব্যবসায়ীরা কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা পাচ্ছেন না। বরং ইজারার মেয়াদের মাঝেই হঠাৎ দোকানপাট ভেঙে ফেলায় তাঁরা চরম আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। অন্যদিকে, ফুটপাতের অবৈধ দোকানগুলো থেকেও দৈনিক খাজনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে ইজারাদার হাবিবুর রহমান বলেন, পৌরসভার দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা নিয়ে খাজনা নিচ্ছি। আমি কোনো অবৈধ কাজ করছি না। রাস্তা দখল করে দোকান বসিয়ে কেন খাজনা নিচ্ছেন— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাস্তায় আমি বসতে বলিনি। তবে বসলে আমাকে খাজনা দিতে হবে।
নিয়মিত যানজটের বিষয়ে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ ধামরাই শাখার সভাপতি এম. নাহিদ মিয়া জানান, ধামরাইয়ের ঢুলিভিটায় সওজের জায়গা ও ফুটপাত দখল করে অর্থ আদায় করছে প্রভাবশালী মহল। রাস্তায় অবৈধ দোকান বসানোয় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে ‘স্নোটেক্স আউটারওয়্যার’-এর হাজার হাজার শ্রমিক, সাধারণ পথচারী ও জরুরি অ্যাম্বুলেন্স চলাচলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
বেশ কিছুদিন আগেও স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রশাসনের উপস্থিতিতে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও অজ্ঞাত কারণে স্থানটি আবার দখল হয়ে গেছে। তাই সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে দ্রুত ফুটপাতটি চিরতরে দখলমুক্ত করার দাবি জানান তিনি।
পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা নবীউল্লাহ নবী জানান, পৌরসভার ভেতরে যেখানেই বাজার বসবে, সেখান থেকেই খাজনা নেওয়া হবে। এ ব্যাপারে সওজের পক্ষ থেকে অবৈধ দাবি করা হলেও নিজেদের ইজারা বৈধ বলে দাবি করেন এই কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌরসভার প্রশাসক আল মামুন জানান, উচ্ছেদ করা জায়গায় ভাসমানভাবে দোকানপাট বসেছে। এই জায়গাটি গাড়ি রাখার জন্য মালিক সমিতিকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তারা রাখতে রাজি হয়নি। বিষয়টি নিয়ে খুব দ্রুত স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মালিক সমিতির সঙ্গে বসে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
রক্ত ঝরিয়ে উচ্ছেদ করা জায়গা কেন ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না— এ বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের নয়ারহাট উপবিভাগীয় প্রকৌশলী নূরে আলম সিদ্দিক বলেন, সুনির্দিষ্ট বাজেট না থাকায় উচ্ছেদের পরও সওজের জায়গা ধরে রাখা বা সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সওজের জায়গা পৌরসভা কীভাবে ইজারা দিচ্ছে— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও জানান, সওজের জায়গা ইজারা দেওয়ার কোনো এখতিয়ার পৌরসভার নেই। তারা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে তা করছে। এর ফলে বারবার দখল ও যানজট তৈরি হচ্ছে, যা নিরসনে সওজকে অভিযান চালাতে হয়। অবৈধ ইজারা দেওয়া বন্ধের অনুরোধ জানিয়ে সওজ থেকে পৌরসভাকে আগেই চিঠি পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনে সাত দিনের মধ্যে আবারও নতুন চিঠি দেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের দাবি, ধামরাইয়ের মহাসড়কে ফুটপাত-বাণিজ্য ও অবৈধ দখলদারত্ব যে আগের মতোই বহাল রয়েছে, তা দ্রুত সময়ের মধ্যে বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে ফুটপাত ও সওজের জায়গা দখলমুক্ত করে সর্বসাধারণের নির্বিঘ্ন চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
আরটিভি/এমএইচজে


