
দিনাজপুরের পার্বতীপুর বিএনপি গোছানোর সাংগঠনিক দায়িত্ব পেলেন ব্যারিস্টার কামরুজ্জামান। দীর্ঘদিনের তার এই রাজনৈতিক পথচলা এত সহজ ছিল না। কঠিন সময়ে কান্ডারির যথার্থ মূল্যায়নও করেছে দলটি। তিনি নির্বাচনে জয়লাভ না করলেও মানুষের ভালোবাসা ও দলের বিশ্বাস তার রাজনৈতিক পথচলাকে আরও মসৃণ ও দৃঢ় করেছে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে তিনি পার্বতীপুর বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন। তিনি এবার পার্বতীপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে দলের নতুন সাংগঠনিক দায়িত্ব পেয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিএনপির ঘোষিত পার্বতীপুর উপজেলা আহ্বায়ক কমিটিতে তাকে আহ্বায়ক করা হয়। স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, নির্বাচন-পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তার হাতে উপজেলা বিএনপির নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তার প্রতি আস্থারই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে।
দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে অবস্থান করলেও বিএনপির রাজনীতি থেকে কখন বিচ্ছিন্ন ছিলেন না কামরুজ্জামান। যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আইন উপদেষ্টা হিসেবেও পরিচিত। দলের কঠিন ও প্রতিকূল সময়ে রাজনৈতিক ও আইনগত কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার কারণে অনুসারীদের কাছে তিনি ‘দুঃসময়ের কাণ্ডারি’ হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছেন।
তবে পার্বতীপুরের রাজনীতিতে তার পথচলা সহজ ছিল না। স্থানীয় নেতাকর্মীদের একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তার রাজনৈতিক ভূমিকা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে তাকে স্থানীয় রাজনীতিতে আড়ালে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় বিএনপি দিনাজপুর-৫ (পার্বতীপুর–ফুলবাড়ী) আসনে তার ওপর আস্থা রেখে দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’ তুলে দেয়।
নির্বাচনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজন ছিলেন বিএনপির তৎকালীন স্থানীয় নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য এ জেড এম রেজওয়ানুল হক। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়ায় তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে রেজওয়ানুল হক জয়ী হন এবং ধানের শীষের প্রার্থী কামরুজ্জামান পরাজিত হন।
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের একাংশের মূল্যায়ন, একই রাজনৈতিক বলয় থেকে দুই প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপির ভোট ও সাংগঠনিক শক্তিতে বিভাজন তৈরি করেছিল। এর প্রভাব পড়ে ধানের শীষের নির্বাচনী ফলাফলে। তবে নির্বাচনী পরাজয়ের পরও কামরুজ্জামান রাজনীতির মাঠ ছেড়ে যাননি।
বরং নির্বাচন শেষে তিনি নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ আরও জোরদার করেন। তৃণমূলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের সক্রিয় করা, নির্বাচনকেন্দ্রিক বিভক্তি কমিয়ে আনা এবং দলকে নতুনভাবে সংগঠিত করার কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২০ আগস্ট কেন্দ্রীয় বিএনপি তাকে পার্বতীপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়কের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচনে পরাজয়ের পরপরই উপজেলার সাংগঠনিক নেতৃত্ব তার হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এখন তার সামনে প্রধান কাজ হবে নির্বাচনকে ঘিরে সৃষ্টি হওয়া বিভক্তি কাটিয়ে পার্বতীপুর বিএনপিকে একটি ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।
এর মধ্যেই কামরুজ্জামানের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। দলীয় একাধিক সূত্রের দাবি, বিএনপির আসন্ন কাউন্সিলে ব্যারিস্টার এ কে এম কামরুজ্জামানকে দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি। ফলে বিষয়টি আপাতত দলীয় সূত্রনির্ভর সম্ভাবনা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কাজের অভিজ্ঞতা এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কাজের সম্পর্কের কারণে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তার নাম আলোচনায় আসছে বলে মনে করছেন তার ঘনিষ্ঠরা।
নতুন দায়িত্ব প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার এ কে এম কামরুজ্জামান বলেন, ‘নির্বাচনে জয়-পরাজয় রাজনীতির অংশ। কিন্তু দল, আদর্শ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আমার ওপর যে আস্থা রেখে পার্বতীপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্ব দিয়েছেন, সেই আস্থার মর্যাদা রাখতে চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘অতীতের বিভেদ ভুলে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে পার্বতীপুরে একটি শক্তিশালী ও গণমুখী বিএনপি গড়ে তোলাই হবে আমার প্রধান অঙ্গীকার। আমার কাছে পদ নয়—দায়িত্ব ও মানুষের আস্থাই সবচেয়ে বড়।’
আরটিভি/ এসকেডি



