
লিজ, আদালতের আদেশ ও নথিপত্রের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ময়মনসিংহে শত শত কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানায় নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, জাল-জালিয়াতি, ভুয়া মালিক ও ওয়ারিশ তৈরি এবং আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে একের পর এক মূল্যবান সরকারি জমি বেহাত করা হচ্ছে। এসব জমিতে গড়ে উঠছে বহুতল ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা।
তবে প্রশাসনের দাবি, সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বেহাত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে ময়মনসিংহ নগরীর আমলাপাড়ার শেরপুকুর এলাকার প্রায় ২৫ শতক সরকারি জমি। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া মালিক সাজিয়ে জমিটি দখলের পাঁয়তারা করছে একটি চক্র।
একইভাবে নগরীর বাউন্ডারি রোডের প্রায় ১০ শতাংশ সরকারি জমি লিজ নিয়ে পুরোনো স্থাপনা ভেঙে নতুন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে এক সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
নগরীর প্রাণকেন্দ্র গোলপুকুরপাড়ে প্রায় ২৫ শতক জায়গাজুড়ে শতবর্ষী জমিদারবাড়ি হিসেবে পরিচিত নাটোর লজের জমিতেও বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ৩০ কোটি টাকা মূল্যের এই সম্পত্তি একসময় অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের প্রভাবিত করে নিলামের নামে সরকারি এই সম্পত্তিতে কার্যক্রম চালাচ্ছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
এদিকে নগরীর সি কে ঘোষ রোডে ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত প্রায় ২৬ শতাংশ সরকারি জমিও দখলে চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি সম্পত্তি বেহাতের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালে তথ্য গোপন করে নগরীর রেলি মোড় এলাকায় পাট অধিদপ্তরের প্রায় ৮৪ শতাংশ জমি আদালতের মাধ্যমে মাত্র ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায় দলিল করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল একটি চক্রের বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার পর ওই দলিল বাতিল করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সরকারি জমি হাতিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথমেই দুর্বল করে ফেলা হয় জমির নথিপত্র। এরপর গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র গায়েব হয়ে যাওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় নথি আদালতে যথাসময়ে উপস্থাপন না করার সুযোগ নেওয়া হয়। ফলে সরকারি পক্ষের আইনি লড়াই দুর্বল হয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে নামজারি ও মালিকানা পরিবর্তনের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানায় চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগরীর ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি বলেন, ময়মনসিংহ নগরীর অনেক মূল্যবান জমি একসময় হিন্দু জমিদারদের মালিকানাধীন ছিল। এসব সম্পত্তির ক্ষেত্রে ভুয়া ওয়ারিশ তৈরি ও নথি জালিয়াতির মাধ্যমে জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। এসব জমির ওপর এখন বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অনেক কিছুই জানেন। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় একের পর এক মূল্যবান সম্পত্তি হাতছাড়া হচ্ছে।
ময়মনসিংহ জজ কোর্টের সরকারি কৌঁসুলি আজহারুল হক বলেন, সরকারি সম্পত্তি রক্ষার ক্ষেত্রে নথি সংরক্ষণ, আদালতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যথাসময়ে উপস্থাপন এবং শক্তিশালী আইনি লড়াই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, সরকারি সম্পত্তি রক্ষার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের দায় কোনো অংশে কম নয়। আদালত কাগজপত্র ও দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেয়। সংশ্লিষ্টরা যদি সময়মতো প্রয়োজনীয় প্রমাণ উপস্থাপনে গাফিলতি করেন, তাহলে সরকারি পক্ষের আইনি লড়াই দুর্বল হয়ে পড়ে।
ময়মনসিংহ সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)'র সাধারণ সম্পাদক ইয়াজদানী কোরাইশী কাজল বলেন, লিজ কিংবা আদালতের আদেশকে সামনে রেখে সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই একের পর এক সরকারি সম্পত্তি দখলের অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে দায়িত্বশীলদের আরও জবাবদিহির মধ্যে আনা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, একের পর এক মূল্যবান সরকারি সম্পদ বেহাত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না।
তবে অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান বলেন, সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। কোনো অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
আদালতের রায়ের পর প্রশাসনের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুঃখজনক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে আদালতের রায়ের পর আমাদের মতামত চাওয়া হয়। এর বেশি কিছু করার সুযোগ থাকে না।
সচেতন মহলের দাবি, ময়মনসিংহের শত শত কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় সব খাস, অর্পিত ও সরকারি জমির পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল তালিকা তৈরি, নথিপত্র সংরক্ষণ নিশ্চিত এবং বিতর্কিত সম্পত্তিগুলো পুনঃতদন্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি সম্পত্তি বেহাতের সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেট ও দায়িত্বে অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আরটিভি/এমএইচজে


