
মাত্র ৪ হাজার টাকার বিনিময়ে দুই শিশুর পেটকে ইয়াবা পাচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ মাদকচক্রের বিরুদ্ধে। ৯ ও ১২ বছর বয়সী ওই দুই শিশুকে কক্সবাজারের উখিয়া থেকে চট্টগ্রামে পাঠানো হচ্ছিল।
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় র্যাবের তল্লাশিতে আটকের পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তাদের পেট থেকে ১৩৩টি পোটলায় ৬ হাজার ৬১৫ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
র্যাবের দাবি, একই দুই শিশুকে ব্যবহার করে এর আগেও দুইবার উখিয়া থেকে চট্টগ্রামে ইয়াবার চালান পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।
র্যাব-৭-এর প্রেস বিজ্ঞপ্তি ও চান্দগাঁও ক্যাম্পের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার তাওহিদুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ইয়াবার একটি চালান বহনের খবর পেয়ে শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে আনোয়ারা থানার সরকারহাট এলাকার তৈলারদ্বীপ সেতু সংলগ্ন বাঁশখালী-আনোয়ারা-চট্টগ্রাম সড়কে অস্থায়ী চেকপোস্ট বসায় র্যাবের একটি দল।
একপর্যায়ে সন্দেহভাজন একটি সিএনজি অটোরিকশায় তল্লাশি চালিয়ে যাত্রী আসনে থাকা শারমিন আকতার ওরফে ইসমত আরা (৪০) নামে এক নারীকে আটক করা হয়। তার সঙ্গে থাকা ৯ ও ১২ বছর বয়সী দুই শিশুকেও হেফাজতে নেয় র্যাব।
র্যাব জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ওই নারী শিশু দুটির পেটের ভেতরে ইয়াবা বহনের তথ্য স্বীকার করেন। পরে ৬ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ৪৫ মিনিটে তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানে এক্স-রে পরীক্ষায় শিশু দুটির পেটের ভেতরে ইয়াবাসদৃশ অসংখ্য বস্তুর উপস্থিতি শনাক্ত হয়।
চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পয়োনিষ্কাশনের মাধ্যমে একে একে পোটলাগুলো বের করে আনা হয়। র্যাবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৯ বছর বয়সী শিশুটির পেট থেকে কালো স্কচটেপে মোড়ানো ৬৭টি পোটলা এবং ১২ বছর বয়সী শিশুটির পেট থেকে একই ধরনের ৬৬টি পোটলা উদ্ধার করা হয়। সব মিলিয়ে ১৩৩টি পোটলায় ছিল ৬ হাজার ৬১৫ পিস ইয়াবা। জব্দ করা মাদকের আনুমানিক মূল্য প্রায় ২০ লাখ টাকা।
তদন্তে র্যাব আরও জানতে পেরেছে, আটক নারী উখিয়া থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে চট্টগ্রাম শহরে বিক্রির উদ্দেশ্যে শিশু দুটিকে কৌশলে ইয়াবার পোটলা খাইয়ে সঙ্গে নিয়ে আসতেন। র্যাবের দাবি, এর আগেও একই দুই শিশুর পেটের ভেতর ইয়াবা বহন করিয়ে দুইবার উখিয়া থেকে চট্টগ্রামে চালান পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ইয়াবার চালান বহনের জন্য শিশু দুটিকে জনপ্রতি ৪ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা ছিল। চট্টগ্রামে পৌঁছে চালান বুঝিয়ে দেওয়ার পর আরও টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। সামান্য অর্থের প্রলোভনে শিশুদের এমন প্রাণঘাতী ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়ার ঘটনাকে মাদক কারবারিদের নতুন ও ভয়ংকর কৌশল হিসেবে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
তবে শিশু দুটিকে প্রথম কারা এই কাজে যুক্ত করেছে, তাদের অভিভাবকদের ভূমিকা কী এবং উখিয়া থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এই চালানের মূল নিয়ন্ত্রক কারা এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি সামনে আসেনি। পুরো চক্র শনাক্তে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, শিশুদের পেটের ভেতরে এভাবে মাদক বহন করানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সাধারণত প্লাস্টিক দিয়ে মুড়িয়ে ছোট ছোট ক্যাপসুল বা পোটলার মতো করে মাদক পেটের ভেতরে নেওয়া হয়। কোনো পোটলা অন্ত্রে আটকে গেলে কিংবা ফুটো হয়ে গেলে গুরুতর শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। প্যাকেটের ভেতরের মাদক শরীরে ছড়িয়ে পড়লে দ্রুত বিষক্রিয়া হতে পারে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে মৃত্যুও ঘটতে পারে।
র্যাব-৭ জানিয়েছে, আটক নারী, হেফাজতে নেওয়া দুই শিশু এবং জব্দ করা ইয়াবার ঘটনায় পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। শিশুদের সামনে রেখে যারা নিজেদের আড়ালে থেকে এই মাদক চালান পরিচালনা করছে, তাদের শনাক্তে তদন্ত শুরু হয়েছে। উখিয়া থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত এই পাচারচক্রের নেপথ্যের মূলহোতাদের আইনের আওতায় আনতে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে র্যাব।
আরটিভি/এসকে


