
আইন ও ধর্মীয় বিধান মেনে এক ডিভোর্সী নারীকে বিয়ে করায় কাল হলো শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার রতন সরদারের (৪৫) জন্য। কোনো অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া সত্ত্বেও তথাকথিত সালিশ বৈঠকে তাকে দেওয়া হয়েছে সাড়ে ৫ লাখ টাকার অর্থদণ্ড। শুধু জরিমানা করেই ক্ষান্ত হয়নি মাতব্বররা; রামদা, ছেনদা ও লোহার রড উঁচিয়ে বাড়ি ঘেরাও করে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ায় রাতের আঁধারে সাঁতরে নদী পার হয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এই ভুক্তভোগী।
চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে জাজিরা উপজেলার মনাই ছৈয়াল কান্দি গ্রামে।
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা গেছে, রতন সরদারের বন্ধু রুবেল শিকদারের সাথে তার স্ত্রী রুবিনা আক্তারের পারিবারিক কলহ চলছিল। এর জের ধরে ২০২৫ সালের অক্টোবরে রুবেল তার স্ত্রী রুবিনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ডিভোর্স দেন। বিচ্ছেদের প্রায় ১০ মাস পর রুবিনাকে বিয়ে করেন রতন সরদার। রতনের প্রথম স্ত্রী হোসনে আরা বেগমেরও এই বিয়েতে পূর্ণ সম্মতি ছিল। তবে এই বৈধ ও আইনি বিয়ে মেনে নিতে পারেনি রুবেল ও এলাকার একটি প্রভাবশালী মহল।
গত ৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মাতব্বররা মনাই ছৈয়াল কান্দি গ্রামে এক সালিশ বৈঠকের (ক্যাঙ্গারু কোর্ট) আয়োজন করে। প্রায় পাঁচশ মানুষের উপস্থিতিতে বিচার বসানো হলেও রতন বা রুবিনার বিরুদ্ধে কোনো পরকীয়া বা অনৈতিক কাজের প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি কেউ। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও জুরি ভোটের অজুহাতে জোরপূর্বক রতনকে সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এবং সূর্য ওঠার আগেই গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে জোর করে একটি 'আপোষনামা' তৈরি করা হয়। নথির হিসাব অনুযায়ী, নগদ ১০ হাজার টাকা ও বন্দকি জমির ১ লাখ টাকা কেটে নেওয়ার পরও শান্ত হয়নি প্রভাবশালী সমাজপতিরা। বাকি টাকা আদায়ে বেঁধে দেওয়া হয়েছে একের পর এক কিস্তির তারিখ।
অত্যাচারের মাত্রা এখানেই শেষ হয়নি। সালিশের পর রামদা ও লোহার রড নিয়ে রতনের বসতবাড়িতে হামলা ও তাণ্ডব চালানোর চেষ্টা করে প্রভাবশালীরা। উপায় না পেয়ে নিজের জীবন বাঁচাতে রাতের আঁধারে সাঁতরে নদী পার হয়ে আত্মগোপনে যান রতন।
রতনের প্রথম স্ত্রী হোসনে আরা বেগম জানান, রতনের সাথে তার সম্মতিতেই এই বিয়ে হয়েছে। আর দ্বিতীয় স্ত্রী রুবিনা আক্তার বলেন, আগের স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আইনি উপায়েই বিচ্ছেদ হয়েছিল। কোনো পরকীয়া নয়, পরিবারের সম্মতিতে স্বেচ্ছায় রতনকে বিয়ে করেছি।
এদিকে সালিশ বৈঠকে জরিমানার বিষয়টি স্বীকার করেছেন অভিযুক্ত সমাজপতিরা। তবে কোন আইনের বলে তারা এমন সিদ্ধান্ত ও অর্থদণ্ড দিলেন, সে বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
এ বিষয়ে প্রাণভয়ে পালিয়ে বেড়ানো রতন সরদার জাজিরা থানায় ৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১০ জনের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালেহ আহাম্মদ জানান, আমরা একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ঘটনার সত্যতা মিললে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরটিভি/টিআর


