
অপারেশনের পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন স্ত্রীকে রেখে দুই মাসের সন্তানকে নিয়ে বাড়ি চলে গিয়েছিলেন স্বামী। সন্তানকে কাছে না পেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন স্ত্রী। মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শিশুটিও কাঁদতে থাকে। পরে হাসপাতাল থেকে খবর পেয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করে তার বাবার মাধ্যমেই মায়ের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে দিরাই থানা পুলিশ।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মায়ের কাছে শিশুটিকে নিয়ে পৌঁছান বাবা মো. নিপুন মিয়া (৩০)। এর আগে ভোরে হাসপাতালের পুরাতন ভবনের চতুর্থ তলার ৫ নম্বর ওয়ার্ড থেকে শিশুটিকে নিয়ে বাড়ি চলে যান তিনি। পরে দুপুরে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার দুর্গম ভাটিয়াগাঁও গ্রাম থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করেন দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আমিনুল ইসলাম।
নিপুন মিয়ার বাড়ি দিরাই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের ভাটিয়াগাঁও গ্রামে। প্রায় ১২ বছর আগে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার বানর এলাকার মোছা. বিনা বেগমের সঙ্গে পারিবারিকভাবে তার বিয়ে হয়। তাদের চার সন্তান। বড় মেয়ের বয়স ৮ বছর, দ্বিতীয় সন্তান ছেলের বয়স ৬ বছর, তৃতীয় সন্তান মেয়ের বয়স ৫ বছর। তারা বাড়িতে দাদা ও চাচা-চাচির কাছে রয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক মাস আগে বিনা বেগমের পিত্তনালীতে পাথর ধরা পড়ে। ২০ দিন আগে তাকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আটদিন আগে অস্ত্রোপচার করে পিত্তনালীর পাথর অপসারণ করা হয়। চিকিৎসার খরচ স্বামীর দেওয়ার কথা থাকলেও দিনমজুর জামাতার পাশে দাঁড়াতে বিনার মা মিনারা বেগম দেড় লাখ টাকার জমি বিক্রি করেন।
ওই টাকা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। বিনার অভিযোগ, তার স্বামী শাশুড়ির জমি বিক্রির টাকা নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিলেন। এ নিয়ে কলহের জেরে অসুস্থ স্ত্রীকে হাসপাতালে রেখেই দুই মাসের শিশু মো. আতিকুলকে নিয়ে বাড়ি চলে যান নিপুন মিয়া।
সন্তান ও স্বামীকে হাসপাতালে না পেয়ে বিষয়টি হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশকে জানান বিনা বেগম। পরে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সোমবার ভোর ৫টার দিকে শিশু আতিকুলকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন নিপুন মিয়া ও তার মা রাজিয়া বেগম।
পরে বিষয়টি দিরাই থানা পুলিশকে জানানো হয়। ওসি মো. আমিনুল ইসলাম দুর্গম ভাটিয়াগাঁও গ্রামে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে শিশুটিকে উদ্ধার করেন। পরে নিপুন মিয়াকে বুঝিয়ে তার মাধ্যমেই শিশুটিকে আবার মায়ের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
বিনা বেগম বলেন, ২০ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন তিনি। চিকিৎসার জন্য তার মা দেড় লাখ টাকার জমি বিক্রি করেছেন। আট দিন আগে তার অস্ত্রোপচার হয়েছে, এতে ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। স্বামী ওই টাকা নিজের কাছে রাখতে চাওয়ায় তাদের মধ্যে বিরোধ হয়। এর জেরে স্বামী তাকে না জানিয়ে ভোরে দুধের শিশুকে নিয়ে বাড়ি চলে যান। সন্তানকে কাছে না পেয়ে বুকে দুধ জমে ব্যথা শুরু হয় তার।
তিনি আরও জানান, তার স্বামী দিনমজুর। প্রায়ই তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও মারধর করেন। এরপরও স্বামী-সন্তানের কথা ভেবে তিনি সংসার করে আসছেন।
নিপুন মিয়া বলেন, স্ত্রীর সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছিল। মাথা গরম থাকায় ছেলেকে নিয়ে বাড়িতে চলে এসেছিলেন। ওসি বাড়িতে যাওয়ার পর আবার ছেলেকে নিয়ে তার মায়ের কাছে যাচ্ছেন।
দিরাই থানার ওসি মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, স্বামী-স্ত্রীর কলহের জেরে অসুস্থ স্ত্রীকে হাসপাতালে রেখে দুই মাসের শিশুকে নিয়ে বাড়ি চলে গিয়েছিলেন ওই ব্যক্তি। হাসপাতাল থেকে খবর পাওয়ার পর তার বাড়ি থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করে বাবাকে বুঝিয়ে আবার মায়ের কাছে পাঠানো হয়েছে।
ওসি বলেন, এত ছোট শিশু মাকে ছাড়া থাকতে পারে না। হাসপাতাল থেকেও জানানো হয়েছিল, সন্তান কাছে না থাকায় মা কষ্ট পাচ্ছেন। খবর পাওয়ার পর দ্রুত নৌকায় করে দুর্গম এলাকায় গিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়।
আরটিভি/এমএইচজে




