
ছেলেটা আর কবে বাড়ি ফিরবে?—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই কেটে গেছে দীর্ঘ ১৪ বছর। ছেলের ছবি হাতে নিয়ে আজও পথ চেয়ে বসে থাকেন বৃদ্ধা খুশিদা বেগম (৮০)। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই মায়ের চোখের পানি যেন থামছেই না। একমাত্র প্রত্যাশা, জীবনের শেষ সময়ে অন্তত একবার ছেলেকে চোখের সামনে দেখা।
চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার গোহট উত্তর ইউনিয়নের তফিরা গ্রামের প্রবাসী শহিদুল্লাহ দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে সৌদি আরবের দাম্মামের কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তার স্ত্রী পেয়ারা বেগম, ছেলে জিহাদ ও মেয়ে পিয়া আক্তারসহ স্বজনরা দীর্ঘদিন ধরে তার দেশে ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছেন।
পরিবারের কাছে থাকা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারিতে একটি চিঠিতে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের দাম্মামে কর্মরত শহিদুল্লাহকে সৌদি নাগরিক জাকি আল আশুরকে হত্যার মামলায় ২০১৩ সালের ২৪ জুলাই আটক করা হয়।
চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে, বিচারে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে এবং রায় বাস্তবায়নের জন্য অপেক্ষাধীন। বিষয়টি বাংলাদেশ দূতাবাস, রিয়াদের পত্রের মাধ্যমে পরিবারকে জানানো হয়েছিল।
তবে শহিদুল্লাহর স্ত্রী ও স্বজনদের দাবি, ওই ঘটনায় তাকে ফাঁসানো হয়েছে। তারা বিষয়টি মানবিক ও আইনগত দৃষ্টিতে পুনর্বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
শহিদুল্লাহর স্ত্রী পেয়ারা বেগম বলেন, দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে তিনি সৌদি আরবে। বিদেশে যাওয়ার ৪ বছর পর সে দেশে আসেন এবং ছুটি কাটিয়ে পুনরায় সৌদি আরবে চলে যান। তারপর শুরু তার ওপর নির্যাতন।
তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে স্বামীকে কাছে না পাওয়ার কষ্ট নিয়ে তিনি সন্তানদের নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তার দাবি, স্বামীকে আইনি সহায়তা ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক।
শহিদুল্লাহর ছেলে জিহাদের বয়স যখন মাত্র সাত-আট বছর, তখনই বাবাকে আর দেখেননি তিনি। এরপর কেটে গেছে ১৪ বছর। শৈশব পেরিয়ে এখন যুবক জিহাদ। কিন্তু বাবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ হয়নি তার। বাবাকে একবার চোখের সামনে দেখতে চান তিনি। এ জন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন জিহাদ।
অন্যদিকে প্রায় ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা খুশিদা বেগম এখনও ছেলের ছবি হাতে নিয়ে কাঁদেন। স্বজনরা জানান, প্রতিদিন বাড়ির দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন তিনি। ছেলের ফেরার আশায় দিন গুনতে গুনতে তার চোখেমুখে বয়সের ছাপ আরও স্পষ্ট হয়েছে।
খুশিদা বেগম বলেন, আমার ছেলে কবে আসবে জানি না। আমি শুধু একবার ছেলেকে চোখের সামনে দেখতে চাই। ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
স্থানীয় প্রতিবেশী মিজান হোসেন ও বাচ্চু মিয়া জানান, শহিদুল্লাহ ৪ বছর সৌদি আরবে কাজ করেছেন। ৪ বছর পর দেশে এসে পুনরায় তিনি সৌদিতে চলে যান, তারপর শুরু তার ট্র্যাজেডি।
তাদের মতে, তিনি সহজ-সরল মানুষ ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থাকায় তার পরিবার চরম মানসিক ও আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের প্রত্যাশা, বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও দূতাবাসের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনি ও কূটনৈতিক উদ্যোগ নেবে। একই
সঙ্গে শহিদুল্লাহর মামলার বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাব্য আইনি পথ সম্পর্কে পরিবারকে সহায়তা করা হবে।
১৪ বছর ধরে অপেক্ষায় একটি পরিবার। স্ত্রী অপেক্ষা করছেন স্বামীর জন্য, সন্তানরা বাবার জন্য আর বৃদ্ধা মা অপেক্ষা করছেন তার প্রিয় ছেলের জন্য।
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া খুশিদা বেগমের একটাই আকুতি, মৃত্যুর আগে যেন একবার ছেলেকে ফিরে পান তিনি।
আরটিভি/এমএইচজে


