
‘তিনটি গ্রাম টাকা দিয়ে কিনে এনেছি, মহেন্দ্র নগর কিনে আনছি। দুই গ্রামের টাকা নেতারা ভাগ নেবে। নেতারা টাকা খেয়ে ফেললে আমার কোনো গন্ধ বের হবে না। তোমার কাছে পাঁচ টাকা খেলে গন্ধ বের হবে। সবাই মিলে খেয়ে ফেললে আমার কিছু হবে না।’ এ সময় টাকা কম দিতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আর কয়টা দিন অপেক্ষা করো, ১০ হাজার টাকা দিয়েও পাবে না।’
বিনামূল্যে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কথা বলে টাকা আদায়ের এমন কথোপকথনের কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। সম্প্রতি সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সোনাতলা গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে।
সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পের আওতায় সরকারি সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যে বিনামূল্যে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কথা থাকলেও কার্ডপ্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তথ্য সংগ্রহকারী আল আমিনের বিরুদ্ধে।
অভিযুক্ত আল আমিন উপজেলার ধনপুর ইউনিয়নের মাছিমপুর গ্রামের আবু বক্করের ছেলে। তিনি ওই ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে চূড়ান্ত তালিকার ১৩ নম্বরে রয়েছেন।
ধনপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সোনাতলা গ্রামের শহিদ নুরের কাছে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য পাঁচ হাজার টাকা দাবি করেন তথ্য সংগ্রহকারী আল আমিন। তাদের কথোপকথনের কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে।
দীর্ঘ আলোচনার পর চার হাজার টাকা দেওয়ার শর্তে নগদ এক হাজার টাকা আল আমিনের হাতে তুলে দেন শহিদ নুর। টাকা দেওয়া ও ভিডিও ধারণের ঘটনাটি প্রায় এক সপ্তাহ আগের। তবে ভিডিওটি সম্প্রতি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা ও শোনা যায়, একটি আধাপাকা দালানঘরের ভেতরে বসা শহিদ নুরের কাছে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য টাকা দাবি করছেন আল আমিন। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, এই টাকা শুধু তিনি একা নেন না; নেতাদেরও ভাগ দিতে হয় এবং সবাই মিলেমিশে খান।
একপর্যায়ে আল আমিনকে বলতে শোনা গেছে, ‘তিনটি গ্রাম টাকা দিয়ে কিনে এনেছি, মহেন্দ্র নগর কিনে আনছি। দুই গ্রামের টাকা নেতারা ভাগ নেবে। নেতারা টাকা খেয়ে ফেললে আমার কোনো গন্ধ বের হবে না। তোমার কাছে পাঁচ টাকা খেলে গন্ধ বের হবে। সবাই মিলে খেয়ে ফেললে আমার কিছু হবে না।’ এ সময় টাকা কম দিতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আর কয়টা দিন অপেক্ষা করো, ১০ হাজার টাকা দিয়েও পাবে না।’
আল আমিনের কথোপকথন গোপনে ভিডিও ধারণ করেন শহিদ নুর। পরে একপর্যায়ে ভিডিওটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে এলাকাজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ভিডিও প্রকাশের পর আল আমিন তাকে নানা ধরনের হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন শহিদ নুর।
আল আমিনকে টাকা দেওয়া শহিদ নুর বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার জন্য আল আমিন আমার কাছে পাঁচ হাজার টাকা চেয়েছিল। আমি নগদ এক হাজার টাকা তার হাতে তুলে দিয়েছিলাম। বাকি টাকা পরে দেব বলেছিলাম। সে আমার প্রতিবেশী আবুল কালামের স্ত্রী আছমা বেগমের কাছ থেকেও নাকি পাঁচ হাজার টাকা নিয়েছে। টাকা নিয়ে যদি কাজ না করে, তাই প্রমাণ রাখার জন্য ভিডিও করে রেখেছিলাম। পরে কীভাবে ভিডিওটি ফেসবুকে চলে যায়, তা জানি না। এরপর থেকে আল আমিন আমাকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। আমার পা ভেঙে ফেলবে বলেও হুমকি দিয়েছে। এরপর আমি আমাদের এলাকার বিএনপি নেতা ও শরিফগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হান্নানকে বিষয়টি জানিয়েছি।’
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এবং অভিযোগ পাওয়ার ভিত্তিতে ধনপুর ইউনিয়নের ওই ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও শরিফগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হান্নান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার কাছে আল আমিনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। গত ১১ অক্টোবর তিনি এ অভিযোগ দায়ের করেন।
ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হান্নান বলেন, ‘বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের সদস্যদের বিনামূল্যে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া। বিএনপির কোনো নেতাকর্মী এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত নন। কিন্তু আল আমিন কার্ড দেওয়ার নামে এবং দলের নেতাদের নাম ভাঙিয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এবং দলের সুনাম নষ্ট করতেই তিনি এমনটা করছেন। তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেছি।’
অভিযুক্ত তথ্য সংগ্রহকারী আল আমিনের সঙ্গে কথা বলতে তার ব্যক্তিগত মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সকিনা আক্তার বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কথা বলে টাকা আদায় এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য আল আমিনকে তথ্য সংগ্রহকারীর তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগও পাওয়া গেছে। অভিযোগের বিষয়ে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আরটিভি/টিআর




