
সারিবদ্ধ আলমারিতে বই। তবে পাঠক নেই বললেই চলে। ভবনের বিভিন্ন অংশে অযত্নের ছাপ। একসময় যে পাঠাগারটি ছিল জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র, দীর্ঘদিনের অবহেলা ও দখলের কারণে সেটি এখন অনেকটাই পাঠকশূন্য। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া শেরে বাংলা সাধারণ পাঠাগারের চিত্র এমনই।
১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই পাঠাগারটি একসময় স্থানীয় তরুণ, শিক্ষার্থী ও বইপ্রেমীদের মিলনস্থল ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়া, ডিজিটাল মাধ্যমের বিস্তার এবং পাঠাগার ভবনের বেহাল অবস্থার কারণে সেখানে পাঠকের উপস্থিতি কমেছে। তরুণদের একটি বড় অংশ এখন বইয়ের বদলে মোবাইল ফোনের পর্দাতেই বেশি সময় কাটাচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্যমতে, ১৯৮৪ সালের ৮ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মঠবাড়িয়ায় এসে পাঠাগারটির ফলক উন্মোচন করেন। কবি আব্দুল খালেক প্রতিষ্ঠিত ‘শেরে বাংলা স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ’-এর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবং কে এম লতিফ ইনস্টিটিউশনের দান করা জমিতে উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে পাঠাগার ভবনটি নির্মাণ করা হয়।
প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পাঠাগারের কক্ষ নিজেদের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। এতে পাঠাগারের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
১৯৯৩ সালে মঠবাড়িয়া পৌরসভা গঠনের পর পাঠাগারটি প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে ছয়টা পর্যন্ত খোলা রাখার জন্য একজন কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে তখন পাঠাগারে পাঠকের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। দীর্ঘদিন বইগুলোও পড়ে ছিল অব্যবহৃত অবস্থায়।
২০১৬ সালে স্থানীয় তরুণ লেখক মেহেদী হাসানের একটি কলাম প্রকাশের পর পাঠাগারটির দুরবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্থানীয় তরুণ, লেখক ও বইপ্রেমীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠে ‘মঠবাড়িয়া পাঠাগার আন্দোলন’।
অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুর হোসাইন মোল্লাসহ স্থানীয় প্রবীণদের পরামর্শে তরুণেরা তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফরিদ উদ্দিন আহমেদের কাছে স্মারকলিপি দেন। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ২০১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে পাঠাগারের দুটি কক্ষ দখলমুক্ত করা হয়। একইসঙ্গে সেখানে সাপ্তাহিক পাঠচক্রের কার্যক্রম শুরু হয়।
এরপর প্রতি শুক্রবার পাঠচক্র, বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিচারক, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও বইপ্রেমীদের সহযোগিতায় পাঠাগারে নতুন বইও সংগ্রহ করা হয়। এতে একসময় পাঠাগারটিতে আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে।
তবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের পর পাঠাগার ভবনের বেহাল অবস্থার কারণে কার্যক্রমে আবারও ভাটা পড়ে। বর্তমানে পাঠকের উপস্থিতিও কম।
পাঠাগারটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে পর্যালোচনা কমিটির সম্পাদক কবি মেহেদী হাসান বলেন, ২০১৬ সালের পর দীর্ঘদিন স্থানীয় তরুণ লেখক ও বইপ্রেমীরা এখানে পাঠচক্র করে আসছেন। কিন্তু কোভিড-১৯-এর পর ভবনের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যাওয়ায় পাঠকের আনাগোনা কমেছে। ফলে পাঠাগারকেন্দ্রিক কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছে।
পাঠাগারটি টিকিয়ে রাখতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন জিকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুর হোসাইন মোল্লা। তার মতে, স্মার্টফোনের আসক্তির এই সময়ে তরুণেরা যখন ক্রমেই বই ও পাঠচর্চা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তখন তাদের পাঠাগারমুখী করা গেলে এটি সমাজ পরিবর্তনের কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। তবে জরাজীর্ণ ভবন ও নানা অব্যবস্থাপনার কারণে পাঠাগারটির কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই দ্রুত ভবনটি মেরামত করে পাঠাগারের পরিবেশ পাঠবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
আরটিভি/এমএম




