
মাত্র পাঁচ বছর আগেও রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার ভারাড়দহ বিলটি বেদখল হয়ে প্রায় বিলুপ্তির পথে ছিলো। এটি সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছিল, যেখানে গত পাঁচ দশক ধরে বোরো ধানের চাষ করা হতো।
তবে সম্প্রতি বিলটি পুনঃখনন করে এবং চারদিকের ১০০ ফুট চওড়া পাড়ে ২১৩ প্রজাতির বিরল কাঠ, ফল, ভেষজ ও ফুলগাছ রোপণের ফলে এটি এখন এক মনোরম ও স্বর্গীয় সৌন্দর্যের আধার, ঘন সবুজ বন ও অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) বদরগঞ্জ পৌরশহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত ১১.৫৯ একর আয়তনের জলাশয়সহ এই বিলটিতে পুনঃখনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে।
বিএমডিএ-এর রংপুর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান খান জানান, ভারাড়দহ বিলের পাড়ে ২১৩ প্রজাতির সাড়ে ৬ হাজারেরও বেশি বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় গাছ লাগানো হয়েছে। সবকিছু সেখানে ঘন সবুজ বন সৃষ্টি করে সেখানকার জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর হয়ে পড়া এই জলাশয়টি পুনঃখননের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যেও স্থানীয় পরিবেশের উন্নতি ঘটেছে এবং সৃষ্টি হয়েছে এক অতুলনীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের। এটি কেবল পরিযায়ী পাখিকেই আকর্ষণ করছে না, বরং সব বয়সী পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদেরও মুগ্ধ করছে।
ভারাড়দহ বিল এখন পাখির কলকাকলিতে মুখরিত; আর বিলের পাড়জুড়ে কাঠ, ফল, ভেষজ ও ফুলগাছের ঘন সবুজ বন; সবমিলিয়ে যেনো মনোমুগ্ধকর ও মনোরম দৃশ্যের অবতারণা করেছে।
তিনি আরও বলেন, ঘন সবুজ গাছপালা ও লতাপাতায় ঘেরা এই বিল দেশীয় ও বিলুপ্তপ্রায় মাছ, কীটপতঙ্গ, স্থানীয় পশুপাখি, জলজ উদ্ভিদ এবং আরও অসংখ্য জীবের জন্য নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে।
বিলের চারপাশে এখন হাজারো পাখি, মাছ, ফড়িং, প্রজাপতি, কাঠবিড়ালি, মৌমাছি, কেঁচো, গিরগিটি, টিকটিকি, ভিমরুল, সাপ, বিটল পোকা, জোনাকি, ব্যাঙ, বুনো পিঁপড়া, বেজি, গোসাপ, শিয়াল, ইঁদুর, খরগোশ, গোবর পোকা ও অন্যান্য প্রাণীর বসবাস।
প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান বলেন, ভারাড়দহ বিলের তীরে নানা রঙের ফুল, পাখি ও গাছপালা মিলে এক অপূর্ব সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে, যা প্রকৃতি ও মানুষের ভালোবাসার মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তুলেছে।
অন্যদিকে, বিলের তত্ত্বাবধায়ক আতিয়ার রহমান জানান, পাড়ে রোপণ করা ২১৩টি দুর্লভ প্রজাতির গাছের মধ্যে রয়েছে নাগেশ্বর, নাগলিঙ্গম, হিজল, তমাল, কাইজেলিয়া, অশোক, গর্জন, আগর, কর্পূর, ধূপ, তেলসুর, নিশিন্দা, সেগুন, সি-গ্রেপ, জয়ফল, জাফরান, তাল, খেজুর, জামরুল, শরিফা, সফেদা, ডুমুর, ত্বিন ফল, মহুয়া, অগ্নিশিখা, জারুল, ছাতিম ইত্যাদি।
তার ভাষায়, গাছগুলো এখন বিলুপ্তপ্রায় দেশি পাখির আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-খঞ্জনা, মৌটুসি, চাতক, জলময়ূর, সরালি, পাতি সরালি, পানকৌড়ি, মাছরাঙা, ফিঙে, শালিক, দোয়েল, ঘুঘু, বক, ডাহুক, কোকিল, বউ-কথা-কও, চোখগেলো, পেঁচা, বুলবুলি, সাহেব বুলবুলি, বসন্তবৌরি, চড়ুই, বনচড়ুই, ফটিকজল, লরিয়াটি ও টি-বার্ড।
আতিয়ার রহমান আরও বলেন, বর্তমানে ভারাড়দহ বিলের পানিতে মলা, ঢেলা, দাড়কিনা ও চেলার মতো দেশি প্রজাতির মাছ এবং নানা ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রচুর উপস্থিতি দেখা যায়।
বিলে ঘুরতে আসা স্কুলশিক্ষার্থী আরমান হোসেন (১৫) ও মালিহা বেগম (১৫) এবং কলেজশিক্ষার্থী সুমি খাতুন (১৭) ও গুলনাহার বানু (১৮) জানান, পুনরায় খনন করায় এই বিলে হারিয়ে যাওয়া বাস্তুতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত হয়েছে এবং প্রকৃতিতেও ভারসাম্য ফিরে এসেছে।
দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলা থেকে ঘুরতে এসেছেন বুলবুল আহমেদ (২৮) ও কাকলী বেগম (২৫) দম্পতি। তারা জানান, ভারাড়দহ বিলটি এখন দেশীয় প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় কীটপতঙ্গ, মাছ, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
বুলবুল আহমেদ বলেন, পুনরুজ্জীবিত জীববৈচিত্র্য নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বলটি আক্ষরিক অর্থেই একটি ইকোপার্ক বা বোটানিক্যাল গার্ডেনে পরিণত হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের খাল খনন কর্মসূচির আওতায় ‘ভারাড়দহ বিল’ পুনঃখনন ও বনায়নের মাধ্যমে অর্জিত সাফল্যের উদাহরণ সারা দেশে অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন দর্শনার্থীরা।
পরিবেশবাদী ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় পরিবেশ যখন হুমকির মুখে, ঠিক সেই সময়ে পুনরুদ্ধারকৃত ভারাড়দহ বিল বাস্তুতন্ত্রকে কার্যকরভাবে পুনরুজ্জীবিত করছে।
বিরল প্রজাতির উদ্ভিদরাজি বিলের চারপাশে এক সমৃদ্ধ ও গভীর সবুজ বনভূমি এবং অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য তৈরি করেছে। ফলে এটি পাখি, দেশীয় প্রাণী, ছোট মাছ, কীটপতঙ্গ, শামুক, শৈবাল, শ্যাওলা এবং বিভিন্ন জলজ ও ভাসমান উদ্ভিদের নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে।
ড. তুহিন ওয়াদুদ আরও বলেন, একই স্থানে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির গাছপালা, পাখি ও প্রাণীর উপস্থিতি কেবল বিলের সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, বরং এটিকে গবেষণাকাজের জন্য একটি অনন্য কেন্দ্রেও পরিণত করেছে। সূত্র: বাসস
আরটিভি/আইএম



