
ঢাকার ধামরাইয়ের পাঠানটোলা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের মারধর, অভিভাবকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, প্রাইভেট পড়তে চাপ দেওয়া, উপবৃত্তি বণ্টনে অনিয়ম এবং পরীক্ষায় পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে কয়েকটি বিষয়ে প্রধান শিক্ষক সামান্তা খানও অভিযোগ করেছেন এসব শিক্ষকদের বিরুদ্ধে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়া শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পায়। অন্যদিকে প্রাইভেট না পড়ানো শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় কম নম্বর দেওয়া, ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো এবং বিভিন্নভাবে হয়রানি করার ঘটনা ঘটে।
এক অভিভাবক অভিযোগ করেন, তার মেয়ে বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট না পড়ায় তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করা হয়েছে। একবার রোমেনা পারভিন নামে এক শিক্ষক তার মেয়েকে মারধর করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তার ভাষ্য, মেয়ের শরীরে আঘাতের দাগ দেখে তিনি বিদ্যালয়ে গিয়ে বিষয়টি কয়েকজন শিক্ষককে জানান। পরে প্রধান শিক্ষকের কাছে অভিযোগ করতে চাইলে তাকে যেতে দেওয়া হয়নি।
ওই অভিভাবকের আরও অভিযোগ, আরেক শিক্ষক তার মেয়েকে মারধরের পর অন্য শিক্ষার্থীদের সামনে বলেন, ওর তো বাবাই নেই। এতে মেয়েটি মানসিকভাবে কষ্ট পায় এবং টিফিনের সময় স্কুল থেকে বাড়ি চলে যায় বলে জানান তিনি।
উপবৃত্তি নিয়েও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন অভিভাবক। তাদের একজন জানান, তার মেয়ে পাঁচ বছর ধরে বিদ্যালয়ে পড়লেও একবারও উপবৃত্তি পায়নি। তার অভিযোগ, শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়া কয়েকজন শিক্ষার্থী উপবৃত্তি পেলেও তার মেয়ে পায়নি। এ বিষয়ে তিনি শিক্ষকদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও সন্তোষজনক উত্তর পাননি।
ওই অভিভাবক আরও জানান, তিনি গার্মেন্টসে চাকরি করেন এবং একাই মেয়েকে বড় করছেন। তার মেয়ের বাবা নেই। তার প্রশ্ন, আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও তার মেয়ে কেন উপবৃত্তি থেকে বঞ্চিত হবে। তিনি বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত যোগ্য শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
আরেক অভিভাবক জানান, তার মেয়েকে আগে বিদ্যালয়ের অন্য এক শিক্ষকের কাছে পড়ানো হতো। পরে আব্দুল ওহাব নামে এক শিক্ষক তাকে নিজের কাছে পড়াতে বলেন। মেয়েটি তার কাছে পড়ানো বন্ধ করার পর পরীক্ষায় দুই বিষয়ে ফেল করে। ওই অভিভাবকের অভিযোগ, শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়া শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার বিষয়ে বাড়তি সহায়তা দেওয়া হয়।
এক শিক্ষার্থীর ভাষ্যও একই ধরনের। সে জানায়, অন্য শিক্ষকের কাছে পড়লে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার এবং কম নম্বর দেওয়ার ভয় দেখানো হতো। ভালো উত্তর লিখলেও তা কেটে দেওয়া হতো। তাদের নির্দিষ্ট শিক্ষকের কাছেই পড়তে বলা হতো বলে দাবি করে ওই শিক্ষার্থী।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সামান্তা খান ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সেখানে যোগ দেন। তার দাবি, যোগদানের পর থেকেই তিনি বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের বিরোধিতার মুখে পড়েছেন।
তার অভিযোগ, পাঁচজন সহকারী শিক্ষককে নিয়ে বিদ্যালয়ে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী রয়েছে। তাদের মধ্যে সৈয়দ আব্দুল আওয়াল, আব্দুল ওহাব, রোমেনা পারভিন ও জাফিয়া আক্তারের নাম উল্লেখ করেন তিনি।
সামান্তা খানের অভিযোগ, এই শিক্ষকরা দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন এবং প্রধান শিক্ষককে স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে দেননি। বিদ্যালয়ের অর্থ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের কারণেও দীর্ঘ সময় উন্নয়নকাজ হয়নি বলে দাবি তার।
প্রধান শিক্ষকের অভিযোগ, রোমেনা পারভিন শিক্ষার্থীদের তার কাছে প্রাইভেট পড়তে উৎসাহিত বা বাধ্য করতেন। প্রাইভেট না পড়লে মারধর, কম নম্বর দেওয়া এবং পরীক্ষায় ফেল করানোর ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আবার তার কাছে প্রাইভেট পড়া শিক্ষার্থীদের বেশি নম্বর দেওয়ার অভিযোগও করেন সামান্তা খান।
তিনি বলেন, অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী খাতার একটি অংশ পুনর্মূল্যায়ন করতে গিয়ে রোমেনা পারভিনের দেওয়া নম্বরে অনিয়ম ধরা পড়ে। এ নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর তার ওপর চাপ সৃষ্টি ও হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আব্দুল ওহাবের বিরুদ্ধেও নিয়মিত ক্লাস না নেওয়ার অভিযোগ করেন প্রধান শিক্ষক। এ বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করলে তিনি ক্ষিপ্ত হন এবং একপর্যায়ে সবার সামনে তাকে আক্রমণ করেন বলে দাবি করেন সামান্তা খান।
প্রধান শিক্ষক আরও অভিযোগ করেন, তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপপ্রচার চালানো হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং একাধিক ভুয়া ও মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করা হয় । এসব ঘটনার পেছনে বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও তাঁদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের দায়ী করেন তিনি।
সামান্তা খান জানান, তিনি বিসিএসের মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নত করার চেষ্টা করছেন। তার ভাষ্য, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের স্বার্থে নিয়ম মেনে বিদ্যালয় পরিচালনা করাই তার লক্ষ্য।
তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ ভিত্তিহীন। বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষিত আছে এবং প্রয়োজন হলে তা দেখানো যাবে।
প্রধান শিক্ষক সামান্তার বিরুদ্ধে অভিযোগকারী শিক্ষক নিমাই চাঁদ সন্যাসীর কাছে অভিযোগ সম্পর্কে জানতে ফোন দিলে তিনি বলেন, অভিযোগে কী লিখা আছে আমি পড়ে দেখিনি, রাতে আমার বাসায় এসে আমাকে স্বাক্ষর দিতে বলায় আমি স্বাক্ষর দেই। কে আপনাকে স্বাক্ষর দিতে বলেছে এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এটা নিয়ে তদন্ত হচ্ছে আমি কিছু বলতে পারব না।
এছাড়া এই অভিযোগে স্বাক্ষর দেওয়া আরোও কয়েকজন শিক্ষককে ফোন দিলে তারাও একই ধরণের কথা বলেন।
অভিযোগে স্বাক্ষর করা আরেক শিক্ষক নাসির বলেন, আমার বাড়িতে রাতে আসে আব্দুল ওহাব, আকরাম হোসেন, আওয়াল তারা আমাকে বলে পাঠানটোলা স্কুলে চাকরি করতে হলে এই চিঠিতে স্বাক্ষর করতে হবে। জোড় করে আমার স্বাক্ষর নিয়েছে।
অভিযুক্ত শিক্ষক রোমেনা পারভিনকে ফোন দিলে তার মেয়ে ফোনটি রিসিভ করেন, এ সময় প্রতিবেদক তার মাকে ফোনে চাইলে ঐ শিক্ষকের মেয়ে উত্তর দেন সাংবাদিকদের সাথে আমার মা কথা বলবেন না।
অভিযুক্ত আরেক শিক্ষক আব্দুল ওহাব বলেন, আগে আমরা প্রাইভেট পড়াতাম ইউএনও স্যার না করাতে আমরা এখন পড়াই না।
অন্যদিকে অভিভাবকরা বলছেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমান আচরণ নিশ্চিত করা, প্রাইভেট পড়ানোর নামে কোনো ধরনের চাপ বন্ধ করা এবং উপবৃত্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
এ বিষয়ে ধামরাই উপজেলার সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা পলী রানী সরকার বলেন, স্যার বদলি হওয়ার সময় আমার কাছে একটা অভিযোগ দিয়ে গেছেন, সেটার ভিত্তিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আরটিভি/এমএইচজে


