
দরজায় কড়া নাড়ছে বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে টাঙ্গাইলের ১৩৫৭টি মণ্ডপে দেবী দুর্গার অনিন্দ্যসুন্দর রূপ ফুটিয়ে তুলতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে প্রতিমা শিল্পীদের কর্মব্যস্ততা। আর এ দুর্গোৎসব পালনে জেলার ঘরে ঘরে চলছে উৎসবের আমেজ।
শরতের এ সার্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে টাঙ্গাইলের মণ্ডপে মণ্ডপে শিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায় মাটির প্রতিমা হয়ে উঠছে অপরূপ সৌন্দর্য্যে। একইসঙ্গে দুর্গোৎসবকে পরিপূর্ণ করতে দিনরাত মন্দিরগুলোতে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি।
ইতোমধ্যে বাঁশ, কাঠ, খড় ও মাটি দিয়ে দেবীদুর্গাসহ লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের অবয়ব গড়ার প্রাথমিক কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কোথাও চলছে মাটির প্রলেপ ও কারুকাজের শেষ ধাপ, আবার কোথাও প্রতিমায় দেওয়া হচ্ছে রং-তুলির শেষ আঁচড়। এরপর প্রতিমাগুলো অলংকার ও সাজ সজ্জায় সজ্জিত করে মণ্ডপে নেওয়া হবে।
আগামী ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্যদিয়ে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এরআগে ১৫ অক্টোবর মহাপঞ্চমী এবং ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজা, ১৭-১৮ অক্টোবর মহাসপ্তমী এবং ১৯ অক্টোবর মহাঅষ্টমী অনুষ্ঠিত হবে। ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের পরিসমাপ্তি ঘটবে।
শারদীয় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে জেলার ১২টি উপজেলার প্রতিটি পূজামণ্ডপে সাজ সজ্জার পাশাপাশি সনাতন ধর্মালম্বীদের মাঝে ঘরে ঘরে চলছে পূজা আর উৎসবের আমেজ। কিছুদিন পর পূজার ঘণ্টা ধ্বনি বেজে উঠলে ভক্ত-ভক্তিমায় মুখরিত হয়ে উঠবে গোটা জেলা। সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, এ বছর দুর্গাদেবী ঘোড়ার পিঠে চড়ে মর্ত্যে আগমন করবেন। ফিরে যাবেন নৌকায় চড়ে।
জেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্ট সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মোট ১৩৫৭টি পূজা মণ্ডপে অনুষ্ঠিত হবে শারদীয় দুর্গোৎসব। এরমধ্যে মধুপুর উপজেলায় ৬০টি, ধনবাড়ীতে ৩৬টি, ঘাটাইলে ৯৪টি, কালিহাতীতে ১৮২টি, গোপালপুরে ৫৭টি, ভুয়াপুরে ৩৪টি, টাঙ্গাইল সদরে ২৩৩টি, নাগরপুরে ১৩৮টি, দেলদুয়ারে ১২৮টি, মির্জাপুরে ২৭০টি, বাসাইলে ৮১টি এবং সখিপুরে ৪৪টি পূজা মন্ডপে অনুষ্ঠিত হবে দুর্গাপূজা।
সরেজমিনে টাঙ্গাইল শহরের শ্রী শ্রী কালিবাড়ি, থানাপাড়া, সাবালিয়া, রেস্ট্রিপাড়া, কলেজপাড়া, প্যারাডাইস পাড়া পূজা মন্দির পরিদর্শনে দেখা যায়, প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষের দিকে। প্রতিমা তৈরির কারিগররা বাঁশ ও কাঠের কাঠামোর ওপর খড় দিয়ে দূর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, কার্তিক ও গণেশের প্রতিমার অবয়ব তৈরির পর এখন চলছে রং তুলির আঁচড়। শিল্পীরা নিখুঁতভাবে প্রতিমার চোখ, মুখমণ্ডল, পোশাক ও বিভিন্ন অলংকারের নকশা ফুটিয়ে তুলতে অবিরাম শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন।
প্রতিমা তৈরির কারিগর নিশি কান্ত পাল বলেন, প্রতিবছরই এ সময়টাতে তারা অধীর আগ্রহে দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরির কাজের অপেক্ষায় থাকেন। এরমধ্যেই দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরির মাটির কাজ প্রায় শেষ। এখন রঙের কাজ চলছে।
তিনি জানান, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির কারণে এখন প্রতিমা তৈরিতে লাভ অনেকটা কমে গেছে। এ বছর আমি পাঁচটি প্রতিমার কাজ করছি। টাঙ্গাইল শহরের বড় কালীবাড়ি ও রেজিস্ট্রি পাড়া, সিরাজগঞ্জ, নোয়াখালী ও ফরিদপুরে আলফাডাঙ্গায় প্রতিমা তৈরির কাজ করছি। ছোট বড় প্রতিমা তৈরিতে কাজ ভেদে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি নেন তিনি।
এদিকে, জেলার মির্জাপুর উপজেলার কুমুদিনী হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা এশিয়াখ্যাত দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার নিজ বাড়ির পূজা মণ্ডপটি উপজেলার সর্ববৃহৎ মণ্ডপ। এ মণ্ডপে দেশ বিদেশের ভিআইপিদের আগমনে মুখরিত হয়ে উঠে। এ মণ্ডপের প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার নৌহাটা গ্রামের চন্দ্র পালের ছেলে অচিন্ত পাল।
প্রতিমা শিল্পী অচিন্ত পাল জানান, তিনি মির্জাপুর সাহাপাড়া মধ্যপাড়া সার্বজনিন মণ্ডপে প্রতিমা তৈরি করছেন। এতে তিনি এক লাখ টাকা পারিশ্রমিক নেবেন। এ ছাড়া তিনি টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইলের লোকনাথ মন্দির, ঝিনাইদহ শহরে ৩টি, মাগুরা ও ফরিদপুর শহরে ২টি মণ্ডপের প্রতিমা তৈরি করেছেন।
জেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সভাপতি অমল ব্যানার্জি বলেন, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে তাদের সব প্রস্তুতি শেষের দিকে। আসন্ন দুর্গাপূজার সার্বিক নিরাপত্তা ও প্রস্তুতি নিয়ে জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশের সঙ্গে উদযাপন কমিটির মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তিনি বলেন, পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি প্রতিটি পূজা মণ্ডপে আমাদের সেচ্ছাসেবক কর্মীও দায়িত্ব পালন করবে। আশা করি প্রতি বছরের মতোই এবারও সবার উপস্থিতিতে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।
জেলা পুলিশ সুপার মুহম্মদ শামসুল আলম সরকার বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা উপলক্ষে নেয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দুর্গাপূজা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে করার লক্ষ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বী নেতৃবৃন্দের সাথে পুলিশ প্রশাসনের নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দুর্গাপূজাকে ঘিরে জেলায় গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। সূত্র: বাসস
আরটিভি/আইএম


