
মমূর্ষ রোগী, কিংবা আহত কোন ব্যাক্তি চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া যেত না। বিনা চিকিৎসায় বাড়িতে মারা যাওয়ার উদাহরণ আছে অসংখ্য। একমাত্র সাঁকো পার হয়ে হাতিয়া উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যেতে হতো তিন গ্রামের মানুষদের। এছাড়া দুর্যোগ মুহূর্তে সাঁকো পার হতে গিয়ে পড়ে অঙ্গহানী হওয়ার মতো ঘটনা আছে অনেক।
উপজেলা সদরের ১০ কিলোমিটার দুরত্বে প্রত্যান্ত অঞ্চলের তিনটি গ্রাম এই সাঁকোর কারণে ছিল অনেকটা বিচ্ছিন্ন। উন্নত যোগাযোগ না থাকায় আধুনিকতার কোন ছোঁয়া লাগেনি এখানে। দীর্ঘ ৫০ বছর পর সাঁকোটি ভেঙ্গে কাঠের ব্রিজ তৈরি করে দিয়েছে প্রশাসন। যা বদলে দিয়েছে তিন গ্রামের চিত্র।
নোয়াখালী হাতিয়ার তমরদ্দি ইউনিয়নের দক্ষিনে কোরালিয়া, পশ্চিম জোড়খালী ও মাইজচরা গ্রামের অবস্থান। প্রায় ১০-১৫ হাজার পরিবারের বসবাস এই তিন গ্রামে। বাসিন্ধাদের তমরদ্দি বাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় যেতে কাটাখালী খাল পার হয়ে যেতে হয়। স্বাধীনতার আগ থেকে এই খালে নির্মাণ করা সাঁকো পার হয়ে মানুষদের আসা যাওয়া করতেন।
স্থানীয়রা জানান, প্রায় দুইশত ফুট দৈর্ঘ এই সাঁকো পার হতে গিয়ে অনেক দুর্ঘটনায় পড়তে হয়েছে। মুমূর্ষ রোগী, বয়স্ক ব্যাক্তি, কোমলমতি শিক্ষার্থী সবাইকে এই সাঁকো পার হয়ে প্রয়োজনে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হতো। দোকানের মালামাল মাথায় বহন করে এপার ওপার করতে হতো। এই দীর্ঘ সময়ে সাঁকো পার হতে গিয়ে অঙ্গহানীর ঘটনা আছে অনেক। শিক্ষার্থীদের সাঁকো থেকে পড়ে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও আছে। মাথায় বহন করে মালামাল পার করতে গিয়ে পঙ্গু হয়েছে কয়েকজন শ্রমিক।
কোরালিয়া গ্রামের খালের পাড়ে বেড়ীর উপর দোকান করেন নুরউদ্দিন শেরআলী (৬০)। আলাপকালে শের আলী জানান, তার দোকানের মালামাল আনতে হয় তমরদ্দি বাজার থেকে। নির্দিষ্ট ভ্যান গাড়ি চালক গাড়িতে মাল নিয়ে এসে খালের ওপারে রেখে মাথায় বহন করে সাঁকো পার হয়ে দোকানে পৌঁছে দেন। গত বছর এভাবে মাল আনতে গিয়ে চিনির বস্তাসহ সাঁকো ভেঙে খালে পড়ে যান নুর ইসলাম নামে এই ভ্যান চালক। এতে তার এক হাত এক পা ভেঙে যায়। ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করেও সুস্থ হননি। এখন পঙ্গু হয়ে ঘরে বসবাস করছেন।
শের আলী আরও জানান, এই সাঁকো পার হয়ে গ্রামের শিক্ষার্থীদের তমরদ্দি উচ্চ বিদ্যালয়ে যেতে হয়। ২০২৫ সালের শেষের দিগে হঠাৎ এক ছাত্রী খালে পড়ে ভেসে যেতে থাকে। সঙ্গে থাকা সহপাঠিদের চিৎকারে দোকান থেকে লোক দৌড়ে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্ধা সিরাজ মিয়া (৮৫) জানান, শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় এই গ্রামে মেয়েদের বিয়েতে অনিহা ছিল অন্যান্য গ্রামের মানুষদের। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই সাঁকো পার হয়ে তমরদ্দি বাজার আসা যাওয়া করেন। দিনের বেলায় আসা যাওয়া করলের রাতে তা মোটেও সম্ভব ছিল না।
তিনি আরও জানান, একবার ছেলে বউয়ের প্রথম সন্তান হওয়ার সময় সমস্যা দেখা দেয়। গ্রামের চিকিৎসকরা দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। সারারাত অপেক্ষা করে সকালে নৌকা দিয়ে খাল পার করে হাসপাতালে যেতে হয়েছে।
সিরাজ মিয়া আরও বলেন, নির্বাচন এলে বিভিন্ন সময় জনপ্রতিনিধিরা আশ্বাস দিলেও পরে তা মনে রাখেনি। সম্প্রতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কোন এক কাজে এই গ্রামে আসতে গিয়ে সাঁকো দেখে থমকে দাড়ান। পরে তিনি নিজে উদ্যোগ নিয়ে কাঠের এই ব্রিজ তৈরি করে দেন। নিজের শেষ সময়ে এসে গ্রামের মানুষের এই কষ্ট লাগাব হওয়া দেখে অনেকটা আবেগ আপ্লুত বৃদ্ধ সিরাজ মিয়া।
সম্প্রতি ব্রিজ টি সরেজমিনে দেখতে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের অনেক লোক এক সঙ্গে জড়ো হয়ে ব্রিজ টি দেখছেন। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই আনন্দে আত্মহারা। শুধু গ্রামের বাসিন্ধারা নয় অন্যান্য জায়গা থেকে দীর্ঘ এই সেতু দেখতে মানুষ আসছেন। দৃষ্টিনন্দন ব্রিজ টি সম্পূর্ণ কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। নিচে সিমেন্টের খুটি দিয়ে তার উপর কাঠের পাটাতন দিয়ে পাশে দেওয়া হয়েছে হাতল। সম্পূর্ণ রঙ দিয়ে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে পুরো ব্রিজ । গ্রামের মানুষ সাইকেল ও মোটরসাইকেল চালিয়ে পারাপার হয়। এ নিয়ে সবার মধ্যে এক ধরনের আনন্দ বিরাজ করছে। তাদের আশা একসময় এই কাঠেল ব্রিজ টিও ইট পাথরের ব্রিজ হবে।
প্রায় ২০ কিলোমিটার দরত্বে সোনাদিয়া থেকে এই ব্রিজ টি দেখতে আসেন আরিয়ান ফরিদ নামে একজন। ফরিদ জানান, লম্বা ব্রিজ টি রঙ দিয়ে সাজানো হয়েছে। দূর থেকে দেখতে অনেকটা সুবিশাল ব্রিজ ের মতো মনে হয়। এটি এখন দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।
এই বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল বলেন, সম্পূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এলাকাটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মানুষের স্বভাবিক চাহিদা পূরণ করার সম্ভব হয়ে উঠছে না। শুধু একটি সাঁকোকে ব্রিজে রপান্তর করে এই অঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। এখানে ইট পাথরের সেতু তৈরি করার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে।
আরটিভি/এমএম



