
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জে পূর্ববিরোধের জেরে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে গ্রামের দুই পক্ষের লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়। আহতরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কিন্তু পরদিন আহত একজন মারা গেছে এমন গুজব ছড়িয়ে প্রতিপক্ষের অন্তত ২৩টি বাড়ি ভাংচুর ও লুটপাট করার অভিযোগ উঠেছে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে এমন ঘটনা ঘটেছে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের দূর্বাকান্দা গ্রামে। অভিযোগ উঠেছে দূর্বাকান্দা গ্রামের বাসিন্দা স্থানীয় ইউপি সদস্য সাইদুল হক ও তার ভাই শামসুল আলম প্রতিপক্ষের সোহেল মিয়ার পক্ষের লোকজনের বাড়িঘর ভাংচুর ও লুটপাট করেছেন।
প্রতিপক্ষের বাড়িঘর ভাংচুর হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে অভিযুক্ত শামসুল আলম বলেছেন, মৃত্যুর গুজবে এমন অনাকাঙ্খিক ঘটনা ঘটেছে। অনেক চেষ্টা করেও উত্তেজিত লোকজনকে আটকানো সম্ভব হয়নি।
জগন্নাথপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম বললেন, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দূর্বাকান্দা গ্রামের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরবর্তী সময়ে কিছু বাড়ি-ঘর ভাংচুর করা হয়েছে। আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক মাস আগে রাতে আধারে নৌকা দিয়ে যাওয়ার সময় দূর্বাকান্দা গ্রামের ইউপি সদস্য সাইদুল হকের চোখে টর্চের আলো ফেলেছিলেন গ্রামের সোহেল মিয়া। তখন ইউপি সদস্য সাইদুল হক সোহেল মিয়াকে গালিগালাজ করেছিল। এনিয়ে দুই জনের মধ্যে বিরোধ চলছিল। কয়েক দিন আগে কিছু কাগজপত্র দেখানোর নাম করে ডেকে নিয়ে ইউপি সদস্যকে মারপিট করেন সোহেল মিয়ার লোকজন। এই ঘটনার জের ধরে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে ইউপি সদস্য সাইদুল হক ও সোহেল মিয়ার লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়।
উভয়পক্ষের আহতরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কিন্তু শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে ইউপি সদস্য সাইদুল হকের পক্ষের সাজু মিয়া (৬০) নামের একজন মারা গেছে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে প্রতিপক্ষের অন্তত ২৩টি বাড়ি ভাংচুর ও লুটপাট করে ইউপি সদস্য সাইদুল হক ও তার ভাই শামসুল আলমের লোকজন। লুটপাট ও ভাংচুরের পর বাড়ি-ঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বিদ্যুতের মিটার পর্যন্ত ভেঙে ফেলা হয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ভাঙাচোরা আসবাবপত্র, গৃহস্থালী জিনিসপত্রের মধ্যে চরম নিাপত্তাহীনতায় পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির নারী ও শিশুরা।
দূর্বাকান্দা গ্রামের দশ বছরের এক শিশু জানিয়েছে, প্রতিপক্ষের পুরুষদের সাথে মহিলারাও লুটপাটের জিনিসপত্র নিতে এসেছিল। পুরুষেরা ভাঙচুর করেছে আর মহিলারা ব্যাগে ভরে মালপত্র নিয়ে গেছে।
লায়েছ মিয়ার স্ত্রী ছালেমা বেগম বলেন, রাজন মিয়া, পালিশ মিয়া ও সামছুল মিয়া গ্রামের তাদের পক্ষের মানুষ নিয়ে ধান-চাল, টাকা-পয়সা, হাঁস-মুরগী, হাড়ি-পাতিলসহ ঘরের কোন জিনিস নিতে বাকী রাখেনি। সব জিনিসপত্র নিয়া গেছে।
জমিরুন নেছা, শিরিনা বেগমসহ বেশ কয়েকজন নারীর অভিযোগ করে জানান, বৃহস্পতিবারের (৫ নভেম্বর) মারামারিকে কেন্দ্র করে শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে শামসুল মিয়ার নির্দেশে পালিশ মিয়া, রাজন মিয়াসহ ৩০-৪০ জন মানুষ বাড়ি-ঘরে হামলা করে সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে। সবার স্বর্ণালংকার, টাকা-পয়সা ও দামী জিনিসপত্র নিয়ে গিয়েছে। পানি খাওয়ার কলস, রান্না-বান্নার হাড়ি-পাতিল, ধান-চালসহ সব কিছু নিয়ে গেছে, বস্তার রাখা সারা বছরের মজুতের চাল ও জিনিসপত্র নষ্ট করে দিয়ে গেছে। ঘরের বেড়া, চালসহ সব কিছুই ভাংচুর করে কারেন্টের মিটারও ভেঙে চুরমার করে শেষ করে দিয়েছে৷
গ্রামের মহিলারা কান্নাজড়িত কণ্ঠে আরও জানান, শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে সবার বাড়িতেই রান্না-বান্না চলছি। এসময় হটাৎ করে অনেক একত্রে তাদের বাড়ি-ঘরে হামলা চালায়। মানুষ সকালের ভাত খাওয়ার সময় পাইনি। বাড়ি-ঘর ভাংচুর করার পাশাপাশি ধান-চাল,গরু-বাছুর, নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার, মূল্যবান সকল জিনিসপত্র লুট করে নেওয়া হয়েছে। লুটপাট চলাকালীন সময়ে বাড়িতে থাকা মহিলাদের মারপিট করা হয়েছে।
কামাল মিয়ার স্ত্রী হানিফা বলেন, সকালে সবার ঘরে রান্না-বান্না চলছিল, কেউ ভাত খাওয়ার সময় পায়নি। হটাৎ কইরা অনেক মানুষ চিৎকার কইরা আইয়া হামলা করছে। আমার ছেলের বউ গর্ভবর্তী, তারে মারপিট করেছে, টাকা পয়সা, সোনা-দানা সব লইয়া গেছে। রামদা দিয়ে আমাদের ভয় দেখাইছে আমরা সবাই জান নিয়ে বাড়ি চাইয়া পালাইয়া গেছি। ঘরের ফ্রিজসহ যা জিনিসপত্র ভাইঙ্গা চুরমার করেছে।
শাহানারা বেগম বলেন, মাটিতে ফালাইয়া আমারে লাটি দিয়ে গুতা দিয়েছে। আমার গলার স্বর্নের চেইন ছিইড়া গেছে। আমি এখন চলতে পারছি না। ঘরে কিছু নেই, দুইটি তালা মেরে রেখেছিলাম রড দিয়ে তালা ভেঙে সবকিছু নিয়া গেছে। তিনি অভিযোগ করেন প্রতিপক্ষ সামছুল আলম, পালিশ মিয়ার নেতেৃত্বে লুটপাট হয়েছে।
অভিযুক্ত পালিশ মিয়া বলেন, বৃহস্পতিবারের ঘটনায় আমি জড়িত ছিলাম না, আমি ঢাকা ছিলাম। শুক্রবার (৫ নভেম্বর) সকালে বাড়িতে এসে ঘুমিয়েছিলাম। হঠাৎ শুনি আবার গ্রামে মারামারি লাগছে। আমি বাড়িঘর ভাঙচুরের সাথে জড়িত নই।
ইউপি সদস্য সাইদুল হকের ভাই অভিযুক্ত শামসুল আলম বললেন, শুক্রবার (৫ নভেম্বর) সকালের আমরা সবাই সমবেত হয়েছিলাম। এমন সময় হটাৎ করে খবর রটে যায় আহত একজন মারা গেছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই মানুষ উত্তেজিত হয়ে এসব কাজ করেছে। যা ন্যায়সঙ্গত ও উচিৎ হয়নি। আমরা চেষ্টা করেছি কিন্তু সবাইকে আটকানো সম্ভব হয়নি এবং ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। আশা করি আর কিছু হবে না।
শান্তিগঞ্জ থানার ওসি অলিউল্লাহ বলেন, দূর্বাকান্দা গ্রামে সংঘর্ষের পরের দিন কিছু ঘর-বাড়ি ভাংচুর করা হয়েছে জানা গেছে। তবে এখনও কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেবো। তবে গ্রামের খোঁজ-খবর রাখা হচ্ছে।
সংঘর্ষের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি বললেন, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের লোজনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয়পক্ষের বেশ কয়েক জন আহত হয়েছে। খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। এলাকাটি দুর্গম, থানা অনেক দূরে, সরাসরি যাওয়া যায় না। গ্রামের কিছু বাড়ি-ঘর ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে, খবর পেয়ে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। অপরাধের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরটিভি/জেএমএ




