
লোক সংগীতের পুরোধা ধামাইল গানের প্রবর্তক লোককবি রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থের স্মৃতি বিজড়িত সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামে রাধারমণ স্মৃতি কমপ্লেক্সের জায়গা নির্ধারণ করার ১১ বছর পরও স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণ কাজ উপেক্ষিত হওয়ায় সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও চাপা অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এদিকে, গত তিন বছর ধরে নানা মত বিরোধে রাধারমণের জন্মভিটা কেশবপুর গ্রামে ৩০ বছর ধরে পালিত হওয়া উৎসবও হচ্ছে না। তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাধারমণ দত্তের প্রয়াণ দিবস যথাযথ মর্যাদায় পালন হচ্ছে।
রাধারমণ অনুরাগীরা জানান, ২০১৫ সালে বৈষ্ণব পদাবলির মহারাজা লোককবি রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থের মৃত্যু শতবার্ষিকী উপলক্ষে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রাষ্ট্রীয়ভাবে তিনদিনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। জন্মভূমি জগন্নাথপুর উপজেলায় এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী দিনে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী স্থানীয় সংসদ সদস্য এমএ মান্নান অতিথি হিসেবে বক্তব্য বক্তব্যে জগন্নাথপুরে রাধারমণ কমপ্লেক্স নির্মাণের ঘোষণা দেন। সভা শেষে দুই মন্ত্রী কেশবপুর বাজার সংলগ্ন ভূমিতে রাধারমণ দত্তের কমপ্লেক্সের সাইনবোর্ড সাঁটিয়ে কমপ্লেক্সের জায়গার স্থান নির্ধারণ করেন। পরবর্তীতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব সহ বিভিন্ন পদের কর্মকর্তা সরেজমিনে কমপ্লেক্সের জায়গা পরিদর্শন করে রাধারমন কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু অদৃশ্য কারণে থমকে আছে রাধারমণ দত্ত স্মৃতি কমপ্লেক্স। ২০১৫ সালের আগে সরকারি ভাবে উপজেলায় রাধারমণ দত্তের জন্ম কিংবা প্রয়াণ দিবস পালিত হয়নি। ১৯৯৪ সালে রাধারমণ সমাজ কল্যাণ সাংস্কৃতিক পরিষদ নামে একটি সংগঠন গঠন করে এলাকার সাংস্কৃতিক অনুরাগীরা রাধারমণ দত্তের প্রয়াণ দিবস পালন করে আসছেন। উক্ত অনুষ্ঠানে প্রতি বছর জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা ও রাধারমণ অনুরাগীরা উপস্থিত থেকে বক্তব্য দিতেন। ২০২৪ সালে সরকারের পট পরিবর্তনে কেশবপুর গ্রামে প্রয়াণ দিবস পালিত হয়নি। পরবর্তীতে কমপ্লেক্সের জায়গা নিয়ে কেশবপুর গ্রামের দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাধারমণ দত্তের প্রয়াণ দিবস উপজেলা সদরে পালনের উদ্যোগ নেয়া হয়। গত বছর রাধারমণ সংস্কৃতি চর্চা নামে উপজেলা প্রশাসন দুই দিন উপজেলা সদরে উৎসব পালন করে।
রাধারমণ সমাজ কল্যাণ সাংস্কৃতিক পরিষদের সহ-সভাপতি আছকির আলী জানান, রাধারমন দত্তের ভিটে মাটিতে কমপক্ষে ৩০ বছর ধরে আমরা রাধারমণ দত্তের প্রয়াণ দিবস পালন করে আসছি। এখন আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে রাধারমণ দত্তের প্রয়াণ দিবস পালন করতে দেয়া হচ্ছে না। রাধারমণ দত্ত আমাদের হৃদয়ে আছেন। আমরা তা়র সৃষ্টি কর্ম লালন করি। আমরা প্রশাসনের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে দাবি জানিয়েছিলাম; রাধারমণ দত্তের কমপ্লেক্সের নির্ধারিত জায়গায় গত ৩০ বছরের ধারাবাহিকতায় পালিত হওয়া জায়গায় অনুষ্ঠান করতে। তিনি বলেন, প্রশাসনের অনুমতি পেলে আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে রাধারমণ দত্তের প্রয়াণ দিবস উৎসব করতে চাই।
রাধারমণ স্মৃতি সংঘের উপদেষ্টা আশীষ কুমার দে বলেন, রাধারমণ দত্তের শেষস্মৃতি চিহ্ন সমাধি মন্দির সংরক্ষণ ও সৌন্দর্য বর্ধনে সরকারি উদ্যাগ জরুরি। প্রতি বছর সমাধি মন্দির প্রাঙ্গণে আমরা তার প্রয়াণ তিথিতে কীর্তনের আয়োজন করে থাকি। প্রতিদিন দেশ বিদেশ থেকে রাধারমণ অনুরাগীরা সমাধি মন্দির দেখতে এসে হতাশ হয়ে ফিরেন। তাই দ্রুত রাধারমণ দত্তের শেষ স্মৃতি চিহ্ন সমাধি মন্দির সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানাই।
রাধারমণ স্মৃতি সংসদের সভাপতি আফরোজ আলী জানান, রাধারমণ দত্ত কমপ্লেক্সের জায়গা নির্ধারণের ১১ বছর অতিবাহিত হলেও রাধারমণ দত্তের কমপ্লেক্সে না হওয়ায় আমরা ব্যথিত। আমরা দ্রুত কমপ্লেক্স বাস্তবায়নের পাশাপাশি রাধারমণ দত্তের সমাধি মন্দির সংরক্ষণের দাবি জানাই।
এব্যাপারে জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসলাম উদ্দিন বলেন, রাধারমণ দত্তের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসন ও পৌর প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা দুই দিন ব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। জাতীয়ভাবে ঢাকা ও জেলা শহরে দিবসটি পালিত হচ্ছে। কেশবপুর গ্রামে রাধারমণ দত্ত কমপ্লেক্সে নির্মানের বিষয়ে সর্বশেষ বিস্তারিত কোন তথ্য জানা নেই।
প্রসঙ্গত, রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থ ১৮৩৩ সালে জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯১৫ সালে তিনি প্রয়াত হন। তিনি দুই হাজারের বেশি গান রচনা করে দেশের লোকসংস্কৃতির ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন।
আরটিভি/ এসকেডি




