ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

দুই স্কুলে ‘হরিলুট’: ১৪১ ভুয়া শিক্ষক ও উধাও ১৫ কোটি

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬, ০১:৩২ পিএম
প্রতীকী ছবি

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় এবং ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১৪১ শিক্ষকের নিয়োগ অবৈধ। তাদের কেউ করেছেন অনার্স পাশ সনদ জালিয়াতি, আবার কেউ দেখিয়েছেন ভুয়া নিয়োগ বোর্ড, আবার অনেকে ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদ এবং বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসি) সনদ জালিয়াতিসহ নানা প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন।

সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষক আছেন ১৩৩ জন। এর মধ্যে জালিয়াতির মাধ্যমে শিক্ষক হয়েছেন ৬৮ জন। এছাড়া অবৈধভাবে ইচ্ছেমতো বেতন-ভাতা নেওয়া, কেনাকাটায় অনিয়ম, হিসাব জালিয়াতিসহ বিভিন্ন দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট করা হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি টাকা।

অন্যদিকে বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৭৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৭৩ জনের নিয়োগ অবৈধ হিসেবে প্রমাণ পেয়েছে ডিআইএ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুটির তদন্ত প্রতিবেদন সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) পরিচালক এম এম সহিদুল ইসলাম মঙ্গলবার (১৯ মে) গণমাধ্যমকে বলেন, বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অবৈধ শিক্ষক নিয়োগ এবং সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে জালিয়াতিসহ প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অনিয়মের প্রতিবেদনটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

জানা গেছে, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ পর্যন্ত দেড় হাজার শিক্ষকের জাল সনদ চিহ্নিত হয়েছে। এসব শিক্ষককে শোকজ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। জাল সনদধারী শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাবদ ৩৭৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। যা এসব শিক্ষকদের কাছ থেকে ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিআইএ পরিচালক।

ডিআইএর প্রতিবেদনে বলা হয়, সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. সাহাব উদ্দিন মোল্লা এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. দেলুয়ার হোসেন ২০১৪ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দ্বিগুণ হারে উৎসব ভাতা গ্রহণ করেছেন। সাহাব উদ্দিন মোল্লা অবৈধভাবে বেসরকারি বেতন বাবদ ৯৭ লাখ টাকা এবং দেলুয়ার হোসেন প্রায় ৮০ লাখ টাকা নিয়েছেন, যা ফেরতযোগ্য। এছাড়া দেলুয়ার হোসেনের নিয়োগ বিধিসম্মত না হওয়ায় আরও প্রায় ৩৮ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতযোগ্য হবে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে অবৈধভাবে ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে, যা ফেরত নিতে প্রতিবেদনে সুপারিশ করেছে ডিআইএ।

প্রতিষ্ঠানটির সংরক্ষিত তহবিলের সনদ যাচাইয়ে দেখা গেছে, ফার্স্ব ফিন্যান্স লিজিং কোম্পানিতে ৫ কোটি ৭২ লাখ ২৫ হাজার ৩৫৬ টাকা, পিপলস লিজিং কোম্পানিতে ২ কোটি ১২ লাখ ১২ হাজার ৪৯ টাকা এবং এবং জিএসপি ফিন্যান্স কোম্পানিতে ৪ লাখ টাকার এফডিআর করা হয়েছে; যা বিধিসম্মত হয়নি। বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা উত্তোলন করে বিধি মোতাবেক তপশিলি ব্যাংকে এফডিআর করতে হবে।

এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির জেনারেটর ও লিফট কেনা এবং বিভিন্ন মেরামতকাজ, অভিভাবক শেড নির্মাণে বড় ধরনের অনিয়ম পেয়েছে ডিআইএ। ক্যান্টিন থেকে প্রতি মাসে ভাড়া পেলেও সেসংক্রান্ত কোনো তথ্য সরবরাহ করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানের জন্য কেনা পাঁচটি ল্যাপটপের মধ্যে দুটি ল্যাপটপ পাওয়া গেছে। এমনকি প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার সময় দেড় লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাবেক সভাপতির ছেলে শেখ এমরানুল আলম ২০২৩ সালের মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে প্রতি মাসে ৪২ হাজার টাকা করে ৩ লাখ ৩৬ হাজার টাকা অবৈধভাবে নিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন শ্রেণির কোচিং বাবদ আদায় করা টাকার রসিদ, টাকা ব্যয়ের রেকর্ড পরিদর্শনকালে সরবরাহ করা হয়নি। এ ব্যাপারে জানতে প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. দেলুয়ার হোসেনকে মোবাইলে একাধিক ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

আরও পড়ুন

এদিকে বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের কলেজ শাখায় ৬১ জন শিক্ষকের সবারই নিয়োগ অবৈধ। অন্যদিকে স্কুল শাখা ১২ শিক্ষকের নিয়োগের অবৈধ। ডিআইএর প্রতিবেদন অনুযায়ী- প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ তার পরিবারের ১১ জনকে নিয়োগ দিয়েছেন, যাদের সবারই সনদ জাল। এর মধ্যে স্ত্রী, ছেলে, ছেলের বউ, মেয়ে, বোন, বোনের জামাই, শ্যালকের স্ত্রী, চাচাতো ভাইবোন; বাদ পড়েননি নিজের ব্যক্তিগত গাড়িচালকও। এমনকি অধ্যক্ষ ইমদাদুল হকেরই সব সনদ জাল। শিক্ষক নিয়োগে ইমদাদুল হক নিয়েছেন ঘুষ। নিয়োগ দেওয়ার পর তাদের বেতন-ভাতার একটা অংশও নিয়ে নিতেন তিনি। নিয়োগ পাওয়া এই ভুয়া ব্যক্তিদের দেওয়া বেতন-ভাতা বাবদ সরকারি কোষাগারের ৫ কোটি ৫৭ লাখ ৫৬ হাজার টাকা ফেরত আনতে সুপারিশ করেছে ডিআইএ। আর ইমদাদুল হকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলার সুপারিশ করা হয়েছে।

জানা গেছে, ইমদাদুল হকের স্ত্রী ইসমেতারাকে অফিস সহায়ক, ছেলে ইমরুল হাসান কায়েস ল্যাব সহকারী, ছেলের বউ সুস্মিতা আক্তার জেরিনকে ল্যাব সহকারী, মেয়ে ইসরাত জাহানকে ল্যাব সহকারী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।

এছাড়া বোন আসমা খাতুনকে কৃষিশিক্ষার সহকারী শিক্ষক, বোনের জামাই আজিজুল হককে বাণিজ্য বিভাগের প্রভাষক, শ্যালকের স্ত্রী শেফালি খাতুনকে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন ইমদাদুল। চাচাতো ভাই কামরুল ইসলামকে ব্যাংকিং বিভাগের প্রভাষক এবং চাচাতো বোন শাহনাজ পারভীনকে নিয়োগ দেন প্রভাষক হিসেবে। তার ব্যক্তিগত গাড়িচালকও এই নিয়োগ থেকে বাদ যাননি।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
‘আমিও তো সন্তানহারা, স্ত্রীকে কীভাবে সান্ত্বনা দেব’
অপ্রতিমের হত্যার ঘটনায় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন তার বাবা-মা। দেখা যায়, একটি কক্ষে হাতে স্যালাইন নিয় শুয়ে ছিলেন অপ্রতিমের মা নাহিদা।
‘আমিও তো সন্তানহারা, স্ত্রীকে কীভাবে সান্ত্বনা দেব’
একদিনে আলোচিত ৪ হত্যাকাণ্ড: কী হয়েছিল সেদিন
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা থেকে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুর প্রায় ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া চারটি মর্মান্তিক ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত সাতজন।
একদিনে আলোচিত ৪ হত্যাকাণ্ড: কী হয়েছিল সেদিন
যুবককে পিটিয়ে হত্যার মামলা নিতে নারাজ দুই থানার পুলিশ
ইলেকট্রনিকস পণ্যের দোকানে চুরির অপবাদে পিটিয়ে হত্যার ১৩ দিন পরও মামলা হয়নি। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, মামলা করতে গিয়ে দুই থানার পুলিশের কাছে ঘুরেও সাড়া মিলছে না। ঘটনাটি নিয়ে গাজীপুরের শ্রীপুর ও ময়মনসিংহের ভালুকা থানার পুলিশের মধ্যে মামলা গ্রহণের এখতিয়ার নিয়ে গড়িমসি চলছে। 
যুবককে পিটিয়ে হত্যার মামলা নিতে নারাজ দুই থানার পুলিশ
৭০ হাজার টাকার বিরোধেই শেষ ৬ মাসের সংসার
মাত্র ছয় মাসের সংসার। নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বনানী থেকে শাহ আলীর চিলড্রেন পার্কসংলগ্ন টিনশেডের ছোট্ট ঘরে উঠেছিলেন হাজেরা বেগম। তিন সপ্তাহের ব্যবধানেই সেই ঘর হয়ে উঠল তার মৃত্যুর শেষ ঠিকানা।
৭০ হাজার টাকার বিরোধেই শেষ ৬ মাসের সংসার
প্রেমের অভিনয় থেকে ‘কাছে আসা’, হানি ট্র্যাপ যেভাবে ভয়ংকর হয়ে উঠল
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের পর বিশ্বাস জমিয়ে দেখা করার আমন্ত্রণ, আর তারপর গোপনে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি ও ভিডিওধারণ—এই ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমেই মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের ভয়ংকর ফাঁদ বা ‘হানি ট্র্যাপ’ এখন আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের একাধিক ঘটনার সন্ধান মিলেছে। পুলিশের ভাষ্য ও অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, এটি এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন প্রতারণা নয়; বরং নারী ও পুরুষের সমন্বয়ে গঠিত একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সুপরিকল্পিত কৌশল। টার্গেটের আর্থিক সক্ষমতা, পেশা, সামাজিক অবস্থান ও ব্যক্তিগত দুর্বলতা আগে থেকেই যাচাই করে ফাঁদ পাতছে এসব চক্র। বিশেষ করে ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, আইনজীবী এবং সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরাই মূলত এদের প্রধান লক্ষ্য। মিরপুরে ৫ লাখ টাকা আদায় ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরে এমন একটি চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তারের তথ্য সামনে আসে। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, একটি ট্রাভেল এজেন্সির মালিককে কৌশলে একটি বাসায় ডেকে নিয়ে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিওধারণ করা হয়। পরে ১০ লাখ টাকা দাবি করে সেই চক্রটি। শেষ পর্যন্ত নগদ ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মোট ৫ লাখ টাকা আদায় করা হয়। এ ঘটনায় এক নারীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে নগদ টাকা, ব্যাংকের কাগজপত্র ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনার এই ধরনটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কের আড়ালে সরাসরি একটি পরিকল্পিত অর্থনৈতিক অপরাধের কাঠামো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমে বিশ্বাস অর্জন, নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া, ভিডিওধারণ এবং সর্বশেষ ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়—পুরো প্রক্রিয়াটিই যে পূর্বপরিকল্পিত, তা পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। ব্যবসায়ীকে ফাঁসিয়ে ২ লাখ ৫৯ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া এর কয়েক মাস আগে মার্চে যাত্রাবাড়ীতে একই কৌশলে এক ব্যবসায়ীকে ফাঁসানোর অভিযোগে দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, পূর্বপরিচয়ের সূত্র ধরে এক নারী ওই ব্যবসায়ীকে দেখা করার কথা বলে শনিরআখড়ায় ডেকে নেন। পরে তাকে একটি বাসায় নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে সহযোগীরা প্রবেশ করে তাকে মারধর করে এবং আপত্তিকর ভিডিওধারণ করে ব্ল্যাকমেইল শুরু করে। এভাবে জোর করে তার কাছ থেকে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৭০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার দুজনের কাছ থেকে ৬৭ হাজার টাকা উদ্ধার করে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, হানি ট্র্যাপ কেবল অনলাইন পরিচয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পুরোনো পরিচয়, ব্যবসায়িক যোগাযোগ কিংবা সামাজিক সম্পর্ককেও এতে কাজে লাগনো হচ্ছে। অর্থাৎ, ভুক্তভোগীর আস্থা অর্জনই এই চক্রের প্রথম ও প্রধান সাফল্য। টার্গেটের আর্থিক তথ্য আগেই সংগ্রহ গত জুলাইয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচ সদস্যের একটি চক্রের কর্মকাণ্ডেও একই ধরনের সুপরিকল্পিত পরিকল্পনার তথ্য বেরিয়ে আসে। ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, এই চক্রটি ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীদের টার্গেট করত এবং তাদের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে আগেই বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে রাখত। চক্রের এক নারী সদস্য প্রথমে ঋণগ্রহীতা পরিচয়ে কোনো এক ভুক্তভোগীর সঙ্গে পরিচিত হতেন। এরপর মোবাইলে যোগাযোগ বাড়িয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে দেখা করার প্রস্তাব দিতেন। নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছানোর পর ভুক্তভোগীকে একটি ফ্ল্যাটে আটকে রেখে মারধর, ভিডিওধারণ ও ব্যক্তিগত সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়া হতো। পরবর্তীতে ৩ লাখ টাকা দাবি করে তার ব্যাংক হিসাব থেকে জোরপূর্বক ১ লাখ ১০ হাজার টাকা তুলে নেওয়া হয়। ওই অভিযানে নয়টি মোবাইল ফোন ও একটি ওয়াকিটকিসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল ডিবি। খুলনায় বাড়ছে নতুন আতঙ্ক রাজধানীর বাইরে খুলনাতেও হানি ট্র্যাপ নিয়ে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সেখানে বর্তমানে ১৫ থেকে ২০টি সক্রিয় চক্রের অস্তিত্ব রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীসঙ্গ বা সম্পর্কের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়া এবং গোপনে ছবি-ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে টাকা আদায়ই এসব চক্রের মূল কাজ। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ব্যাংকার ও আইনজীবীদের মতো পেশাজীবীদের প্রধান লক্ষ্য বানিয়েই এসব অপকর্ম চালাচ্ছে তারা। সামাজিক সম্মানহানির ভয়ে অনেক ভুক্তভোগীই এসব ঘটনা প্রকাশ করতে চান না, যার কারণে অপরাধের প্রকৃত চিত্র আরও অনেক বড় হতে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। খুলনায় সেপ্টেম্বরের দুটি ঘটনাও এসব চক্রের ভয়াবহতার প্রমাণ দেয়। এর মধ্যে একটি ঘটনায় এক যুবককে চাকরি দেওয়ার কথা বলে আবাসিক হোটেলে আটকে রেখে মারধর ও ভিডিওধারণ করে ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়। অন্য একটি ঘটনায় এক আইনজীবীকে মামলার কাগজপত্র দেখানোর কথা বলে ডেকে নিয়ে আটকে রেখে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরবর্তীতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে এই চক্রগুলোর কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই যার প্রথম দরজা বর্তমানে ফেসবুক, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ও ইনস্টাগ্রামের মতো বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পরিচিতি তৈরি করছে এসব চক্র। কখনো ভুয়া পরিচয়, কখনো আকর্ষণীয় ছবি, আবার কখনো সরাসরি বন্ধুত্ব বা প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে শুরু হয় যোগাযোগ। এরপর দীর্ঘ কথোপকথনের মাধ্যমে ব্যক্তির পেশা, পরিবার, আর্থিক সচ্ছলতা ও ব্যক্তিগত দুর্বলতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেয় তারা। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রযুক্তি সম্পর্কে মানুষের কম সচেতনতা এই অপরাধকে আরও সহজ করে তুলছে। তবে সব ক্ষেত্রেই যে নারীই একমাত্র অপরাধী হবেন, এমন ধারণা সঠিক নয়। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে দেখা গেছে, নারীকে সামনে রেখে পুরুষ সহযোগীদের দিয়ে মারধর, জিম্মি করা, ভিডিওধারণ ও অর্থ আদায় করা হচ্ছে। অর্থাৎ ‘হানি ট্র্যাপ’ মূলত একটি সংঘবদ্ধ অপরাধকৌশল, যেখানে নারী বা পুরুষ উভয়েই বিভিন্ন ভূমিকায় অংশ নিতে পারে। তবে অপরাধ দমনে পুলিশের তদন্ত ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গোপন ক্যামেরা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্ল্যাকমেইল এই অপরাধের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, একবার কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও চক্রের হাতে চলে গেলে ভুক্তভোগী দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপের মধ্যে পড়েন। এমনকি একবার টাকা আদায় করার পরও চক্রের দৌরাত্ম্য থামে না। বারবার টাকা দাবি করা, নতুন করে হুমকি দেওয়া কিংবা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ধারাবাহিকভাবে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়। আইনগতভাবে এ ধরনের কর্মকাণ্ড অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। ব্যক্তিগত বা আপত্তিকর ভিডিওধারণ, সংরক্ষণ কিংবা প্রচারের ক্ষেত্রে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনসহ প্রযোজ্য অন্যান্য কঠোর আইনে ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। সম্মানের ভয়ই চক্রের মূল অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, হানি ট্র্যাপের অপরাধগুলো সফল হওয়ার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করে সামাজিক লজ্জা ও সম্মানহানির ভয়। অনেক সময় ভুক্তভোগীরা আইনি সহায়তা বা পুলিশের কাছে যাওয়ার পরিবর্তে অর্থ দিয়েই বিষয়টি মীমাংসা করতে চান। আর ঠিক এই সুযোগটিকেই কাজে লাগিয়ে চক্রগুলো আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তবে টাকা দিয়ে সাময়িক রেহাই মিললেও এর মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না; বরং এতে অপরাধীদের কাছে ভুক্তভোগীর দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে যায় এবং পরবর্তী সময়ে আরও বড় অঙ্কের টাকা দাবির ঝুঁকি তৈরি হয়। প্রতিরোধে সতর্কতাই প্রথম ঢাল অপরিচিত কারও আকস্মিক অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা, দ্রুত ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রস্তাব কিংবা নির্জন বাসা বা হোটেলে দেখা করার জন্য অনবরত চাপ—এসব বিষয়কে শুরুতেই সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি ব্যক্তিগত ছবি বা কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা ব্যক্তিগতভাবে আদান-প্রদান করার ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। কেউ যদি ব্ল্যাকমেইলের শিকার হন, তবে আতঙ্কিত হয়ে অর্থ না দিয়ে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া উচিত। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ‘হানি ট্র্যাপ’ এখন সাধারণ কোনো প্রেমের প্রতারণা নয়; এটি প্রেম, প্রযুক্তি, গোপন ক্যামেরা এবং সুসংগঠিত চাঁদাবাজিকে এক সুতোয় গাঁথা একটি আধুনিক ও ভয়ংকর অপরাধব্যবস্থা। আজকের দিনে বিত্তশালী ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবীরা টার্গেট হলেও অসাবধানতার কারণে যে কেউ এই ফাঁদে পা দিতে পারেন। তাই অচেনা মানুষের ওপর অন্ধ আস্থার পরিবর্তে সচেতনতা ও সতর্কতাই হতে পারে এই ডিজিটাল ফাঁদ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। আরটিভি/এসএস
প্রেমের অভিনয় থেকে ‘কাছে আসা’, হানি ট্র্যাপ যেভাবে ভয়ংকর হয়ে উঠল
আরও পড়ুন
কক্সবাজারে ১৯৩৮ আইফোন নিয়ে কী করছিলেন ৬ চীনা নাগরিক?
গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করায় যে 'মাশুল' দিলেন নারী
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে চাকরি, এইচএসসি পাসেও আবেদনের সুযোগ 
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও আর্থিক নিরাপত্তায় ঝুঁকি, ৩১ অ্যাপ নিয়ে সতর্ক করল গোয়েন্দারা