
খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলো ক্রমেই এক ধরনের সমান্তরাল আইনি কৌশল নিচ্ছে, যা আইন বিশেষজ্ঞদের মতে কার্যত ‘দ্বিগুণ শাস্তি’। একদিকে অর্থঋণ আদালতে দেওয়ানি মামলার মাধ্যমে সম্পত্তি দখল, অন্যদিকে একই ঋণের বিপরীতে চেক ডিজঅনার মামলায় ঋণগ্রহীতাদের জেল ও বড় অঙ্কের জরিমানার মুখে পড়তে হচ্ছে।
ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা করার পাশাপাশি অতিরিক্ত জামানত হিসেবে নেওয়া পোস্ট-ডেটেড বা ব্ল্যাঙ্ক চেক দেখিয়ে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টে ফৌজদারি মামলা করছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতারা বন্ধকী সম্পত্তি হারিয়েও একই ঋণের জন্য ফৌজদারি মামলার মুখে পড়ছেন।
সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকার সংশ্লিষ্ট ৩ লাখ ২৪ হাজার ৮০৪টি চেক ডিজঅনার মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার মামলা-যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ২ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা-ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খেলাপি ঋণ আদায়ে করেছে।
শুধু ২০২৪ সালেই ব্যাংকগুলো প্রায় ২৬ হাজার চেক ডিজঅনার মামলা করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বরের মধ্যে আরও ২৯ হাজার মামলা দায়ের হয়, যা ঋণ আদায়ে ফৌজদারি মামলার ওপর বাড়তি নির্ভরতার ইঙ্গিত দেয়।
ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত এই আদালতে ১,৭২৮টি চেক ডিজঅনারের মামলায় রায় হয়েছে। এর মধ্যে ৯৮৩টি মামলা ছিল বিভিন্ন ব্যাংকের দায়ের করা চেক ডিজঅনারের মামলা, যার সাথে জড়িত প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ।
ব্যাংক ও কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট এমরান আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, অর্থঋণ আদালতের রায়ের মাধ্যমে টাকা আদায়ের পরও চেক ডিজঅনার মামলায় জেল বা জরিমানা দেওয়া আইনের অপব্যবহার। ছোট ও মাঝারি ঋণগ্রহীতারাই এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
এই অসঙ্গতির কথা স্বীকার করছেন সিনিয়র ব্যাংকাররাও। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, অর্থঋণ আদালতে একটি মামলা নিষ্পত্তি হলে ব্যাংকের উচিত চেক ডিজঅনারের মামলা প্রত্যাহার করা। ব্যাংক যদি উভয় মামলা করে, তাহলে অর্থঋণ আদালতে মীমাংসা বা রায়ের পর চেক ডিজঅনারের মামলা টেকা উচিত নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, চেক নেওয়া বা চেক ডিজঅনার মামলা করার ক্ষেত্রে আইনি বাধা নেই। তবে আপিল বিভাগের রায়ের ওপর নির্ভর করছে এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী অবস্থান।
আরটিভি/এএএ



