ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

এলডিসি উত্তরণ ৩ বছর পেছালে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের বৈশ্বিক প্রস্তুতি জোরদার হবে

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০২:২৭ পিএম

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদিত হলে দেশের ওষুধ শিল্প নতুন গতি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে খাতটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও উদ্ভাবনী শক্তি বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ পাবে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাত থেকে প্রায় ২১ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বাণিজ্য সম্পর্কিত মেধাস্বত্ব অধিকার চুক্তির (ট্রিপস) আওতায় পাওয়া বিশেষ সুবিধার কারণে স্থানীয় উৎপাদনকারীরা পেটেন্টকৃত ওষুধের সাশ্রয়ী জেনেরিক সংস্করণ তৈরি করতে পারায় এ প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত রয়েছে। তবে সরকার এ সময়সীমা ২০২৯ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দিতে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তিন বছরের মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করেছে।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতিরিক্ত এই সময় মসৃণ ও টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাদের মতে, সময় বাড়ানো হলে ওষুধ শিল্প ট্রিপস সুবিধা প্রত্যাহারের পরবর্তী পরিস্থিতির সঙ্গে ধীরে ধীরে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে। একইসঙ্গে বাজারে সাশ্রয়ী ওষুধের সরবরাহও বজায় থাকবে।

এই রূপান্তরকালীন সময়ে কোম্পানিগুলো উৎপাদন ব্যবস্থা উন্নত করতে পারবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইউএস এফডিএ), ইউরোপিয়ান মেডিসিনস এজেন্সি (ইএমএ) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিসেস (হু-জিএমপি)-এর মতো কঠোর বৈশ্বিক মানদণ্ড পূরণে সক্ষম হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব নীতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে পারলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। এই অতিরিক্ত তিন বছর প্রতিষ্ঠানগুলোকে গুণগত মান নিশ্চিতকরণ শক্তিশালী করতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পেতে এবং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত বাজারগুলোতে প্রবেশাধিকার বাড়াতে সহায়তা করবে।

বর্তমানে দেশের মোট ওষুধ চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্থানীয়ভাবে পূরণ করা হয়। এ ছাড়া ১৫০টির বেশি দেশে বাংলাদেশি ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। যথাযথ পরিকল্পনা ও নীতিসহায়তা থাকলে এ খাতের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (বিএপিআই)-এর নেতারা সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, ধাপে ধাপে উত্তরণ প্রক্রিয়া শিল্পের প্রবৃদ্ধি ও জনস্বাস্থ্য- উভয় স্বার্থই রক্ষা করবে।

আরও পড়ুন

এক সাক্ষাৎকারে বিএপিআই ও এপিআইআইপিএসএল-এর সিইও মেজর জেনারেল (অব.) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অতিরিক্ত এই সময় কোম্পানিগুলোকে সাশ্রয়ী মূল্যের ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বায়োটেকনোলজি, অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই) উৎপাদন এবং ক্লিনিক্যাল গবেষণা অবকাঠামোর বিদ্যমান ঘাটতি পূরণে সহায়তা করবে।

তিনি বলেন, এ সময়সীমা বাড়ানো এপিআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক চালুর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার এগিয়ে নিতে অত্যন্ত জরুরি। এতে কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে।

বিশেষজ্ঞরা গবেষণা ও উন্নয়নে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে একাডেমিয়া ও শিল্পখাতের মধ্যে নিবিড় সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা। তাদের মতে, জেনেরিক-নির্ভর মডেল থেকে উদ্ভাবন ও উচ্চমূল্যের পণ্যনির্ভর মডেলে যেতে এ সেতুবন্ধন অপরিহার্য।

তারা বলেন, এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির বড় মাইলফলক হলেও ওষুধ শিল্পের সাফল্য ধরে রাখতে সুশৃঙ্খল রূপান্তর জরুরি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত তিন বছরের স্থগিতাদেশ একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। এটি শিল্পকে স্থিতিশীলতা গড়তে, উদ্ভাবন বাড়াতে এবং বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে সুযোগ দেবে।

তিনি বলেন, সরকার, শিল্পখাত ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প এলডিসি-পরবর্তী উত্তরণকে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক সংযুক্তির সুযোগে পরিণত করতে পারবে।

ডাচ-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহ বলেন, এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির প্রমাণ। তবে সময় নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, ‘এই স্থগিতাদেশ কোনো পিছুটান নয়, বরং টেকসই অগ্রগতির পথে একটি বিচক্ষণ পদক্ষেপ। স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের সমন্বয় করতে পারলে বাংলাদেশ এ উত্তরণকে সুযোগে পরিণত করতে পারবে। তখন দেশ শুধু উত্তীর্ণ অর্থনীতি নয়, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক ও সহনশীল অর্থনীতি হিসেবেও আবির্ভূত হবে।’

‘এলডিসি উত্তরণ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক প্রকাশনায় বলা হয়েছে, এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশ পেটেন্ট অধিকার, পেটেন্ট ফি পরিশোধ, মূল্য সংযোজন শর্ত এবং নন-জেনেরিক ওষুধের বাড়তি উৎপাদন ব্যয়সহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

এ ছাড়া সম্ভাবনাময় রপ্তানি বাজারে প্রবেশ আরও কঠিন হবে, যদি পণ্যের মান নিশ্চিত করা না যায় এবং এপিআই ও গবেষণায় বিনিয়োগ না বাড়ে। দেশীয় বাজারেও পেটেন্ট ফি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ওষুধের দাম বাড়তে পারে।

এ প্রেক্ষাপটে দ্রুত বিকাশমান ওষুধ শিল্পে সহজ উৎপাদন, বিপণন ও রপ্তানি গন্তব্যে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করতে সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ নীতিসহায়তা দিতে হবে।

সব ধরনের ইউটিলিটিসহ এপিআই পার্ক পুরোপুরি চালু হলে এটি বড় ধরনের মোড় ঘোরানো পদক্ষেপ হবে। একইসঙ্গে এপিআই, মলিকিউল উৎপাদন, গবেষণা ও বায়ো-ইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

উত্তরণের আগে দেশীয় শিল্পে উদ্ভাবিত বা সুপরিচিত মলিকিউলগুলোকে পাবলিক ডোমেইনে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে পরবর্তীতে পেটেন্ট ব্যবস্থার নেতিবাচক প্রভাব কমে।

এ ছাড়া বায়োসিমিলার ও বায়োটেক পণ্যের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সহজ করতে কন্ট্রাক্ট রিসার্চ অর্গানাইজেশনসের (সিআরও) সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে মেধাস্বত্ব আইন, পেটেন্ট আইন, রাসায়নিক সংশ্লেষণ, পেটেন্ট পরীক্ষণ, ল্যাব টেকনিশিয়ান ও স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ তৈরিতে পদক্ষেপ নিতে হবে।

বায়োইকুইভ্যালেন্স (বিই) টেস্ট ও স্টাডি সেন্টারের জন্য যোগ্য সিআরও গড়ে তোলা এবং প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করাও জরুরি।

এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, ভারতের নিপার ও সিডিআরআই-এর মতো প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং এপিআই খাতে নতুন বিনিয়োগ ও বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) জন্য নিয়ন্ত্রক শর্ত সহজ করা গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনা আরও বাড়বে।

সূত্র: বাসস

আরটিভি/আইএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
কালিয়াকৈরে কাজে ফিরছেন শ্রমিকরা, মহাসড়কে সতর্ক অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অধিকাংশ শিল্পকারখানা খুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল থেকেই কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছেন পোশাকশ্রমিকরা। এদিকে শিল্পাঞ্চল ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। বর্তমানে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
কালিয়াকৈরে কাজে ফিরছেন শ্রমিকরা, মহাসড়কে সতর্ক অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ৩৩ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন
ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে মোট ৩৩ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে পোশাক কারখানাসহ শিল্পাঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং জননিরাপত্তা বজায় রাখতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ৩৩ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন
বাংলা কিউআরে লেনদেন বেড়েছে ৪ গুণ
বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত জুনে দৈনিক ৪০ কোটি টাকার লেনদেন থেকে বর্তমানে তা চার গুণে উন্নীত হয়েছে।
বাংলা কিউআরে লেনদেন বেড়েছে ৪ গুণ
চট্টগ্রাম বন্দরে ১২৬ টন আপেল-আদা নিলামে বিক্রির উদ্যোগ
চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে থাকা পাঁচ কনটেইনার পচনশীল পণ্য নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। এসব কনটেইনারে রয়েছে ৪৭ হাজার ৪৪০ কেজি তাজা আপেল ও ৭৮ হাজার ৩০০ কেজি তাজা আদা। সব মিলিয়ে ১ লাখ ২৫ হাজার ৭৪০ কেজি বা প্রায় ১২৬ টন পণ্য নিলামে তোলা হচ্ছে। এসব পণ্যের সংরক্ষিত মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
চট্টগ্রাম বন্দরে ১২৬ টন আপেল-আদা নিলামে বিক্রির উদ্যোগ
স্বাভাবিক হচ্ছে সাভার শিল্পাঞ্চলের কর্মপরিবেশ
দীর্ঘদিন শ্রমিক অসন্তোষের পর স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে সাভার শিল্পাঞ্চলের কর্মপরিবেশ।
স্বাভাবিক হচ্ছে সাভার শিল্পাঞ্চলের কর্মপরিবেশ
আরও পড়ুন
এলডিসি উত্তরণে তিন বছর সময় পেল বাংলাদেশ
বাংলাদেশের জন্য এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়িয়ে দিলো জাতিসংঘ
এলডিসি উত্তরণ পেছাচ্ছে তিন বছর, প্রস্তুত কর্মপরিকল্পনা
এফবিসিসিআই রপ্তানি গবেষণা সেলের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত