বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, বিদায়ী (২০২৫-২৬) অর্থবছরে বিশ্বের ৫৮ দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে বরাবরের মতোই সবচেয়ে বড় অঙ্কের ঘাটতি রয়েছে চীন ও ভারতের সঙ্গে।
মন্ত্রী জানান, দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি মূলত গুটিকয়েক প্রধান বাণিজ্য অংশীদারের মধ্যেই বেশি ঘনীভূত। শিল্প খাতের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, জ্বালানি পণ্য এবং মূলধনী যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে আমদানির ওপর কাঠামোগত নির্ভরশীলতার কারণেই এই ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে সংসদ সদস্য সাবিকুন নাহারের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য জানান তিনি।
সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রীর উপস্থাপিত তথ্য মতে, বাংলাদেশের একক বৃহত্তম বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে চীনের সঙ্গে, যার পরিমাণ ১৭ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই বিশাল ঘাটতির মূল কারণ হলো চীন থেকে ভারী যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনী পণ্যের উচ্চ আমদানি। ওই অর্থবছরে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৬৯৪ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন ডলার।
বাণিজ্য ঘাটতির তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। এই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে মাত্র এক দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। বিপরীতে তুলা, রাসায়নিক, খাদ্যপণ্য এবং ভোগ্যপণ্যের বিপুল আমদানির কারণে এই বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও জানান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গেও বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেশ চোখে পড়ার মতো, যা মূলত এই অঞ্চল থেকে মধ্যবর্তী পণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরশীলতাকে নির্দেশ করে। এই অঞ্চলে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ৩ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি হয়েছে। এরপরই রয়েছে সিঙ্গাপুর, ঘাটতির পরিমাণ ২ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া মালয়েশিয়ার সঙ্গে এই ঘাটতি ২ দশমিক শূন্য ১ বিলিয়ন ডলার। এ অঞ্চলের অন্য দুটি দেশ ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের সঙ্গেও উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে, যার পরিমাণ যথাক্রমে ৭৯৯ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন এবং ৭২৩ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন ডলার।
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলোর সঙ্গেও বাংলাদেশ বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়েছে। এর মধ্যে কাতারের সঙ্গে ঘাটতি ২ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার, সৌদি আরবের সঙ্গে এক দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে এক দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার এবং ওমানের সঙ্গে ২১৯ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন ডলার।
পূর্ব এশিয়ার উন্নত অর্থনীতিগুলোর মধ্যে তাইওয়ানের সঙ্গে ৮০৩ দশমিক ৯৮ মিলিয়ন ডলার, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ৭৪০ দশমিক শূন্য ২ মিলিয়ন ডলার, জাপানের সঙ্গে ৪৮৯ দশমিক ৩০ মিলিয়ন ডলার এবং হংকংয়ের সঙ্গে ১৯৯ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার ভেতরে পাকিস্তানের সঙ্গেও বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৮১ দশমিক ৩০ মিলিয়ন ডলার।
ইউরোপ ও ইউরেশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে এক দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার এবং সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে ৪১৪ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি গুনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিলের সঙ্গে সবচেয়ে বড় ২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি রয়েছে। এরপর রয়েছে আর্জেন্টিনা ৭৬৩ দশমিক ১৩ মিলিয়ন ডলার এবং প্যারাগুয়ে ৮৩ দশমিক ৭০ মিলিয়ন ডলার।
খন্দকার আবদুল মুক্তাদির আরও জানান, আফ্রিকা মহাদেশের দেশগুলোর সঙ্গে সামগ্রিক বাণিজ্যের আকার তুলনামূলক ছোট হলেও ঘাটতির চিত্র বেশ বিস্তৃত। আফ্রিকার দেশ মরক্কোর সঙ্গে ৫১১ দশমিক ৯৫ মিলিয়ন ডলার, বেনিনের সঙ্গে ৪৬৪ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ডলার, ক্যামেরুনের সঙ্গে ২৭২ দশমিক ৩১ মিলিয়ন ডলার, মালির সঙ্গে ২৪৭ দশমিক ১১ মিলিয়ন ডলার, বুর্কিনা ফাসোর সঙ্গে ১৯৫ দশমিক শূন্য ৭ মিলিয়ন ডলার, মোজাম্বিকের সঙ্গে ৯৭ দশমিক ৪৩ মিলিয়ন ডলার এবং নাইজেরিয়ার সঙ্গে ৯১ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড করা হয়েছে।
এছাড়া ওশেনিয়া অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ৩২০ দশমিক ১৯ মিলিয়ন ডলার এবং নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৯৭ দশমিক ৯৭ মিলিয়ন ডলারে।
আরটিভি/এমএম


