
কক্সবাজার উপকূলে উৎপাদিত পোপা শুঁটকির চাহিদা বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র, হংকং ও চীনে। সুস্বাদু স্যুপের পাশাপাশি পোপা মাছের পটকা ও আঁইশ থেকে কোলাজেন, প্রসাধনী ও ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার হয়। চাহিদা থাকলেও সাগরে মাছের সংকটের কারণে কমছে উৎপাদন ও রপ্তানি। ফলে এ বছর নির্ধারিত রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গত বছর কক্সবাজার শহরের উত্তর নুনিয়াছটার একটি কারখানা থেকে প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের ৭০ মেট্রিক টন পোপা শুঁটকি যুক্তরাষ্ট্র, হংকং ও চীনে রপ্তানি করা হয়। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে রপ্তানি হয়েছে ৩০ মেট্রিক টন। এ বছর প্রায় ৮০ মেট্রিক টন রপ্তানির লক্ষ্য থাকলেও মাছের আহরণ কমে যাওয়ায় তা পূরণ নিয়ে সংশয় রয়েছে।
দেশের সবচেয়ে বড় শুঁটকি উৎপাদনকেন্দ্র কক্সবাজার পৌরসভার নাজিরাটেক উপকূলে প্রায় ৭০০টি শুঁটকি মহাল রয়েছে। গত বছর এসব মহালে অন্তত ৩০০ কোটি টাকার শুঁটকি উৎপাদন হয়েছে। বিভিন্ন মাছের শুঁটকি উৎপাদন হলেও পোপা তৈরির প্রক্রিয়া আলাদা এবং মান নিয়ন্ত্রণও কঠোর।
উত্তর নুনিয়াছটার সাগর ফিশ এক্সপোর্টের মালিক আবিদ আহসান জানান, তার কারখানায় ২৪ ঘণ্টা পোপা শুঁটকি উৎপাদন হয়। ৩০ শ্রমিক কাজ করেন সেখানে। মহেশখালী, ঘটিভাঙ্গা, সোনাদিয়া ও চৌফলদণ্ডীর ২৮টি ট্রলার নিয়মিত মাছ সরবরাহ করে। জমিসহ কারখানায় তার বিনিয়োগ প্রায় ১৫ কোটি টাকা।
গভীর সাগর থেকে বড়শি দিয়ে ধরা পোপা প্রথমে লবণমুক্ত করে পরিষ্কার করা হয়। এরপর নাড়িভুঁড়ি ফেলে ওয়াশিং ট্যাংকে ধুয়ে বাঁশের মাচায় রোদে শুকানো হয়। তিন-চার দিনে শুঁটকি তৈরি হলে ৩২টি গ্রেডে ভাগ করে প্যাকেটজাত করা হয়। পরে ৫ থেকে ১০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় কোল্ড স্টোরেজে রেখে চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে রপ্তানি করা হয়। তিন কেজি কাঁচা পোপা থেকে পাওয়া যায় প্রায় এক কেজি শুঁটকি।
রপ্তানিযোগ্য পোপা শুঁটকির মান নিয়ে কোনো ছাড় নেই। বিদেশি ক্রেতাদের প্রতিনিধিরা কারখানায় উপস্থিত থেকে উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণ তদারকি করেন। প্রক্রিয়াজাতকরণে ত্রুটি হলে রপ্তানির জন্য পুরো চালান অযোগ্য ঘোষিত হতে পারে।
আবিদ আহসান জানান, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, হংকং ও চীনে প্রতি কেজি পোপা শুঁটকির দাম প্রায় ৮ ডলার। আগে তা ছিল ১২ ডলার। চাহিদা থাকলেও মাছের সংকটের কারণে রপ্তানি কমছে।
জেলেদের ভাষ্য, কয়েক বছর আগের তুলনায় সাগরে পোপা মাছের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগে ১৮ প্রজাতির পোপা পাওয়া গেলেও এখন ধরা পড়ছে প্রায় ১২ প্রজাতি। বেশি দামে বিক্রি হয় কালো জাতের পোপা। নিম্নমানের বরফে সংরক্ষণ করলে শুঁটকির গুণগত মান নষ্ট হওয়ায় এখন অনেক জেলে মাছের পেটে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করছেন।
জেলেরা আরও জানান, গভীর সাগরে মিয়ানমার, ভারত ও চট্টগ্রামের ট্রলিং জাহাজ জাল টেনে নির্বিচারে মাছ ধরছে। এতে সাগরতলের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ কমে যাচ্ছে এবং কক্সবাজারের কাঠের ট্রলারগুলোও মাছ ধরতে সমস্যায় পড়ছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, গভীর সাগরে ট্রলিং জাহাজের মাছ আহরণ তদারকির মতো আধুনিক জলযান মৎস্য বিভাগের নেই। তবে কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও নৌ পুলিশের সহযোগিতায় নিষিদ্ধ কারেন্ট ও বিহিন্দি জালের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে।
কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, এক দশক আগে সেন্ট মার্টিন, টেকনাফ, মহেশখালী ও উত্তর নুনিয়াছটা এলাকায় পোপা শুঁটকির ২৭টি কারখানা ছিল। মাছের সংকট, লোকসান, সহজ শর্তে ঋণের অভাব ও সরকারি প্রণোদনা না থাকায় এর মধ্যে ২৪টির বেশি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। মৎস্যবিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত ও নিষিদ্ধ পদ্ধতিতে মাছ আহরণের কারণে সাগরে পোপাসহ বিভিন্ন মাছের উৎপাদন কমছে।
আরটিভি/এমএইচজে


